০৪:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬

অশ্লীলতার পঙ্কিল শিকার সোশাল মিডিয়া

  • আপডেট সময়: ০৯:৩৮:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • 70

ফেসবুক এখন নেশাখোর, বস্তিবাসী ও ফেক আইডিধারীদের দখলে চলে গেছে। আমার এবারের প্রসঙ্গ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্যদের চরিত্র হনন ও অশ্লীলতার কীট ছড়ানো।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, বিশেষ করে ফেসবুকে ফেক আইডি খুলে ভুয়া তথ্য প্রচার এবং রাজনৈতিক নেতাসহ বিশিষ্টজনদের চরিত্রহানি এখন চরমে। কটূক্তি, অশ্লীল ও আক্রমণাত্মক মন্তব্যে কোনো লাগাম নেই। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম। ভুয়া ছবি-ভিডিও তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি, ডিপফেক ভিডিও।

শুধু ফেক আইডি নয়, ভেরিফায়েড ফেসবুকেও প্রধানত রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে অশ্লীল বাক্যে ভরা পোস্ট দেয়া হচ্ছে। আমার সাথে সংযুক্ত আছেন এমন এক ‘মহিলা কবি’ বিভিন্ন পোস্টে এমনসব শব্দ ব্যবহার করেন, যা পুরুষরাও উচ্চারণ করতে লজ্জা পাবেন।

সূত্রমতে, একটি চক্রের কাছ থেকে কয়েক মাস আগে প্রকাশ্যে পরামর্শ দেয়া হয়েছে ফেসবুকে ফেক আইডি খুলে প্রতিপক্ষের চৌকস নেতাদের মুখোশ খুলতে, তাদের চরিত্র হনন করতে। সম্ভাব্য এই আক্রমণ, অশ্লীলতার জবাব দিতে অন্য দলের পক্ষ থেকেও তাদের কর্মীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় হতে বলে।

এই পরিস্থিতিতে দেশ, রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতি নিয়ে কোনো পোস্ট দিতে ভয় পাচ্ছেন সজ্জন ব্যক্তিরা। তাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে—‘ফেসবুক এ দেশে এখনো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠলো না।’

ফেসবুক ও শোসাল মাধ্যম চলে গেছে মূর্খ আর ইতরদের দখলে। ফেসবুককে এখন পাবলিক টয়লেটের দেয়াল মনে হচ্ছে। উগ্রতা, অশ্লীলতা এখন চরম পর্যায়ে। যার যা খুশি মন্তব্য করছে, গালাগালি করছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়িয়ে রাজপথে বিভিন্ন আন্দোলনে ব্যানার-ফেস্টুনে, স্লোগানেও ব্যবহৃত হচ্ছে ভদ্রসমাজে উচ্চারণ করা যায় না এমন সব শব্দ।

এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কর্মকর্তারাও উদ্বিগ্ন। সামনে নির্বাচন। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এআই ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার রোধ এবং নির্বাচন আচরণবিধি প্রতিপালন করানোকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন গত ৯ আগস্ট রংপুরে নির্বাচনসংক্রান্ত মতবিনিময়সভা শেষে সাংবাদিকদের এই চ্যালেঞ্জ ও উদ্বেগের কথা জানান।

সরকারের পক্ষ থেকেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার নিয়ন্ত্রণে কাউন্টার ন্যারেটিভ প্রস্তুতের ভাবনা-চিন্তা হচ্ছে। এ বিষয়ে গত ৩ জুন এক সরকারি তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসত্য ও ভিত্তিহীন অডিও ও ভিডিও অপপ্রচার নিয়ন্ত্রণে কাউন্টার ন্যারেটিভ প্রস্তুত করে জনগণকে অবহিত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

চিলে কান নিয়ে গেছে শুনলে এরা চিলের পেছনে দৌড়ায়। এদের পোস্ট কিংবা মন্তব্য পড়লে বোঝা যায়, এদের ন্যূনতম পড়াশোনা নেই, হোমওয়ার্ক নেই, শোভন ভাষা ব্যবহারের পারিবারিক শিক্ষা নেই। এরা উইট বা ফান বোঝে না।

সম্প্রতি রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে গালাগাল সম্পর্কে একজন নারী সাংবাদিক তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘গালাগাল নতুন নয়। কিন্তু যখন তা রাজনীতির স্লোগান হয়, তখন প্রতিবাদের ভাষা হয়ে যায় অশ্লীলতা, ঘৃণা। আজ এই অশ্লীল গালি সহজেই আমাদের সন্তানদের ডিভাইস বেয়ে তাদের মন-মগজে ঢুকছে, এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।

ওই সাংবাদিক রাষ্ট্র ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশ্ন রেখেছেন, ‘আপনারা কি বুঝতে পারছেন না, এই কদর্যতা শুধু আমার ঘরে নয়, আপনাদের ঘরেও ঢুকে পড়ছে? আপনাদের সন্তানের মনও কলুষিত করছে! দুই দিন পর কিন্তু কিছু চেয়ে না পেলে এই অশ্লীল গালিই হবে তার ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা।’

একজন অভিনেত্রী রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যবহৃত অশ্লীল স্লোগান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সম্প্রতি লেখেন, ‘আগে স্লোগান শুনলেই দেশের জন্য মন উত্তাল হয়ে উঠত। বিভিন্ন দলের আদর্শ প্রকাশ পেত তাদের মিছিল ও স্লোগানে। কিন্তু এখন স্লোগান শুনলে দ্রুত ফোনের সাউন্ড বন্ধ করে চারপাশে কেউ আছে কি না দেখে নিই। বাচ্চা, বয়োজ্যেষ্ঠরা পাশে থাকলে লজ্জায় মাথা নত হয়ে যায়।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও রাজনৈতিক স্লোগানে অশ্লীল শব্দের ব্যবহারকে ‘শব্দ সন্ত্রাস’ বা শাব্দিক সন্ত্রাস বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলাম খান। তিনি কালের কণ্ঠ পত্রিকাকে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন আন্দোলনকেন্দ্রিক স্লোগানে অনেকের প্রকাশভঙ্গিতে আমরা অশ্লীলতা দেখতে পাচ্ছি। সমাজে সহিষ্ণুতা কমেছে, সামগ্রিক সংহিসতা বেড়েছে। এর সঙ্গে শাব্দিক সন্ত্রাসও বেড়েছে। অ্যাকোমোডেশন বা কেউ কাউকে জায়গা দিতে না চাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। সবকিছুতে প্রতিযোগিতা। এটি গেল একটি দিক। অন্যদিকে পরিশীলিত সংস্কৃতির চর্চায় দেশে এক ধরনের স্থবিরতা চলছে। মানুষ জন্মায় রনেস (অমার্জিত) অবস্থা নিয়ে। এই রনেসটা ক্রমে রিফাইন্ড (পরিমার্জিত) হয় শিক্ষার মাধ্যমে, বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসম্মত সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে। এই পরিশীলিত সংস্কৃতির চর্চাটা হচ্ছে না।’

একটি চক্র অনলাইনে বাজে কথাগুলো ছড়িয়ে তিক্ততা ছড়াচ্ছে এবং ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে দূরত্ব বাড়ানোর অপচেষ্টা করছে। রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্য, অশ্লীল শব্দের প্রয়োগ এবং কুরুচিপূর্ণ স্লোগান নিঃসন্দেহে জুলাইয়ের মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

ভুয়া ও মিথ্যা তথ্যের ব্যবহার বেড়েছে: দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া ও মিথ্যা তথ্যের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বলে মনে করে দেশের অন্যতম শীর্ষ ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা রিউমার স্ক্যানার। গতমাসে সংস্থাটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ৩১০টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো সংস্থাটির গত ১ আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্যাক্টচেক থেকে গণনা করা ৩১০টি ভুয়া তথ্যের মধ্যে ১৮৪টি রাজনৈতিক, যা মোট ভুল তথ্যের প্রায় ৫৯ শতাংশ। এ ছাড়া গত মাসে জাতীয় বিষয়ে ৬১টি, বিনোদন ও সাহিত্য বিষয়ে ১৫টি, ধর্মীয় বিষয়ে ১৩টি, আন্তর্জাতিক বিষয়ে ১১টি, প্রতারণা বিষয়ে সাতটি, খেলাধুলা বিষয়ে পাঁচটি, শিক্ষা বিষয়ে ছয়টি, স্বাস্থ্য বিষয়ে একটি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে দুটি এবং পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে পাঁচটি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।

রিউমার স্ক্যানার টিমের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এসব ঘটনায় ভিডিওকেন্দ্রিক ভুলই ছিল সবচেয়ে বেশি, ১৭১টি। এ ছাড়া তথ্যকেন্দ্রিক ৮২টি এবং ছবিকেন্দ্রিক ভুল ছিল ৫৭টি। শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলোর মধ্যে মিথ্যা হিসেবে ২২১টি, বিকৃত হিসেবে ৩৮টি এবং বিভ্রান্তিকর হিসেবে ৫১টি ঘটনাকে সাব্যস্ত করা হয়েছে।

প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গত মাসে ফেসবুকে সবচেয়ে বেশি, ২৯৫টি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে। এ ছাড়া ইনস্টাগ্রামে ১৩৯টি, ইউটিউবে ৭৫টি, এক্সে ৪৪টি, টিকটকে ৫২টি, থ্রেডসে অন্তত সাতটি ভুল এবং টেলিগ্রামে অন্তত একটি ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে। ভুল তথ্য প্রচারের তালিকা থেকে বাদ যায়নি দেশের গণমাধ্যমও। ১৬টি ঘটনায় দেশের একাধিক গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচার হতে দেখেছে রিউমার স্ক্যানার।

সংস্থাটির আরো পর্যবেক্ষণ, গত মাসে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে জড়িয়ে তিনটি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। ভুল তথ্যগুলোর ধরন বুঝতে এগুলোকে রিউমার স্ক্যানার দুটি আলাদা ভাগে ভাগ করেছে। সরকারের পক্ষে যায় এমন ভুল তথ্যের প্রচারকে ইতিবাচক এবং বিপক্ষে যায় এমন ভুল তথ্যের প্রচারকে নেতিবাচক হিসেবে ধরে নিয়ে রিউমার স্ক্যানার দেখেছে, এসব ভুল তথ্যের ৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই সরকারকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচারের বিষয়টি বেশ কয়েক মাস ধরে আলোচনায় থাকলেও সম্প্রতি তা কিছুটা কমের দিকে। তবে জুলাই মাসে তা আবার বাড়তে দেখেছে রিউমার স্ক্যানার। এই সময়ে ১০টি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমার স্ক্যানার। এর মধ্যে সাতটি ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভারতীয় পরিচয়ধারী অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে।

এর আগে চলতি বছরের মে মাসে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ৩৫১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করে রিউমার স্ক্যানার। গত বছরের আগস্টের পর এক মাসে এটিই ছিল সর্বোচ্চ ভুল তথ্য শনাক্তের সংখ্যা। সে সময়েও রাজনৈতিক বিষয়ে সবচেয়ে বেশি, ১৪৩টি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়, যা মোট ভুল তথ্যের ৪১ শতাংশ। গত বছর আগস্টে শনাক্ত হয়েছিল ৩৮৬টি ভুল তথ্য। ভুল তথ্যের প্রবাহ চলছে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোকে নিয়েও।

এসব প্রেক্ষিতে প্রথম কথা হলো, আমরা যারা ফেসবুক ব্যবহারে অভ্যস্ত তারা যেন ফেক আইপি সম্পর্কে সচেতন থাকেন। ফেসবুকের বা ইন্সটাগ্রামের কোনো পোস্টের সত্যতা যাচাই না করে তা শেয়ার করবেন না।

এই বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সার্বিক মনিটরিং কার্যক্রম চালু রাখতে হবে। ইউটিউবে দেশ ও সমাজবিরোধী ভিডিওগুলোর আপলোডারদেরকে চিহ্নিত করতে হবে। একটি ফ্যাক্টচেক ও মনিটরিং টিম গঠন করে দেশ ও সমাজবিরোধী কার্যক্রম ও অশ্লীলতার ভিডিওগুলো অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর কন্টেন্ট দিচ্ছে, নানা বিভাজন তৈরি করছে, সেসব বানোয়াট ও উদ্দেশ্যমূলক এবং সমাজবিরোধী, সে কথাগুলো প্রেসবিজ্ঞপ্তি বা ক্ল্যারিফিকেশন দিয়ে, পত্রিকায় ও বিভিন্ন চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিয়ে জনগণকে সতর্ক করার পদক্ষেপ নিতে হবে।

উত্তরাধুনিক

Writer, Singer & Environmentalist
জনপ্রিয়

অশ্লীলতার পঙ্কিল শিকার সোশাল মিডিয়া

আপডেট সময়: ০৯:৩৮:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫

ফেসবুক এখন নেশাখোর, বস্তিবাসী ও ফেক আইডিধারীদের দখলে চলে গেছে। আমার এবারের প্রসঙ্গ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্যদের চরিত্র হনন ও অশ্লীলতার কীট ছড়ানো।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, বিশেষ করে ফেসবুকে ফেক আইডি খুলে ভুয়া তথ্য প্রচার এবং রাজনৈতিক নেতাসহ বিশিষ্টজনদের চরিত্রহানি এখন চরমে। কটূক্তি, অশ্লীল ও আক্রমণাত্মক মন্তব্যে কোনো লাগাম নেই। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম। ভুয়া ছবি-ভিডিও তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি, ডিপফেক ভিডিও।

শুধু ফেক আইডি নয়, ভেরিফায়েড ফেসবুকেও প্রধানত রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে অশ্লীল বাক্যে ভরা পোস্ট দেয়া হচ্ছে। আমার সাথে সংযুক্ত আছেন এমন এক ‘মহিলা কবি’ বিভিন্ন পোস্টে এমনসব শব্দ ব্যবহার করেন, যা পুরুষরাও উচ্চারণ করতে লজ্জা পাবেন।

সূত্রমতে, একটি চক্রের কাছ থেকে কয়েক মাস আগে প্রকাশ্যে পরামর্শ দেয়া হয়েছে ফেসবুকে ফেক আইডি খুলে প্রতিপক্ষের চৌকস নেতাদের মুখোশ খুলতে, তাদের চরিত্র হনন করতে। সম্ভাব্য এই আক্রমণ, অশ্লীলতার জবাব দিতে অন্য দলের পক্ষ থেকেও তাদের কর্মীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় হতে বলে।

এই পরিস্থিতিতে দেশ, রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতি নিয়ে কোনো পোস্ট দিতে ভয় পাচ্ছেন সজ্জন ব্যক্তিরা। তাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে—‘ফেসবুক এ দেশে এখনো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠলো না।’

ফেসবুক ও শোসাল মাধ্যম চলে গেছে মূর্খ আর ইতরদের দখলে। ফেসবুককে এখন পাবলিক টয়লেটের দেয়াল মনে হচ্ছে। উগ্রতা, অশ্লীলতা এখন চরম পর্যায়ে। যার যা খুশি মন্তব্য করছে, গালাগালি করছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়িয়ে রাজপথে বিভিন্ন আন্দোলনে ব্যানার-ফেস্টুনে, স্লোগানেও ব্যবহৃত হচ্ছে ভদ্রসমাজে উচ্চারণ করা যায় না এমন সব শব্দ।

এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কর্মকর্তারাও উদ্বিগ্ন। সামনে নির্বাচন। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এআই ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার রোধ এবং নির্বাচন আচরণবিধি প্রতিপালন করানোকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন গত ৯ আগস্ট রংপুরে নির্বাচনসংক্রান্ত মতবিনিময়সভা শেষে সাংবাদিকদের এই চ্যালেঞ্জ ও উদ্বেগের কথা জানান।

সরকারের পক্ষ থেকেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার নিয়ন্ত্রণে কাউন্টার ন্যারেটিভ প্রস্তুতের ভাবনা-চিন্তা হচ্ছে। এ বিষয়ে গত ৩ জুন এক সরকারি তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসত্য ও ভিত্তিহীন অডিও ও ভিডিও অপপ্রচার নিয়ন্ত্রণে কাউন্টার ন্যারেটিভ প্রস্তুত করে জনগণকে অবহিত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

চিলে কান নিয়ে গেছে শুনলে এরা চিলের পেছনে দৌড়ায়। এদের পোস্ট কিংবা মন্তব্য পড়লে বোঝা যায়, এদের ন্যূনতম পড়াশোনা নেই, হোমওয়ার্ক নেই, শোভন ভাষা ব্যবহারের পারিবারিক শিক্ষা নেই। এরা উইট বা ফান বোঝে না।

সম্প্রতি রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে গালাগাল সম্পর্কে একজন নারী সাংবাদিক তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘গালাগাল নতুন নয়। কিন্তু যখন তা রাজনীতির স্লোগান হয়, তখন প্রতিবাদের ভাষা হয়ে যায় অশ্লীলতা, ঘৃণা। আজ এই অশ্লীল গালি সহজেই আমাদের সন্তানদের ডিভাইস বেয়ে তাদের মন-মগজে ঢুকছে, এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।

ওই সাংবাদিক রাষ্ট্র ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশ্ন রেখেছেন, ‘আপনারা কি বুঝতে পারছেন না, এই কদর্যতা শুধু আমার ঘরে নয়, আপনাদের ঘরেও ঢুকে পড়ছে? আপনাদের সন্তানের মনও কলুষিত করছে! দুই দিন পর কিন্তু কিছু চেয়ে না পেলে এই অশ্লীল গালিই হবে তার ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা।’

একজন অভিনেত্রী রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যবহৃত অশ্লীল স্লোগান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সম্প্রতি লেখেন, ‘আগে স্লোগান শুনলেই দেশের জন্য মন উত্তাল হয়ে উঠত। বিভিন্ন দলের আদর্শ প্রকাশ পেত তাদের মিছিল ও স্লোগানে। কিন্তু এখন স্লোগান শুনলে দ্রুত ফোনের সাউন্ড বন্ধ করে চারপাশে কেউ আছে কি না দেখে নিই। বাচ্চা, বয়োজ্যেষ্ঠরা পাশে থাকলে লজ্জায় মাথা নত হয়ে যায়।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও রাজনৈতিক স্লোগানে অশ্লীল শব্দের ব্যবহারকে ‘শব্দ সন্ত্রাস’ বা শাব্দিক সন্ত্রাস বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলাম খান। তিনি কালের কণ্ঠ পত্রিকাকে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন আন্দোলনকেন্দ্রিক স্লোগানে অনেকের প্রকাশভঙ্গিতে আমরা অশ্লীলতা দেখতে পাচ্ছি। সমাজে সহিষ্ণুতা কমেছে, সামগ্রিক সংহিসতা বেড়েছে। এর সঙ্গে শাব্দিক সন্ত্রাসও বেড়েছে। অ্যাকোমোডেশন বা কেউ কাউকে জায়গা দিতে না চাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। সবকিছুতে প্রতিযোগিতা। এটি গেল একটি দিক। অন্যদিকে পরিশীলিত সংস্কৃতির চর্চায় দেশে এক ধরনের স্থবিরতা চলছে। মানুষ জন্মায় রনেস (অমার্জিত) অবস্থা নিয়ে। এই রনেসটা ক্রমে রিফাইন্ড (পরিমার্জিত) হয় শিক্ষার মাধ্যমে, বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসম্মত সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে। এই পরিশীলিত সংস্কৃতির চর্চাটা হচ্ছে না।’

একটি চক্র অনলাইনে বাজে কথাগুলো ছড়িয়ে তিক্ততা ছড়াচ্ছে এবং ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে দূরত্ব বাড়ানোর অপচেষ্টা করছে। রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্য, অশ্লীল শব্দের প্রয়োগ এবং কুরুচিপূর্ণ স্লোগান নিঃসন্দেহে জুলাইয়ের মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

ভুয়া ও মিথ্যা তথ্যের ব্যবহার বেড়েছে: দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া ও মিথ্যা তথ্যের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বলে মনে করে দেশের অন্যতম শীর্ষ ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা রিউমার স্ক্যানার। গতমাসে সংস্থাটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ৩১০টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো সংস্থাটির গত ১ আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্যাক্টচেক থেকে গণনা করা ৩১০টি ভুয়া তথ্যের মধ্যে ১৮৪টি রাজনৈতিক, যা মোট ভুল তথ্যের প্রায় ৫৯ শতাংশ। এ ছাড়া গত মাসে জাতীয় বিষয়ে ৬১টি, বিনোদন ও সাহিত্য বিষয়ে ১৫টি, ধর্মীয় বিষয়ে ১৩টি, আন্তর্জাতিক বিষয়ে ১১টি, প্রতারণা বিষয়ে সাতটি, খেলাধুলা বিষয়ে পাঁচটি, শিক্ষা বিষয়ে ছয়টি, স্বাস্থ্য বিষয়ে একটি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে দুটি এবং পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে পাঁচটি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।

রিউমার স্ক্যানার টিমের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এসব ঘটনায় ভিডিওকেন্দ্রিক ভুলই ছিল সবচেয়ে বেশি, ১৭১টি। এ ছাড়া তথ্যকেন্দ্রিক ৮২টি এবং ছবিকেন্দ্রিক ভুল ছিল ৫৭টি। শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলোর মধ্যে মিথ্যা হিসেবে ২২১টি, বিকৃত হিসেবে ৩৮টি এবং বিভ্রান্তিকর হিসেবে ৫১টি ঘটনাকে সাব্যস্ত করা হয়েছে।

প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গত মাসে ফেসবুকে সবচেয়ে বেশি, ২৯৫টি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে। এ ছাড়া ইনস্টাগ্রামে ১৩৯টি, ইউটিউবে ৭৫টি, এক্সে ৪৪টি, টিকটকে ৫২টি, থ্রেডসে অন্তত সাতটি ভুল এবং টেলিগ্রামে অন্তত একটি ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে। ভুল তথ্য প্রচারের তালিকা থেকে বাদ যায়নি দেশের গণমাধ্যমও। ১৬টি ঘটনায় দেশের একাধিক গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচার হতে দেখেছে রিউমার স্ক্যানার।

সংস্থাটির আরো পর্যবেক্ষণ, গত মাসে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে জড়িয়ে তিনটি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। ভুল তথ্যগুলোর ধরন বুঝতে এগুলোকে রিউমার স্ক্যানার দুটি আলাদা ভাগে ভাগ করেছে। সরকারের পক্ষে যায় এমন ভুল তথ্যের প্রচারকে ইতিবাচক এবং বিপক্ষে যায় এমন ভুল তথ্যের প্রচারকে নেতিবাচক হিসেবে ধরে নিয়ে রিউমার স্ক্যানার দেখেছে, এসব ভুল তথ্যের ৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই সরকারকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচারের বিষয়টি বেশ কয়েক মাস ধরে আলোচনায় থাকলেও সম্প্রতি তা কিছুটা কমের দিকে। তবে জুলাই মাসে তা আবার বাড়তে দেখেছে রিউমার স্ক্যানার। এই সময়ে ১০টি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমার স্ক্যানার। এর মধ্যে সাতটি ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভারতীয় পরিচয়ধারী অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে।

এর আগে চলতি বছরের মে মাসে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ৩৫১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করে রিউমার স্ক্যানার। গত বছরের আগস্টের পর এক মাসে এটিই ছিল সর্বোচ্চ ভুল তথ্য শনাক্তের সংখ্যা। সে সময়েও রাজনৈতিক বিষয়ে সবচেয়ে বেশি, ১৪৩টি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়, যা মোট ভুল তথ্যের ৪১ শতাংশ। গত বছর আগস্টে শনাক্ত হয়েছিল ৩৮৬টি ভুল তথ্য। ভুল তথ্যের প্রবাহ চলছে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোকে নিয়েও।

এসব প্রেক্ষিতে প্রথম কথা হলো, আমরা যারা ফেসবুক ব্যবহারে অভ্যস্ত তারা যেন ফেক আইপি সম্পর্কে সচেতন থাকেন। ফেসবুকের বা ইন্সটাগ্রামের কোনো পোস্টের সত্যতা যাচাই না করে তা শেয়ার করবেন না।

এই বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সার্বিক মনিটরিং কার্যক্রম চালু রাখতে হবে। ইউটিউবে দেশ ও সমাজবিরোধী ভিডিওগুলোর আপলোডারদেরকে চিহ্নিত করতে হবে। একটি ফ্যাক্টচেক ও মনিটরিং টিম গঠন করে দেশ ও সমাজবিরোধী কার্যক্রম ও অশ্লীলতার ভিডিওগুলো অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর কন্টেন্ট দিচ্ছে, নানা বিভাজন তৈরি করছে, সেসব বানোয়াট ও উদ্দেশ্যমূলক এবং সমাজবিরোধী, সে কথাগুলো প্রেসবিজ্ঞপ্তি বা ক্ল্যারিফিকেশন দিয়ে, পত্রিকায় ও বিভিন্ন চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিয়ে জনগণকে সতর্ক করার পদক্ষেপ নিতে হবে।