
হাসান জাহিদ
বশির আহমেদ ১৯৫৬ সালে মাত্র সতেরো বছর বয়সে বাংলাদেশেরই আরেক কৃতী সন্তান শ্রীমতী গীতা দত্তের সঙ্গে বোম্বের (মুম্বাই) একটি ছবিতে কন্ঠ দেন। সেইসময় হিজ মাস্টার্স ভয়েস তার রেকর্ড বের করে।
তারপর ঢাকায় এসে তালাত মাহমুদের পাশাপাশি গজল পরিবেশন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন বশির আহমেদ। এই গজল অনুষ্ঠানে বশির আহমেদ কন্ঠটা এমন করে উপস্থাপন করলেন যে, শ্রোতা ও আয়োজকরা রীতিমতো স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। যেন একই মঞ্চে দুই তালাত মাহমুদ!
‘তালাশ’ ছবির সাফল্যের পর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ, এর ভাষা ও সংস্কৃতি তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকলো। লাহোর, তথা পাকিস্তানের বিপুল সাফল্য, নেপালের পাহাড়ি ইশারা, জন্মভূমি ভারতÑসবকিছু ফেলে তিনি স্থায়ীভাবে বসত করলেন ঢাকায়। উর্দু সাহিত্যে এমএ ডিগ্রিপ্রাপ্ত বশির আহমেদ বাংলা ভাষায় অসংখ্য গান গাইলেন। এমনকি বাংলায় গানও নিজে রচনা করেছেন বিএ দীপ ছদ্মনামে।
১৯৩৯ সালের ১৯ নভেম্বর কলকাতার খিদিরপুরে জন্মগ্রহণ করেন বশির আহমেদ। তাঁর বাবার নাম নাসির আহমেদ। তার সংগীত শিক্ষা শুরু হয় ওস্তাদ বেলায়েত হোসেন খাঁ’র কাছে। পরে তিনি সংগীত শিক্ষা গ্রহণ করেন কিংবদন্তি গায়ক ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খাঁ’র কাছে।
১৯ নভেম্বর ওস্তাদজীর জন্মদিন। আর এই উপলক্ষ্যেই এই লেখার অবতারণা।
বশির আহমেদের দর্শন
‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’-কন্ঠশিল্পী বশির আহমেদের দর্শন, অনুভব ও পাথেয়র সাথে কথাগুলো মিলে যায় দৈবক্রমে। গাছের শাখা-প্রশাখা নড়ে, পাতা নড়ে কিন্তু শেকড় নড়ে না। বশির আহমেদ একইভাবে দশকের পর দশক জুড়ে একই শেকড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন বটবৃক্ষের মতো। তিনি ইহজগতে বিচরণ করেছেন তার নিজস্ব দর্শন, ধ্যান ও জ্ঞানে। কোনো শক্তি তাকে টলাতে পারেনি তার মস্তিষ্কে পূর্ব নির্ধারিত অসাধারণ শিল্পশৈলী থেকে।
“It is in the roots, not the branches, that a tree’s greatest strength lies. If you know where you are from, it is harder for people to stop you where you are going. A tree’s beauty lies in its branches, but its strength lies in its roots.”
কথাটা বলেছেন মাতশোনা ধলিওয়ায়ো (Matshona Dhliwayo), যিনি ক্যানেডা-ভিত্তিক লেখক, উদ্যোক্তা ও দার্শনিক, এবং ‘The Art of Winning’ গ্রন্থের প্রণেতা।
বশির আহমেদের জীবনযাপন, তাঁর করোটি নিঃসৃত ভাবনা, সৃষ্টির তাগাদা আর একাত্মতার সাথে উপর্যুক্ত কথাগুলোর সাযূজ্য আমাদেরকে রীতিমতো ভাবনায় ফেলে দেয়। ‘গ্রেট মেন থিংক অ্যালাইক’ কথাটা এখানে সার্বিক অর্থে প্রযোজ্য।
বশির আহমেদ সারাজীবন সংগীতে মগ্ন থেকেছেন ধ্যানরত সাধুর মতো। তার মধ্যে সেন্স অব হিউমার ছিলো অসাধারণ। একইসাথে তিনি ছিলেন সফল স্বামী ও পিতা। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেও তিনি ছিলেন সংসারীÑস্নেহবৎসল পিতা ও স্ত্রী অনুরাগী। জীবনের বিভিন্ন স্তরের সাফল্যের মধ্যে যে দুটিতে সাফল্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেই দুই জায়গাতেই তিনি ছিলেন সফলতম ব্যক্তি। ঘর-সংসার ও সাধনা নিয়েই তিনি আজীবন তার উর্বর সময়টাকে সযতেœ লালিত করে গেছেন।
তাঁর স্ত্রী ছিলেন আরেক কিংবদন্তি গায়িকা নেপালের সন্তান মিনা বশির। সত্তর ও আশির দশকে বশির আহমেদ ও মিনা বশিরের কয়েকটি দ্বৈত গান ব্যাপক সাড়া ফেলেছিলো।
এই জাদুকরি কন্ঠের অধিকারী সংগীতশিল্পীর গুণের কথাগুলো একটু আগেভাগে বললে, পরবর্তী অধ্যায়ে উনার সংগীত ও কর্মজীবন, ব্যক্তি বশির আহমেদকে পাঠকেরা বুঝতে পারবেন সহজে।
নায়োকোচিত চেহারা, ব্যক্তিত্ব, স্বল্পভাষী ও পাণ্ডিত্য সহজেই অন্যান্য ব্যক্তিত্ব, এমনকি সমসাময়িক অনেক গায়কদের থেকে তাকে নিমিষেই চিনিয়ে দিতো তিনি বশির আহমেদ। তিনি রাগী স্বভাবেরÑএটা অনেকের চোখে পড়তো, কিন্তু ভেতরে যে তাঁর কোমলতা ও পাহাড়সমান মানবতা লুকিয়ে ছিলোÑএটা সহজে কারোর চোখে পড়তো না।
আজকালের মানুষের ভাসা ভাসা পর্যবেক্ষণ কী করে এতো বড় মাপের শিল্পীকে বুঝবেন; এতো সময় কোথায়। সময়টাই যে জীবনে সাফল্যের চাবিকাঠি, আমরা সেটা ভুলেই গেছি এই যুগে এসে। দৌড়ে এসে হারমোনিয়ামের রিডে গান তুলে যেনতেন সুর দিয়ে রাতারাতি একটা সংগীত তৈরি করে ফেলা এখন সময় বাঁচানো আর শতশত গান বানানোর মুখ্যমন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বশির আহমেদ একটা গান তৈরি করতে বা গাইতে সময় নিতেন। তাতে একদিনের জায়গায় হয়তো সাতদিন লাগবে, গান টা তো চিরস্থায়ী হতে পারে। আমরা জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়ে দিই ঘুম, খাওয়া ও টিকটক-ইন্টারনেট-মুঠোফোন ব্যবহার করে। তাহলে একদিনের একটা ক্ষণস্থায়ী গান তৈরির চেয়ে সাতদিনে একটি চিরস্থায়ী গান করা কি ভালো নয়?
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে–এমনকি বাংলাদেশের ষাট সত্তর আর আশির দশকের শেষদিক পর্যন্ত গায়ক গায়িকারা গান গাইতে সময় নিতেন। গীতিকার উৎকৃষ্ট লিরিক তৈরি করতেন, সুরকার সময় নিয়ে হারমোনিয়ামে সুর তুলতেন আর সেইসময়ের বাঘা বাঘা শিল্পীরা সময় নিয়ে সেই গানের বাণী, সুর ও গায়কী আত্মস্থ করতেন। বশির আহমেদ সেই কাতারের প্রথমদিকের একজন সাধক। তাই আজও তার গান অমর, আর তিনি অবিনশ^র।
যা রে যাবি যদি যা
‘যা রে যাবি যদি যা, পিঞ্জর খুলে দিয়েছি, যা কিছু কথা ছিল বলে দিয়েছি।’এই গানটির মতোই এক কিংবদন্তি উড়াল দিলেন অনন্তলোকে।
তিনি একাধারে ছিলেন গজল শিল্পী, উর্দু ও বাংলা ছায়াছবির অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা। ম্যাডাম নূরজাহান, গীতা দত্ত প্রমুখ কিংবদন্তিদের সাথে দ্বৈত কন্ঠের গান করেন তিনি।
তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে এসে তিনি এই দেশকে ভালোবেসে এই দেশেই থেকে যান। তিনি উর্দু ভাষাভাষী হয়েও খুব দ্রুত বাংলা আয়ত্ত করে গান গেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন। সত্তর দশকে অসংখ্য বাংলা আধুনিক গান ও সিনেমার গান করে বাংলা গানের সাম্রাজ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেন। তার কন্ঠ, সুর ও গায়কীতে এদেশের মানুষের মনের কথা ও আবেগ প্রতিফলিত হয়।
এই দিকটা ভাববার বিষয় বৈকি। কী করে তিনি এদেশের মানুষের মন জয় করলেন এত স্বল্প সময়ে। তিনি অসংখ্য বাংলা আধুনিক গান ও সিনেমার গানের স্রষ্টা, যে গানগুলো ছিল জনপ্রিয়তার শীর্ষে।
আজও জনপ্রিয় সেইসব অমর গানÑযার অন্যতম একটি গান ‘যা রে যাবি যদি যা’ যে গানটি আজও শ্রোতাদের শিহরিত করে।
একজন সংগীতশিল্পী, একজন সাধক ও একজন দেশপ্রেমিক। তিনি বশির আহমেদ। বাংলাদেশকে আর বাংলাদেশের মানুষকে ভালোবেসে আজীবন গান গেয়েছেন যিনি, তিনি কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী বশির আহমেদ।
আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো এতো বড় মাপের কন্ঠশিল্পীর কাছে আমি সংগীতে তালিম নেয়ার। এখন বিশ্বাস করতেই পারি না যে, তার মতো মানুষের সান্নিধ্যে আমি যেতে পেরেছিলাম।
এখানে একটু বলে নিই যে, ওস্তাদজীর সান্নিধ্যে আসবার বহুকাল আগে থেকেই ওস্তাদজী ছিলেন আমার মনের কোণে তার গানের মাধ্যমে। শৈশব থেকেই তাঁর গান শুনে আমি তাকে অন্তরে ধারণ করেছিলাম।
পরবর্তীতে গানের চেয়ে আমি লেখালেখির দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়েছিলাম। যে ভুলের কোনো মাশুল হয় না সেই ভুলটাই আমি জীবনে করেছি। গানের জগতে অনুপস্থিত ছিলাম বহুবছর। তবে সেটা আমার রক্তে ও মননে ছিল। টরোন্টোতে অনেকেই আমার এই বিষয়টা আবিষ্কার করে আমাকে গান গাইতে অনুরোধ করতো ঘরোয়া আসরে, স্টেজে। আমি প্রথমবার হারমোনিয়াম নিয়ে যেতে পারিনি ক্যানেডায়। ২০১২ সালে বাংলাদেশে এসে স্কেলচেঞ্জার হারমোনিয়াম নিয়ে গিয়েছিলাম।
কিন্তু একটা বিশাল গ্যাপ হয়ে গিয়েছিল। যা আজও পূরণ করতে পারিনি আমি। পূরণ করার মতো নয়।
জীবদ্দশাতেই বশির আহমেদ প্রতিষ্ঠা করে যান সারগাম সাউন্ড স্টেশন, যা এখন তার মেয়ে সুকন্ঠী গায়িকা হোমায়রা বশির ও ছেলে প্রখ্যাত গায়ক রাজা বশিরের নিরলস প্রচেষ্টায় একটা উচ্চতর মাত্রায় পৌঁছেছে।

হোমায়রা বশির ও রাজা বশির
বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ, এর ভাষা ও সংস্কৃতি তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকলো। লাহোর, তথা পাকিস্তানে বিপুল সাফল্য, নেপালের ইশারা, জন্মভূমি ভারত─সবকিছু ফেলে বাংলাদেশে এসেছিলেন।
বশির আহমেদ-মিনা বশির দম্পতির বড় সন্তান হোমায়রা বশির ও ছোটো সন্তান রাজা বশির গানের জগতেই আছেন। দুই ভাইবোনই এখন ঢাকার সংগীতজগতের বড় তারকা। অনেক পুরস্কার-স্বীকৃতিতে ভূষিত ও শ্রোতাদের ভালোবাসায় সিক্ত।
অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা বশির আহমেদ ভাস্বর ছিলেন আপন মহিমায়। বাংলা আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গানের জগতে বিচরণ করে গেছেন তিনি বীরদর্পে।
ওস্তাদজীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁরই গাওয়া তুমুল জনপ্রিয় একটা গান এখানে আমার কন্ঠে তুলে ধরলাম পাঠক-শ্রোতাদের কাছে:
Jaa re jabi jodi jaa-Hasan Zahid, যা রে যাবি যদি যা-গেয়েছেন হাসান জাহিদ
কাফেলা গান
কলকাতার (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত) খিদিরপুরে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম তাঁর। বাবা নাসির আহমেদ এবং মা মোমেনা খাতুন। দিল্লির সওদাগর পরিবারের সদস্য হিসেবেই বেশি পরিচিতি ছিলো তাঁর।
চার ভাইয়ের মধ্যে কণিষ্ঠতম বশির আহমেদ ছেলেবেলা থেকেই গানপাগল ছিলেন। সেই সময়ে রমজান মাসে খিদিরপুরে সেহরির সময় রোজাদার মুসলমানদের ঘুম ভাঙানোর জন্য মহল্লার তরুণরা সমবেত কন্ঠে বিশেষ ধরনের ইসলামী গান গাইতো। এই ধরনের গানকে বলা হতো ‘কাফেলা’ গান। বছরে একবার এই কাফেলা গানের প্রতিযোগিতা হতো খিদিরপুরে। এই কাফেলা গানের প্রতিযোগিতায় প্রত্যেক বছর প্রথম স্থান অধিকারী বশির আহমেদ কিশোর বয়সেই খিদিরপুরে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন।
সিঁদুর বিপত্তি কাফেলা গান যখন তিনি করতেন কতোই বা বয়স তাঁর। ১৫ হবে। তবে তিনি মাঝেমধ্যে পান খেতেন। এই বয়সে তার নাম-ডাক ছড়িয়ে পড়েছে। কাফেলা গানের প্রতিযোগিতায় তিনি প্রতিবারই প্রথম হচ্ছিলেন, তার অজান্তেই তিনি অনেকের শত্রæতে পরিণত হলেন। কে বা কারা তার পানের সাথে সিঁদুর মিশিয়ে দেয়। তাঁর জীবনে এতো বড়ো বিপত্তি ও বিপদ কমই হয়েছে। এই সিঁদুর হজম করে তিনি গানে ঠিকই প্রথম হলেন। তারপরের পরিস্থিতি হয়েছিল ভয়াবহ।
হোমায়রার সাথে একদিন ফোনে কথা বলে ওস্তাদজী সম্পর্কে এই দুর্ঘটনার কথা জানতে পারলাম। বশির আহমেদের কন্ঠ বসে গেলো, এরপর কথা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। অনেকেই অনেক পরামর্শ দিল। কেউ বলল, গরম হালুয়া কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে গলায় ঝুলিয়ে দিতে। অনেক চেষ্টার পরও স্বর ফিরল না। এদিকে কথা বলতে না পেরে তিনি পাগল-প্রায়। যে ব্যক্তি গান করবার জন সবসময় মুখিয়ে থাকেন, তিনি গান তো দূরের কথা, গলা দিয়ে স্বরই বেরুচ্ছিল না তার। তিনি অস্থির ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। পরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। ডাক্তার অষুধ দিলেন এবং তিনমাস সময় বেঁধে দিলেন কথা না বলে থাকার। সেই তিনমাস তাঁর জীবনে ছিলো চরম দুঃসময় ও হতাশার। তিনি তার প্রয়োজন ও অন্যান্য কাজে কাগজে লিখে জানাতেন।

সুকন্ঠী গায়িকা হোমায়রা বশির
কথায় কথায় জানলাম, ওস্তাদজীর চা, সিগারেট, পান, ঠান্ডা পানি, কোল্ড ড্রিংকস, এমনকি আইসক্রিমও খেতেন! অন্য গায়ক-গায়িকা এসব খেলে তাদের কন্ঠের কী অবস্থা হতো আমি জানি না। কিন্তু ওস্তাদজী খেতেন। আমি নিজে দেখেছি চা-সিগারেট সমান তালে চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। যদিও এসব ছিল নিজের শরীরের প্রতি একধরনের অবহেলা, কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে বিষয়টা অন্যরকম হবে। তার সুর তোলা, গান গাওয়াতে, একটা গানের কথা লিখতে তিনি চা-সিগারেট-পানের প্রতি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু চা, সিগারেট এমনকি আইসক্রিম খেয়েও তার কন্ঠস্বর এমন দরাজ ও তরতাজা থাকতো কী করে! এই দিকটা ভেবে দেখার মতো বিষয় বৈকি।
বশির আহমেদের শিক্ষাজীবন শুরু হয় কলকাতার সেইন্ট বারনাবাস হাইস্কুলে। এই স্কুল থেকেই তিনি মেট্রিক পাস করেন। উচ্চমাধ্যমিক পাস করে পরে তিনি আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে উর্দু সাহিত্যে পড়াশোনা করেন এবং এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।
বশির আহমেদের সংগীতে হাতেখড়ি হয় ওস্তাদ বেলায়েত হোসেন খাঁ’র কাছে। সুরপাগল বশির আহমেদ মাত্র ১৫ বছর বয়সে গৃহত্যাগ করেন সুরের সন্ধানে। তিনি বোম্বে (মুম্বাই) চলে যান এবং সেখানে গীতিকার রাজা মেহেদির বাসায় ওঠেন। বোম্বে চলচ্চিত্র জগতের সুরকার নওশাদের সহকারী ছিলেন মোহাম্মদ শফি। মোহাম্মদ শফির সাথে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে বশির আহমেদের। তার সহযোগিতায় বোম্বে সংগীত জগতে গান গাইবার সুযোগ পান তিনি।
১৯৫৪-৫৫ সালে গীতা দত্ত এবং আশা ভোঁসলের সাথে দ্বৈত কন্ঠে গান করেন বশির আহমেদ। বোম্বেতে তিনি ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খানের সান্নিধ্যে আসেন এবং তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম নেন তিনি।
কেমন ছিলো তখনকার তালিম এবং শিক্ষা?
প্রথমত শ্রদ্ধা ও দ্বিতীয়ত ভয়। সেই আমলটাই বা কেমন ছিলো? আমলটা ছিলো শিক্ষা, শ্রদ্ধা ভয় ও গুরুজনে সম্মান। বড় বড় শিল্পী ওস্তাদদের নেশা ও পেশা ছিলো সংগীত। সংগীতই ছিলো তাদের জীবন ও মরণ। এই শ্রদ্ধাবোধ ও ভয় ছিলো মান্না দে’র মধ্যেও। তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘জীবনের জলসা ঘরে’আমি পড়েছি। একজন বড় শিল্পী হতে হলে বড় ওস্তাদ ও গাইয়েদেরও সম্মান করতে শিখতে হবে। তাদের সংস্পর্শে এসে শিখতে হবে। মান্না দে তাঁর সবগুলোই পালন করে গেছেন আজীবন। মান্না দে’র মতো কিংবদন্তি ৮৯ বছর বয়সেও প্রতিদিন গলা সাধতেন। একদিন কোনো কারণে গলা সাধতে না পারলে তার দিনটিই মাটি হয়ে যেতো! এক সাক্ষাৎকারে পড়েছি, তিনি সেই বয়সেও নাকি শিখছিলেন, আর কান পেতে থাকতেন শুনতে যে, কে ভালো গাইছে। সংগীত ও শিক্ষা আর পরিমিত আচার-ব্যবহারের দিক থেকে সেই আমলটা ছিলো আদর্শস্থানীয়।
বর্তমানে যান্ত্রিক ও স্যাটেলাইটের অভূতপূর্ব উন্নতির সাথে ব্যবহার ও ভদ্রতার জায়গা দখল করে নিয়েছে যান্ত্রিকতা ও একধরনের উন্নাসিকতা। মান্না দে’র প্রথম ও সম্ভবত শেষ গুরু ছিলেন তাঁর অন্ধ কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে। প্রথম জীবনে তাঁর কুস্তিগীর হবার কথা থাকলেও একটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে থেকে আর মনের চাহিদার কাছে আত্মসমর্পণ করে তিনি হয়ে ওঠেন গায়ক। তিনি কলেজ জীবনে গোবর গুহের কাছে নিয়মিত ডন বৈঠক ও কুস্তির পাঠ নিলেও কাকা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রভাব তাঁর মধ্যে ছিলো প্রবল।
ভেন্ডিবাজার ঘরানার অংশ ওস্তাদ আমান আলি খানের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতে পাঠগ্রহণ তাঁর সংগীতজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলো। মূলত কৃষ্ণচন্দ্র দে ও ওস্তাদ দবির খানের কাছেই তার ভিত রচিত হয়। ‘জীবনের জলসাঘর’এ মান্না দে’র বর্ণনায় কৃষ্ণচন্দ্র দে’র একটি বিস্ময়কর দিক উন্মোচিত হয়। তিনি নিজেই ওস্তাদ হয়েও যে শেখার তৃষ্ণার কাছে ইহজাগতিক সবকিছু হার মানে তার প্রমাণ মেলে।
যুগটাই এখন এমন যে, আমরা আমাদের বাংলা গান ছেড়ে হিন্দি গান করছি। ট্রেন্ডিংএর দোহাই দিয়ে হিন্দি গানের সাথে টিকটকে নর্তন-কুর্দন করে ভাইরাল হবার চেষ্টা করছি! অথচ বশির আহমেদ উর্দু গান ছেড়ে বাংলা অনেক হিট গান করলেন, ছায়াছবিতে কন্ঠ দিয়ে অসংখ্য জনপ্রিয় গান গাইলেন, সেটা আমরা অল্পসময়ে কীভাবে ভুলে গেলাম!
প্রসঙ্গটা ছিলো সেই যুগ আর এই যুগ নিয়ে। বশির আহমেদ নিজেই বলেছেন তিনি ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খানের পানের পিকদানি এগিয়ে দিতেন। তিনি নিজেও তখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন, কিন্তু ওস্তাদের প্রতি সম্মানবোধ তাঁর ছিলো। ওস্তাদেরা তখন সাগরেদদের গাধা পিটিয়ে মানুষ বানানোর জন্য উঠেপড়ে লাগতেন। সংগীতের ভিত যে রাগসংগীত, রাগরাগিণীর ওপর দখল, তাল-লয়ে পোক্ত, এসব কথা আমরা ভুলে যাচ্ছি। ভয়ের কথা উল্লেখ করেছিলাম, ভয় পেতেন সাগরেদরা যদি কোনো ভুল বা বেয়াদবি হয়ে যায়।
যাইহোক, বোম্বে থাকার সময়ই শিল্পী তালাত মাহমুদের সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে বশির আহমেদের। ১৯৬০ সালে চলচ্চিত্র প্রযোজক এবং গুলিস্তান সিনেমা হলের মালিক দোসানী’র আমন্ত্রণে তালাত মাহমুদের সাথে ঢাকায় আসেন বশির আহমেদ। ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং ময়মনসিংহ শহরে একই মঞ্চে উভয়ে সংগীত পরিবেশন করেন।
এরপর মাঝেমাঝেই ঢাকায় আসতেন বশির আহমেদ। ১৯৬৩ সালে ঢাকায় নির্মিত উর্দু চলচ্চিত্র ‘তালাশ’এ গান করেন বশির আহমেদ। চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে ব্যস্ততা বাড়তে থাকলে ১৯৬৪ সালে তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকাতে চলে আসেন। ষাটের দশকে ঢাকায় নির্মিত উর্দু-বাংলা দ্বিভাষিক চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিলো বশির আহমেদের।
১৯৬৯ সালে ‘ময়নামতি’ ছায়াছবিতে সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ‘ডেকো না আমারে তুমি কাছে ডেকো না’এবং গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ‘অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়’ গান দুটির সুরকার ও গায়ক ছিলেন বশির আহমেদ। এই গান দুটির আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা তাকে বাংলা চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালক ও গায়ক হিসেবে খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা এনে দেয়।
ষাট ও সত্তর দশকে এ দেশের সংগীত বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিলো রেডিয়ো। এ সময়ে রেডিয়োতে তিনি ‘তোমার কাজল কেশ ছড়ালো বলে’, ‘আমাকে পোড়াতে যদি এতো লাগে ভালো’ ‘যদি যেতে চাও যাও চলে যাও’ প্রভৃতি গান করেন। এইসব গানের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংগীতপ্রিয় সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন বশির আহমেদ। শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নেয়া বশির আহমেদের গায়কীতে নিজস্ব একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিলো। রাগপ্রধান, অলংকারধর্মী বাংলা গান তিনি অত্যন্ত সহজে, মাধুর্যমণ্ডিত করে গাইতে পারতেন। বাংলা চলচ্চিত্র এবং আধুনিক ধারার বাংলা সংগীতের অনেক জনপ্রিয় গানের সুরকার ও গায়ক বশির আহমেদ।
এখানে একটা বিশেষ গানের কথা উল্লেখ করবো। ‘আয়না ও অবশিষ্ট’ ছবির গান। সুরকার সত্য সাহা আর গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার। আজকাল এমন সুর ও গীত তৈরি হয়? গানের কম্পোজিশন? এটা বর্ণনা করার ভাষা আমার নেই। তবলার তেহাই ও কারুকাজ মনোমুগ্ধকর। আর কন্ঠ? সেটা তো স্বর্গীয়। ঈশ^রপ্রদত্ত। আর এই কন্ঠের অধিকারী একজনই–তিনি বশির আহমেদ। ধ্রুপদী ঘরানার গান। খুব কঠিন একটা গান। অথচ ঘরে ঘরে এই গান টা জনপ্রিয় ছিলো। কেনো? কারণ সব মিলিয়ে এই গান বাংলার মাটি, আলো, হাওয়া ও আকাশ থেকে শরতের শিউলি ফুলের মতো মুঠো মুঠো সংগ্রহ।
সেই কতোকাল আগের কথা। সীমিত বাদ্যযন্ত্র ছিলো। এখন তো প্রায় প্রতিদিনই দেশি-বিদেশি নানা বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে, সেই তুলনায় সরস গান কি তেমন হচ্ছে? দুয়েকটি যে ব্যতিক্রম নেই, তা বলবো না। তবে বাদ্যের আধিক্যে ভোকাল হারিয়ে যাচ্ছে। গানের কথায় কোনো ডেপ্থ নেই।
বশির আহমেদের স্ত্রী মীনা বশিরও একজন জননন্দিত শিল্পী ছিলেন। একক কন্ঠে এবং বশির আহমেদের সাথে দ্বৈত কন্ঠে অনেক জনপ্রিয় গান করেছেন তিনি। তাদের কন্যা হোমায়রা বশির এবং পুত্র রাজা বশির দুজনেই প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। বশির আহমেদ ছিলেন একজন আপাদমস্তক সংগীতময় মানুষ। গান গাওয়া, সুর রচনা, সংগীত পরিচালনা ছাড়াও তিনি গান শিখিয়েছেন অসংখ্য ছাত্রছাত্রীদের। তার শিষ্যরা অনেকেই আজ প্রথিতযশা সংগীতশিল্পী। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন কনকচাঁপা।

সপরিবারে বশির আহমেদ
সংগীতক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বশির আহমেদ ২০০৫ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। দেরিতে হলেও তিনি এই স্বীকৃতি পেয়েছেন, এটা জীবদ্দশায় তার জন্য আনন্দদায়ক ছিলো, ভাবতে ভালো লাগে।
একজন সব্যসাচী ব্যক্তিত্ব
বশির আহমেদ স্বর্গীয় কন্ঠস্বরের অধিকারী একজন গায়কই ছিলেন না শুধু, তিনি ছিলেন সব্যসাচী। লম্বা কাঠামোর অধিকারী বশির আহমেদ ছিলেন সুদর্শন। সিনেমার হিরোর অফারও তার কাছে এসেছিলো।
বোম্বেতে তিনি উপমহাদেশের বরেণ্য ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁ’র কাছে তালিম নিয়ে বশির আহমেদ প্রচুর অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন।
তিনি ছিলেন একজন কবি এবং গীতিকার। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তাফিজ সাহেব তাঁর ‘সাগর’ ছবির জন্য গান লিখতে বশির আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বশির আহমেদ সেই ছবির গান লেখেন এবং চমৎকারভাবে গেয়েছিলেন ‘যো দেখা প্যায়ার তেরা।’
একইভাবে রবিন ঘোষও তার ছবির গান লেখার জন্য বশির আহমেদকে অনুরোধ করেন। ১৯৬৪ সালে ‘কারোয়ান’ ছবির জন্য বশির আহমেদ গান লিখেছিলেন এবং অসাধারণ গেয়েছিলেন ‘যব তোম একেলে হোগে হাম ইয়াদ আয়েঙ্গে।’ গানটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। রেডিয়ো পাকিস্তানে ষাটের দশকে সবচেয়ে বেশি বাজতো গানটি।
‘তাঁর গাওয়া ছবিগুলো: সাগর, কারোয়ান, ইন্ধন, কঙ্গন, দর্শন এবং মিলন উল্লেখযোগ্য।
|
গানগল্প: বশির আহমেদ ১৯ জুলাই ২০১৩, বিবিসি ষাট এর দশক থেকে গান গাইছেন বশির আহমেদ কলকাতার খিদিরপুরে জন্ম মা’র কাছে ঘুমপাড়ানি গান শুনে শুনেই গানে প্রথম আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর চলচ্চিত্রে তার প্রচুর গান এখনও শ্রোতাদের কাছে সমাদৃত গান গাইবার পাশাপাশি বিএ দীপ নামে গান লিখেছেন এবং সংগীত পরিচালনাও করেছেন বশির আহমেদ তাঁর স্ত্রী মীনা বশির এবং দুই সন্তান হোমায়রা বশির ও রাজা বশিরও যুক্ত সংগীতের সাথে সংগীত ও পারিবারিক জীবন নিয়ে বশির আহমেদ বিবিসি’র সাথে গানগল্পে কথা বলেছেন অর্চি অতন্দ্রিলার সাথে
|
১৯৬৩ সালে ঢাকাভিত্তিক উর্দু/বাংলা চলচ্চিত্র ‘তালাশ’এর দ্বৈত সংস্করণে বশির আহমেদকে প্রথমবারের মতো যুক্ত করা হয়। ১৯৬০-এর দশকে মাসুদ রানা এবং আহমেদ রুশদির মতো শিল্পীদের আধিপত্য সত্ত্বেও তিনি ঢাকাভিত্তিক উর্দু চলচ্চিত্রের সবচয়ে জনপ্রিয় প্লেব্যাক পুরুষ কন্ঠশিল্পী হয়ে ওঠেন এবং অনেক সুপারহিট গান গেয়েছিলেন তিনি। তিনি ১৯৬৭ সালে ‘দর্শন’ চলচ্চিত্রে ৮টি গান গেয়েছিলেন, এবং ৮টি গানই তিনি লিখে অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেন এবং সেসবের বেশিরভাগই সুপার হিট ছিলো। পাকিস্তানে তার সর্বশেষ ছবি হিল স্টেশন ছিলো সম্ভবত ১৯৭২ সালে।
১৯৬০ সালে তালাত মাহমুদের সঙ্গে ঢাকায় আসেন তিনি গান গাওয়ার জন্যে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় তারা একসঙ্গে স্টেজে গান করেন। তারপর ফিরে গেলেও গানের টানেই কিছুদিন পরপর ঢাকায় আসতেন বশির আহমেদ। এই আসা-যাওয়ার মধ্যে এখানে উর্দু চলচ্চিত্র ‘তালাশ’এ (১৯৬৩) গান গাওয়ার সুযোগ পান।
এদেশে তৎকালীন সময়ে উর্দু চলচ্চিত্র নির্মিত হতো নিয়মিত। আর উর্দু ছবির গানের প্রয়োজনেই কদর বাড়তে শুরু করলো বশির আহমেদের। তাঁর কণ্ঠটি উর্দু গানের জন্যও পারফেক্ট ছিলো। ‘তালাশ’ ছবিতে নায়ক রহমানের ঠোঁটের সবগুলো গান গেয়েছিলেন তিনি। একটি গান ছিলো ‘কুছ আপনি কাহিয়ে, কুছ মেরি সুনিয়ে।’
এরপর তিনি জহির রায়হানের উর্দু ছবি ‘সঙ্গম’ (১৯৬৪)-এ গান করেন।
বশির আহমেদ উর্দুভাষার গীতিকার, সুরকার এবং শিল্পীও। উর্দু চলচ্চিত্র ‘কারওয়ান’ (১৯৬৪)-তে তার নিজের লেখা ও সুরে ‘যব তুম আকেলে হোগে হাম ইয়াদ আয়েঙ্গে’ জনপ্রিয় হয়। অন্য আরো উর্দু চলচ্চিত্রে কাজ করলেও ‘দর্শন’ (১৯৬৭) তাঁকে নিয়ে যায় খ্যাতির শীর্ষে। এই চলচ্চিত্রের গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন তিনি। বাংলা চলচ্চিত্রেও সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন তারপরেই।
‘মধুমিলন’ (১৯৭০) চলচ্চিত্রে শহীদুল ইসলামের লেখা ও ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া ‘কথা বলো না বলো ওগো বন্ধু/ছায়া হয়ে তবু পাশে রইবো’গান টা সুরস্রষ্টা বশির আহমেদের অতি উঁচু প্যারামিটারের নিদর্শন।
ফজল-এ-খোদা ও বশির আহমেদ একসঙ্গে গান লিখেছেন ‘মনের মানুষ’, ‘অশান্ত প্রেম’ ‘স্বামীর সোহাগ’ও ‘বধূবরণ’ প্রভৃতি চলচ্চিত্রে। ‘মনের মানুষ‘-এর একটি গান তো এখনও জনপ্রিয়তার শীর্ষে: ‘প্রেমের এক নাম জীবন (মানুষের গান আমি শুনিয়ে যাবো)।’
সত্তর দশকের শেষে উর্দু চলচ্চিত্র ‘দর্শন’বাংলায় রূপান্তরিত হয়। এর গানগুলো বাংলায় রূপান্তর করেন ফজল-এ-খোদা।

বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় গায়ক-গায়িকা দুই ভাইবোন রাজা বশির ও হোমায়রা বশির
বশির আহমেদের কণ্ঠে একটা অন্যরকম মাধুর্য্য ছিল। তিনি তার সুরের মায়াজালে সহজেই শ্রোতাকে মোহাবিষ্ট করতে পারতেন। ফজল-এ-খোদার লেখা যেসব গান তিনি নিজের সুরে গেয়েছেন: ‘বন্ধু সেই দেখা কেনো শেষ দেখা হলো’, ‘সেই যে কবে ঘর ছেড়েছি/আর তো ঘরে ফেরা হলো না’, ‘আমি বাউল মেঘমালা’, ‘চলো আমরা আবার আগের মতো’, ‘আমি বড়ো ধাঁধায় পড়েছি’, ‘সুখপাখিটা সুখের কথা কয় না’, ‘প্রেম সব কিছু নয়’, ‘ফুল ভালোবাসি/পাখি ভালোবাসি’ ‘চেনা মানুষ অচিন হলাম।’ আরো গানের কথা বলা যায়। বশির আহমদের সুরে, গায়কীতে এমন একটা স্বকীয়তা আছে, যা তাকে অন্যদের চেয়ে বিশিষ্ট করেছে।
ফজল-এ-খোদা-বশির আহমেদ জুটি বৈচিত্র্যপূর্ণ গান দিয়ে আমাদের সংগীতভুবনকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাদের গানে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও আছে। একটি গান চিঠির আঙ্গিকে তৈরি করেছিলেন তারা। গানটি গদ্যে লেখা; প্রেমিক তার প্রেমিকাকে লিখছে–‘প্রিয়তমা, এই তো সেদিনের কথা! তবু মনে হয় কতোকাল দেখিনি তোমায়…।’ গানটি রেডিয়োতে প্রায়ই শোনা যায়। এটি একটি ব্যতিক্রমী গানের উদাহরণ হতে পারে।
করেছেন বাউল অঙ্গের গানও। রথীন্দ্রনাথ রায়ের গাওয়া ‘মন ভাব কি জমে ধর্মেকর্মে’ এবং কিরণচন্দ্র রায়ের ‘কী কালি লাগাইলি সংসারে’ গান দুটির কথা। বশির আহমেদ ও ফজল-এ-খোদা জুটির গানের ভুবন থেকে বাদ থাকেনি ইসলামি গানও। রমজানের ওপর লেখা একটি গান বশির আহমেদের কণ্ঠে রেডিয়োতে সেহরির অনুষ্ঠানে অনেকেই শুনেছেন সে গান, ‘শোনাই শোনো গল্পে শোনা কাহিনি।’
উচ্চাঙ্গসংগীত গাওয়ার মতো দক্ষ কণ্ঠ ছিলো বশির আহমেদের। রাগভিত্তিক গান অনায়াসে বসে যেতো তার কণ্ঠে। তিনি রাগাশ্রয়ী এধরনের আরো অনেক গান করেছেন ফজল-এ-খোদার। যেমন, ‘ভালোবেসো না/আমাকে আর ভালোবেসো না’, ‘কী করে গাহিব/সুর যেনো সেজেও সাজে না’, ‘সজনী রজনী যায় চলে যায়’,’ ‘ওগো নন্দিনী আনন্দিনী/প্রেম বন্দিনী রজনীগন্ধা’, ‘জীবন শুধু প্রেমের বাঁধন আর কিছু নয়’ইত্যাদি।
বশির আহমেদের সুরে গান করেছেন ফেরদৌসী রহমান, মোহাম্মদ আবদুল জব্বার, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন থেকে শুরু করে তরুণ অনেক শিল্পী। একইভাবে আবদুল আহাদ, খান আতাউর রহমান, খন্দকার নুরুল আলম, সুবল দাস, রবিন ঘোষ, সত্য সাহা, আজাদ রহমান থেকে শুরু করে ইমন সাহার মতো তরুণ সুরকারের গানও করেছেন বশির আহমেদ। আজাদ রহমানের সুরে ফজল-এ-খোদার কথায় তার গাওয়া রেডিয়োর একটি গান:
“হৃদয়ে এক পাথর আছে
লাগলে আঘাত আগুন জ্বলে
হৃদয়ে এক সেতার আছে
লাগলে ছোঁয়া কথা বলে
তুমি আগুন জ্বালাবে নাকি সুর বাজাবে
তুমিই জানো আমি জানি না।”
বশির আহমেদ কণ্ঠ দেবেন বলেই বাংলা খেয়াল বিশেষজ্ঞ আজাদ রহমান গানটিতে শাস্ত্রীয় সংগীতের আবহ সৃষ্টি করেন।
বশির আহমেদের স্ত্রী মিনা বশির একজন প্রথিতযশা কণ্ঠশিল্পী। তাঁদের এক মেয়ে এক ছেলে হোমায়রা বশির ও রাজা বশির। তারাও গানের জগতের মানুষ। বাবার কাছেই তাদের হাতেখড়ি ও গান শেখা। অর্থাৎ বশির আহমেদের পরিবার শিল্পীপরিবার। মিনা বশির নেপালি। তিনি কলকাতার বাংলা সিনেমা ‘পৃথিবী আমারে চায়’এবং বোম্বের অলটাইম হিট ছবি ‘গীত’-এর নায়িকা মালা সিনহার চাচাতো বোন। ১৯৬৮ সালে বিয়ের আগে তাঁর নাম ছিলো লিলি সিনহা। তিনি ছিলেন রবীন্দ্র ভারতীর ছাত্রী। কলকাতায় এক অনুষ্ঠানে বশির আহমেদের গান শুনে মুগ্ধ হন তিনি। গানের পরে তাদের দেখা এবং পরিচয়।
হোমায়রা ও রাজাকে তাদের বাবার সঙ্গে উর্দু এবং মায়ের সঙ্গে নেপালি ভাষায় কথা বলতে শুনেছি। আর বাংলা তো কমন।
বশির আহমেদ গান গেয়েছেন, গানে সুর করেছেন, গান লিখেছেন; শুধু তাই নয়–তার অগণিত ছাত্রছাত্রীকে তিনি গান শিখিয়েছেন। নিজের গান তাদের তুলে দিয়েছেন। পরিপূর্ণ সংগীত-ব্যক্তিত্ব বলতে যা বোঝায়, বশির আহমেদ ছিলেন তাই। নিজেই ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি গান ছাড়া অন্য কিছু করেননি। গান ছিল তার নির্ভর আশ্রয়।
বাংলা গানকে তিনি মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিলেন। মাতৃভাষা উর্দু হলেও বাংলাতেও গান লিখেছেন অজস্র। বাংলা গানের প্রতি তার ভালোবাসার প্রতিদান দিয়েছে বাংলাদেশের মানুষ তার গান গ্রহণ করে। আমৃত্যু তিনি আমাদের গানের ভুবনকে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁর মেধা দিয়ে, তাঁর প্রতিভা দিয়ে।
২০১৪ সালের ১৯ এপ্রিল তিনি ঢাকায় পরলোকগমন করেন।
আমাদের দেশে শুধু সংগীতকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা খুব কঠিন। সেই কঠিন কাজটিকেই জীবনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন বশির আহমেদ। শত প্রতিকূলতার মুখেও বিশুদ্ধ সংগীতকে কখনো বিসর্জন দেননি। শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন করেছেন সংগীত শিল্পের সাধক হয়ে। তাঁর জীবন তাঁর সংগীত আমাদের উত্তর-প্রজন্মকে প্রেরণা যোগাবে, আলো দেখাবে।
লেখক: কথাশিল্পী, সংগীতশিল্পী ও পরিবেশবিদ



























