কড়াইলে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে স্বেচ্ছাসেবীরা। ছবি: ঢাকা মেইল
কড়াইল বস্তির আগুন নিভে যাওয়ার পরও মানুষের কান্না, ধোঁয়ার গন্ধ আর পোড়া স্মৃতি মিলিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার। আগুনে ঘর, জামাকাপড়, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ বছরের পর বছরের সঞ্চয় মুহূর্তেই ভস্মীভূত হয়েছে। এরই মধ্যে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে নানা ধরনের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যারা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ত্রাণ দেওয়া, তালিকা তৈরি, চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাসহ বহু কাজ একযোগে করছে।
আগুন লাগার পর থেকেই বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে জরুরি পরিস্থিতি সামলাতে শুরু করে। তাদের কেউ আগুন নিয়ন্ত্রণে দমকলকর্মীদের সহায়তা করেছে, কেউ আবার আহতদের চিকিৎসা দিতে অস্থায়ী মেডিকেল কর্নার স্থাপন করেছে। আগুনে অনেক শিশু ও বৃদ্ধ ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা, পানি ও স্যালাইন দেওয়ার দায়িত্বও নেয় কয়েকটি সংগঠন।
কড়াইলের সরু গলিতে দেখা গেছে ত্রাণ বিতরণে ব্যস্ত তরুণ স্বেচ্ছাসেবীদের দৌড়ঝাঁপ। কেউ খাবার নিয়ে যাচ্ছে, কেউ বা কম্বল জড়িয়ে দিচ্ছে আগুনে সব হারানো পরিবারগুলোকে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খিচুড়ি, রুটি, পানি ও শুকনা খাবার বিতরণের পাশাপাশি শিশুদের জন্য বিস্কুটের ব্যবস্থাও করছে কিছু দল। রাতে যেন কেউ ঠান্ডায় কষ্ট না পায়, তা নিশ্চিত করতে কম্বল, চাদর, উষ্ণ কাপড় পৌঁছে দিচ্ছে সংগঠনগুলো।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকে আগুনে স্কুলের বইপত্র হারিয়েছে। এজন্য শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহেও উদ্যোগ নিয়েছে কয়েকটি দল। একই সঙ্গে তালিকা তৈরি করে ভবিষ্যতে ঘর পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন সহায়তার প্রস্তুতিও নিচ্ছে তারা।
আগুনের মধ্যে ঘর হারিয়ে দিশেহারা পরিবারগুলোর মতে, স্বেচ্ছাসেবীদের এই উপস্থিতি তাদের শুধু খাবার বা চিকিৎসা দেয়নি, দিয়েছে মানসিক সান্ত্বনা আর এগিয়ে যাওয়ার সাহস। বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর কার্যক্রমও চোখে পড়ার মতো। তারা রাতের খাবারের টোকেন ঘুরে ঘুরে দিচ্ছে, যাতে তা সবার হাতে পৌঁছে।
একটি সংগঠনের এক স্বেচ্ছাসেবী বলেন, আমরা প্রথম থেকেই এখানে খাবার আর পানি বিতরণ শুরু করি। পরে শুকনা খাবার, বিস্কুট, দুপুর বা রাতের ভারী খাবার সবই পৌঁছে দিচ্ছি। রাতের ঠান্ডার কথা ভেবে কম্বল আর চাদরও দিচ্ছি। যতক্ষণ মানুষ নিজের ঘরে ফিরতে না পারে, আমরা এই সহায়তা চালিয়ে যাব।
অন্য একটি সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবী বলেন, এখানে সব বয়সের মানুষ—শিশু, নারী, বৃদ্ধ—সবারই বিপদ। তাই আমরা খাবার, স্যালাইন, চিকিৎসাসামগ্রীসহ কম্বলও দিচ্ছি। অনেকে সারাদিন কিছু খেতে পারেনি, তাই রান্না করা খাবারের পাশাপাশি শুকনা খাবারও দিচ্ছি, যাতে কেউ ক্ষুধার্ত না থাকে। যতটুকু সম্ভব দ্রুত হাতে হাতে সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছি।
আগুনের ধ্বংসস্তূপের মাঝেও তাই দেখা গেছে মানবিক দৃশ্য—মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে। পোড়া ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে চোখ মুছতে থাকা এক মা, নতুন কম্বল জড়িয়ে নেওয়া এক বৃদ্ধ, খাবারের প্যাকেট হাতে পাওয়া এক শিশুর হাসি—এসবই প্রমাণ করে দুঃসময়েও মানবতার হাত কেমন সহায় হয়ে ওঠে।
কড়াইলের এই দুর্যোগে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর দ্রুত এগিয়ে আসা ক্ষতিগ্রস্তদের পুনরুদ্ধারের প্রাথমিক ধাপকে সহজ করেছে। আগুনে ছাই হয়ে যাওয়া জীবনগুলোকে আবার নতুন করে গড়ে তুলতে তাদের এই সহায়তা আগামী দিনগুলোতেও বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।