০৪:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

সীমান্ত হত্যা স্মরণ করাবে ফেলানী এভিনিউ

  • আপডেট সময়: ০১:০৬:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • 26

অনেক বছর পর বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াচ্ছে। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নির্মাণ করছে। ঢাকার ডিপ্লোমেটিক জোনে ফেলানী এভিনিউ এ বার্তাই দিচ্ছে।

রাজধানীর গুলশান-২ গোলচত্বর থেকে প্রগতি সরণি পর্যন্ত সড়কটির নতুন নামকরণ হয়েছে ফেলানী এভিনিউ। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান আনুষ্ঠানিকভাবে এই ‘ফেলানী এভিনিউ’-এর নামফলক উন্মোচন করেন। ভারতীয় হাইকমিশনের পাশের সড়কটির এই নামকরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের ভাষায়, ‘বাংলাদেশের মানুষ সীমান্ত হত্যা বন্ধ চায়।

আমাদের বোন ফেলানী কাঁটাতারে ঝুলন্ত অবস্থায় জীবন দিয়েছিল। আমরা এই কথাটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য, তার প্রতি কী ধরনের নৃশংসতা হয়েছিল, সেটা প্রতিদিন মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য সড়কের এই নাম দিয়েছি।’

তিনি আরো বলেছেন, ‘একই সঙ্গে বিশ্বের বিবেকের কাছে তুলে ধরেছি, সীমান্ত হত্যার মতো একটি জঘন্যতম পরিস্থিতি বাংলাদেশের সীমান্তে বিরাজ করছে। আর সে কারণে বর্তমান সরকার সব সীমান্ত হত্যা বন্ধ চায় বলেই আজকের বিজয় দিবসে ফেলানীর নামে সড়কের উদ্বোধন করলাম।’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৫-এর ২৫ মার্চে ঢাকার একটি নাগরিক পরিষদ ফেলানীর নামে ঢাকায় সড়কের নামকরণের দাবি করে। তারা বলে, ডিপ্লোমেটিক জোনের ভারতীয় হাইকমিশনের পাশের সড়কটি ফেলানী সরণি করতে হবে। অত্যন্ত যৌক্তিক দাবি। সরকার এই যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে সড়কটির নতুন নাম দিয়েছে ফেলানী এভিনিউ। এই নামকরণ যে হচ্ছে এই বার্তাটি প্রথম দেন সদ্যঃসাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

৯ ডিসেম্বর তিনি তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এই বার্তা দেন। সংক্ষিপ্ত এই বার্তায় বাংলাদেশের মানুষ আশায় বুক বাঁধে এবং তাদের আশা মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে পূরণ হয়।

ফেলানী এভিনিউ নামকরণ আর দশটা সড়কের নতুন নামকরণের মতো নয়। এই নামকরণের মধ্যে রয়েছে প্রতিবাদ, ঘৃণা ও আগ্রাসী সম্প্রসারণবাদী একটি দেশের চরিত্র উন্মোচন। সেই সঙ্গে ৮২ পাউন্ড ওজনের একটি প্রচণ্ড চপেটাঘাত।

মাহবুব আলম

অবশ্য আমাদের উপমহাদেশে এ ঘটনা নতুন নয়। পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহরেই ঘটেছে এমন একটি ঘটনা। ১৯৬৮ সাল। সময়টা ভিয়েতনাম যুদ্ধের। এই যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিরতিহীনভাবে ভিয়েতনামে টন টন বোমা ফেলে। এমনকি নিষিদ্ধ ঘোষিত ক্লাস্টার ও নাপাম বোমাও বর্ষণ করে নিরীহ নিরস্ত্র ভিয়েতনামবাসীর ওপর। ওই ঘটনার প্রতিবাদে সেই সময় কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের শান্তিকামী প্রগতিশীল ছাত্র-জনতা প্রায়ই কলকাতাস্থ মার্কিন কনসুলেট অফিস ঘেরাও করে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ দেখাত। এই প্রতিবাদ বিক্ষোভের মাঝে একদিন ছাত্র-জনতা হ্যারিংটন স্ট্রিটের যে রাস্তায় মার্কিন কনসুলেট, সেই রাস্তায় হ্যারিংটন স্ট্রিটের নামফলক মুছে দিয়ে তার ওপর লিখে দেয় হো চি মিন সরণি। ওই ঘটনার দীর্ঘ ২০ বছর পর বামফ্রন্ট শাসনামলে ১৯৯২ সালে হো চি মিনের শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এই সড়কের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে হো চি মিন সরণি রাখা হয়। কলকাতা মহানগরীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই সড়কের ও জওয়াহেরলাল নেহরু এভিনিউয়ের সংযোগস্থলে হো চি মিনের একটি ব্রোঞ্জমূর্তিও স্থাপন করা হয়।

এই হো চি মিন সড়কে শুধু মার্কিন কনসুলেট নয়, আছে ব্রিটেনের ডেপুটি হাইকমিশন অফিসও। এই ডেপুটি হাইকমিশনের ঠিকানা ১ এ হো চি মিন সরণি। আর মার্কিন কনসুলেটের ঠিকানা এস ১ হো চি মিন সরণি। এটি ছিল যুদ্ধবাজ, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের জনগণের তীব্র ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ, প্রতিবাদ ও চপেটাঘাত।

স্বাভাবিভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে, কোথায় হো চি মিন আর কোথায় ফেলানী খাতুন। এই প্রশ্ন উঠতেই পারে। হো চি মিন ছিলেন ভিয়েতনামের স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা। সারা দুনিয়ার মানুষ তাঁকে চেনে-জানে যে তিনি ছিলেন বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনেরও অন্যতম নেতা। বিশ্বব্যক্তিত্ব। কিন্তু ফেলানী খাতুন, তিনি কে? কী তাঁর পরিচয়? না, তিনি কোনো নেতা-নেত্রী ছিলেন না। ছিলেন না কোনো বিদ্বান-বিজ্ঞজন। এককথায় তিনি কোনো অভিজাত পরিবারের বিদুষী মহিলা ছিলেন না। তিনি ছিলেন অজ্ঞাত-অখ্যাত এক গ্রাম্য বালিকা। দিনমজুর-ক্ষেতমজুর পরিবারের সন্তান।

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার সময় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ তাঁকে গুলি করে। গুলিবিদ্ধ হয়ে ফেলানী আধাঘণ্টা ধরে ছটফট করতে করতে কাঁটাতারে ঝুলন্ত অবস্থায়ই নির্মমভাবে মারা যান। সকাল পৌনে ৭টা থেকে তাঁর নিথর দেহ কাঁটাতারেই ঝুলতে থাকে দীর্ঘ সাড়ে চার ঘণ্টা।

সীমান্তে কাঁটাতারে আটকে থাকা ফেলানীর ঝুলন্ত লাশের ছবি বিশ্বজুড়ে হৈচৈ ফেলে দেয়। সীমান্তে ভারতের এই বর্বরতা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ফেলানী হয়ে ওঠেন প্রতিবাদের প্রতীক। তার পরও ভারত এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার করেনি। বিচারের নামে তামাশা করেছে। অভিযুক্ত অমিয় ঘোষকে নির্দোষ ঘোষণা করে তাকে বেকসুর খালাস দিয়েছে।

ওই প্রহসনের বিচারের বিরুদ্ধে আমাদের দেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন সোচ্চার হলেও তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করেনি। কার্যত শেখ হাসিনার শাসনে ভারতের প্রতি নতজানু নীতির জন্যই সীমান্তে বিএসএফ যথেচ্ছ হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল—এই ১৮ বছরে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে দেড় হাজারে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ভারতের সীমান্ত হত্যা ও বর্বরতার প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছেন ফেলানী। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ায় ফেলানীর ঝুলন্ত লাশের ছবি দেখে সারা দুনিয়ার সঙ্গে আঁতকে উঠেছে বাংলাদেশের মানুষও। এই ঝুলন্ত লাশ যেন এক টুকরা বাংলাদেশ। তাই তাঁর কোনো বিজ্ঞজন বা বিখ্যাত কেউ হওয়ার প্রয়োজন নেই। তিনি এরই মধ্যে বিখ্যাত হয়ে গেছেন।

ফেলানী খাতুনের ঘটনা বাংলাদেশ সীমান্তে ঘটে চলা স্বেচ্ছাচারী সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনেরও প্রতীক। আর তাইতো ফেলানী এভিনিউয়ের নামফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ যথার্থই বলেছেন, ফেলানীর নামে নামকরণ হওয়া রাস্তাটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নতুন করে তৈরি হলো। বাংলাদেশ যে মাথা উঁচু করে সম্মান বজায় রাখতে পারে, তার প্রতীক এই রাস্তা।

ফেলানী হত্যাকাণ্ড নিছক সাধারণ কোনো হত্যাকাণ্ড নয়, মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই বোধবুদ্ধি ভারতের আজও হয়নি। আর হয়নি বলেই সীমান্তে হত্যাযজ্ঞও অব্যাহত আছে। ভারত বাংলাদেশকে মিত্র দেশ হিসেবে দেখছে যুগের পর যুগ। তার পরও মিত্রদেশের সীমান্তে লাগাতার হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। অথচ ভারত তার শত্রুদেশ হিসেবে চিহ্নিত চীন সীমান্তে একটি হত্যা করতেও সাহস দেখায় না। ওই সীমান্তে ভারত-চীন সীমান্তরক্ষীদের অস্ত্র বহন নিষিদ্ধ করে রেখেছে। অথচ বাংলাদেশ সীমান্তে কথায় কথায় অস্ত্রের ঝনঝনানি। কিন্তু কেন? এ বিষয়ে এখনই ভাবতে হবে। সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নতুন বাংলাদেশ নির্মাণে এটি জরুরি ও আবশ্যক। সেই আবশ্যকতা থেকেই আমাদের অভ্যন্তরীণ ও বিদেশনীতি তৈরি করতে হবে।

মাহবুব আলম: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

উত্তরাধুনিক

Writer, Singer & Environmentalist

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা প্রত্যাখ্যান করলো ইরান

সীমান্ত হত্যা স্মরণ করাবে ফেলানী এভিনিউ

আপডেট সময়: ০১:০৬:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬

অনেক বছর পর বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াচ্ছে। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নির্মাণ করছে। ঢাকার ডিপ্লোমেটিক জোনে ফেলানী এভিনিউ এ বার্তাই দিচ্ছে।

রাজধানীর গুলশান-২ গোলচত্বর থেকে প্রগতি সরণি পর্যন্ত সড়কটির নতুন নামকরণ হয়েছে ফেলানী এভিনিউ। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান আনুষ্ঠানিকভাবে এই ‘ফেলানী এভিনিউ’-এর নামফলক উন্মোচন করেন। ভারতীয় হাইকমিশনের পাশের সড়কটির এই নামকরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের ভাষায়, ‘বাংলাদেশের মানুষ সীমান্ত হত্যা বন্ধ চায়।

আমাদের বোন ফেলানী কাঁটাতারে ঝুলন্ত অবস্থায় জীবন দিয়েছিল। আমরা এই কথাটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য, তার প্রতি কী ধরনের নৃশংসতা হয়েছিল, সেটা প্রতিদিন মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য সড়কের এই নাম দিয়েছি।’

তিনি আরো বলেছেন, ‘একই সঙ্গে বিশ্বের বিবেকের কাছে তুলে ধরেছি, সীমান্ত হত্যার মতো একটি জঘন্যতম পরিস্থিতি বাংলাদেশের সীমান্তে বিরাজ করছে। আর সে কারণে বর্তমান সরকার সব সীমান্ত হত্যা বন্ধ চায় বলেই আজকের বিজয় দিবসে ফেলানীর নামে সড়কের উদ্বোধন করলাম।’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৫-এর ২৫ মার্চে ঢাকার একটি নাগরিক পরিষদ ফেলানীর নামে ঢাকায় সড়কের নামকরণের দাবি করে। তারা বলে, ডিপ্লোমেটিক জোনের ভারতীয় হাইকমিশনের পাশের সড়কটি ফেলানী সরণি করতে হবে। অত্যন্ত যৌক্তিক দাবি। সরকার এই যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে সড়কটির নতুন নাম দিয়েছে ফেলানী এভিনিউ। এই নামকরণ যে হচ্ছে এই বার্তাটি প্রথম দেন সদ্যঃসাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

৯ ডিসেম্বর তিনি তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এই বার্তা দেন। সংক্ষিপ্ত এই বার্তায় বাংলাদেশের মানুষ আশায় বুক বাঁধে এবং তাদের আশা মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে পূরণ হয়।

ফেলানী এভিনিউ নামকরণ আর দশটা সড়কের নতুন নামকরণের মতো নয়। এই নামকরণের মধ্যে রয়েছে প্রতিবাদ, ঘৃণা ও আগ্রাসী সম্প্রসারণবাদী একটি দেশের চরিত্র উন্মোচন। সেই সঙ্গে ৮২ পাউন্ড ওজনের একটি প্রচণ্ড চপেটাঘাত।

মাহবুব আলম

অবশ্য আমাদের উপমহাদেশে এ ঘটনা নতুন নয়। পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহরেই ঘটেছে এমন একটি ঘটনা। ১৯৬৮ সাল। সময়টা ভিয়েতনাম যুদ্ধের। এই যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিরতিহীনভাবে ভিয়েতনামে টন টন বোমা ফেলে। এমনকি নিষিদ্ধ ঘোষিত ক্লাস্টার ও নাপাম বোমাও বর্ষণ করে নিরীহ নিরস্ত্র ভিয়েতনামবাসীর ওপর। ওই ঘটনার প্রতিবাদে সেই সময় কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের শান্তিকামী প্রগতিশীল ছাত্র-জনতা প্রায়ই কলকাতাস্থ মার্কিন কনসুলেট অফিস ঘেরাও করে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ দেখাত। এই প্রতিবাদ বিক্ষোভের মাঝে একদিন ছাত্র-জনতা হ্যারিংটন স্ট্রিটের যে রাস্তায় মার্কিন কনসুলেট, সেই রাস্তায় হ্যারিংটন স্ট্রিটের নামফলক মুছে দিয়ে তার ওপর লিখে দেয় হো চি মিন সরণি। ওই ঘটনার দীর্ঘ ২০ বছর পর বামফ্রন্ট শাসনামলে ১৯৯২ সালে হো চি মিনের শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এই সড়কের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে হো চি মিন সরণি রাখা হয়। কলকাতা মহানগরীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই সড়কের ও জওয়াহেরলাল নেহরু এভিনিউয়ের সংযোগস্থলে হো চি মিনের একটি ব্রোঞ্জমূর্তিও স্থাপন করা হয়।

এই হো চি মিন সড়কে শুধু মার্কিন কনসুলেট নয়, আছে ব্রিটেনের ডেপুটি হাইকমিশন অফিসও। এই ডেপুটি হাইকমিশনের ঠিকানা ১ এ হো চি মিন সরণি। আর মার্কিন কনসুলেটের ঠিকানা এস ১ হো চি মিন সরণি। এটি ছিল যুদ্ধবাজ, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের জনগণের তীব্র ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ, প্রতিবাদ ও চপেটাঘাত।

স্বাভাবিভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে, কোথায় হো চি মিন আর কোথায় ফেলানী খাতুন। এই প্রশ্ন উঠতেই পারে। হো চি মিন ছিলেন ভিয়েতনামের স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা। সারা দুনিয়ার মানুষ তাঁকে চেনে-জানে যে তিনি ছিলেন বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনেরও অন্যতম নেতা। বিশ্বব্যক্তিত্ব। কিন্তু ফেলানী খাতুন, তিনি কে? কী তাঁর পরিচয়? না, তিনি কোনো নেতা-নেত্রী ছিলেন না। ছিলেন না কোনো বিদ্বান-বিজ্ঞজন। এককথায় তিনি কোনো অভিজাত পরিবারের বিদুষী মহিলা ছিলেন না। তিনি ছিলেন অজ্ঞাত-অখ্যাত এক গ্রাম্য বালিকা। দিনমজুর-ক্ষেতমজুর পরিবারের সন্তান।

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার সময় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ তাঁকে গুলি করে। গুলিবিদ্ধ হয়ে ফেলানী আধাঘণ্টা ধরে ছটফট করতে করতে কাঁটাতারে ঝুলন্ত অবস্থায়ই নির্মমভাবে মারা যান। সকাল পৌনে ৭টা থেকে তাঁর নিথর দেহ কাঁটাতারেই ঝুলতে থাকে দীর্ঘ সাড়ে চার ঘণ্টা।

সীমান্তে কাঁটাতারে আটকে থাকা ফেলানীর ঝুলন্ত লাশের ছবি বিশ্বজুড়ে হৈচৈ ফেলে দেয়। সীমান্তে ভারতের এই বর্বরতা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ফেলানী হয়ে ওঠেন প্রতিবাদের প্রতীক। তার পরও ভারত এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার করেনি। বিচারের নামে তামাশা করেছে। অভিযুক্ত অমিয় ঘোষকে নির্দোষ ঘোষণা করে তাকে বেকসুর খালাস দিয়েছে।

ওই প্রহসনের বিচারের বিরুদ্ধে আমাদের দেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন সোচ্চার হলেও তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করেনি। কার্যত শেখ হাসিনার শাসনে ভারতের প্রতি নতজানু নীতির জন্যই সীমান্তে বিএসএফ যথেচ্ছ হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল—এই ১৮ বছরে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে দেড় হাজারে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ভারতের সীমান্ত হত্যা ও বর্বরতার প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছেন ফেলানী। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ায় ফেলানীর ঝুলন্ত লাশের ছবি দেখে সারা দুনিয়ার সঙ্গে আঁতকে উঠেছে বাংলাদেশের মানুষও। এই ঝুলন্ত লাশ যেন এক টুকরা বাংলাদেশ। তাই তাঁর কোনো বিজ্ঞজন বা বিখ্যাত কেউ হওয়ার প্রয়োজন নেই। তিনি এরই মধ্যে বিখ্যাত হয়ে গেছেন।

ফেলানী খাতুনের ঘটনা বাংলাদেশ সীমান্তে ঘটে চলা স্বেচ্ছাচারী সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনেরও প্রতীক। আর তাইতো ফেলানী এভিনিউয়ের নামফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ যথার্থই বলেছেন, ফেলানীর নামে নামকরণ হওয়া রাস্তাটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নতুন করে তৈরি হলো। বাংলাদেশ যে মাথা উঁচু করে সম্মান বজায় রাখতে পারে, তার প্রতীক এই রাস্তা।

ফেলানী হত্যাকাণ্ড নিছক সাধারণ কোনো হত্যাকাণ্ড নয়, মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই বোধবুদ্ধি ভারতের আজও হয়নি। আর হয়নি বলেই সীমান্তে হত্যাযজ্ঞও অব্যাহত আছে। ভারত বাংলাদেশকে মিত্র দেশ হিসেবে দেখছে যুগের পর যুগ। তার পরও মিত্রদেশের সীমান্তে লাগাতার হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। অথচ ভারত তার শত্রুদেশ হিসেবে চিহ্নিত চীন সীমান্তে একটি হত্যা করতেও সাহস দেখায় না। ওই সীমান্তে ভারত-চীন সীমান্তরক্ষীদের অস্ত্র বহন নিষিদ্ধ করে রেখেছে। অথচ বাংলাদেশ সীমান্তে কথায় কথায় অস্ত্রের ঝনঝনানি। কিন্তু কেন? এ বিষয়ে এখনই ভাবতে হবে। সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নতুন বাংলাদেশ নির্মাণে এটি জরুরি ও আবশ্যক। সেই আবশ্যকতা থেকেই আমাদের অভ্যন্তরীণ ও বিদেশনীতি তৈরি করতে হবে।

মাহবুব আলম: সাংবাদিক ও কলামিস্ট