ছবিসূত্র: রয়টার্স
ভারতে বড়দিন উদযাপন বন্ধের চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, দেশটিতে খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যেতে পারে। দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এদিকে টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গির্জাগুলোতে ভক্তদের উপস্থিতি ও শুভেচ্ছাবার্তা আদান-প্রদান চললেও ভারতে এবারের আনন্দের চেয়ে বেশি আতঙ্ক নিয়ে বড়দিন উদযাপন হচ্ছে।
টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, দেশজুড়ে খ্রিস্টানদের সমাবেশ ও বড়দিনের সাজসজ্জাকে লক্ষ্য করে হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নানা ধরনের বাধা দেওয়ার অসংখ্য অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব হামলা প্রসঙ্গে বিভিন্ন রাজ্যে সক্রিয় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-সংশ্লিষ্ট এবং ডানপন্থী হিন্দু গোষ্ঠীগুলোর যোগসূত্র রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ ও কেরালা—এই রাজ্যগুলোতে এ ধরনের ঘটনার খবর বেশি পাওয়া গেছে।
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অভিযোগ, বড়দিন উপলক্ষে গির্জায় প্রার্থনা, সমাবেশ ও উৎসবের প্রস্তুতিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং অনেক জায়গায় সাজসজ্জা ভেঙে ফেলা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এ ধরনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
https://twitter.com/i/status/2004173323375173888
খ্রিস্টান অধিকারবিষয়ক সংগঠন ওপেন ডোরস জানিয়েছে, বড়দিন উপলক্ষে ভারতজুড়ে গির্জার প্রার্থনা সভা বা সমাবেশে অন্তত ৬০টিরও বেশি বাধা দেওয়া ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। পূর্বাঞ্চলীয় ওড়িশা রাজ্য থেকে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একদল হিন্দু পুরুষ রাস্তার পাশে সান্তা টুপি বিক্রি করা বিক্রেতাদের হয়রানি করছেন। ভিডিওতে ওই ব্যক্তিরা দাবি করেন, ভারত একটি ‘হিন্দু রাষ্ট্র’, তাই সেখানে ‘খ্রিস্টান জিনিসপত্র’ বিক্রি করা যাবে না।
তোমরা হিন্দু হয়েও এটা কীভাবে করছ?—এভাবেই সান্তা টুপি বিক্রি করা বিক্রেতাদের প্রশ্ন করেন একদল লোক। তারা বিক্রেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নাও এবং এখান থেকে চলে যাও। যদি কিছু বিক্রি করতেই হয়, তাহলে ভগবান জগন্নাথের জিনিসপত্র বিক্রি করো।’ প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বড়দিন উপলক্ষে খ্রিস্টান উৎসবের সামগ্রী বিক্রির কারণে ওই বিক্রেতাদের প্রকাশ্যে হেনস্থা ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মুসলিম ও খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের সমাজ থেকে বাদ দেওয়ার মানসিকতা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা আরো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ভারতে ১৪০ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে খ্রিস্টানদের সংখ্যা মাত্র ২ শতাংশ। অন্যদিকে হিন্দুরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ এবং মুসলমানরা ১৪ শতাংশ। খ্রিস্টান নেতারা জানিয়েছেন, তাদের সম্প্রদায়ের ওপর সহিংস ঘটনার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
খ্রিস্টানদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা সংগঠন ইউনাইটেড ক্রিশ্চিয়ান ফোরাম জানিয়েছে, চলতি বছরে ভারতজুড়ে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ৬০০টিরও বেশি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় দুটি করে হামলা হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে জনতার হামলা, প্রকাশ্যে অপমান, গির্জার কার্যক্রমে বাধা এবং বাড়িঘর ভেঙে দেওয়ার মতো ঘটনা।
এদিকে, ভারতে ধর্মান্তরবিরোধী আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে এসব আইন জোরপূর্বক ধর্মান্তর ঠেকানোর উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করা হলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে বাস্তবে এগুলো প্রায়ই খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে হয়রানি ও নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে ভারতের ১২টি রাজ্যে এ ধরনের ধর্মান্তরবিরোধী আইন কার্যকর রয়েছে। চলতি বছর এসব আইনের আওতায় খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ১২৩টি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, আইনের অপব্যবহারের ফলে ধর্মীয় স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তারা এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনের প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সোমবারের এক ঘটনায় শাসক দল বিজেপির আঞ্চলিক নেতা অঞ্জু ভার্গবার নেতৃত্বে একটি দল মধ্যপ্রদেশের জবলপুর শহরের একটি খ্রিস্টান গির্জায় ঢুকে হামলা চালায়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ওই দলটি গির্জায় প্রবেশ করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক নারীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। এর আগের সপ্তাহে জবলপুর শহরেই আরেকটি গির্জায় একটি দল হামলা চালায়। তারা গির্জার ভেতরে থাকা উপাসকদের দিকে চেয়ার ছুড়ে মারেন এবং যাজকদের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগ তোলেন। পুলিশ জানিয়েছে, ওই ঘটনার পর কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।
এদিকে, চলতি মাসের শুরুতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা এবং একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এক বৈঠকে ভারতে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক হামলার ঘটনা হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা একে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিত ও ক্রমবর্ধমান নিপীড়ন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ভারতে খ্রিস্টানদের কোনো অপরাধের জন্য নয় বরং একত্রিত হওয়া, প্রার্থনা করা বা প্রতিবেশীদের সহায়তা করার কারণেই শাস্তির মুখে পড়তে হচ্ছে— এমন অভিযোগ করেছেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মীরা। অ্যালায়েন্স ডিফেন্ডিং ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনালের এশিয়া অঞ্চলের অ্যাডভোকেসি পরিচালক তেহমিনা আরোরাহ বলেন, ‘ভারতে খ্রিস্টানদের অপরাধের জন্য নয়, বরং শুধু সমবেত হওয়া, প্রার্থনা করা বা তাদের প্রতিবেশীদের সাহায্য করার কারণেই শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।’
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের (এমইপি) সঙ্গে আলোচনায় তিনি আরো বলেন, ‘ভারতের সুপ্রিম কোর্টও সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন যে ধর্মান্তরবিরোধী আইনগুলো অপব্যবহার করে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ভুলভাবে মামলা করা হচ্ছে।’