
ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যকার সম্পর্কে আবারও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এবার বিষয়টি কোনো শুল্ক হুমকি বা কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর মন্তব্য নয়, বরং কানাডার পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ আলবার্টাকে দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার আন্দোলন। এমনকি স্বাধীন হতে একটি গোষ্ঠী দাবি তুলেছে গণভোটের।
চলতি সপ্তাহে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আবারও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘কানাডার সার্বভৌমত্বকে সম্মান করার’ আহ্বান জানান।
এর আগে ফিন্যানশিয়াল টাইমস এক প্রতিবেদনে জানায়, গত বছরের এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা তিন দফায় এমন একটি গোষ্ঠীর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, যারা আলবার্টাকে কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়।
‘আলবার্টা প্রসপারিটি প্রজেক্ট’ নামের ওই গোষ্ঠী আলবার্টার স্বাধীনতা প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। গোষ্ঠীটির এক নেতার সামাজিক মাধ্যম এক্স-এর পোস্ট অনুযায়ী, ‘স্বাধীন ও মুক্ত আলবার্টায় রূপান্তরের’ জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের কাছে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের ঋণসুবিধা চাওয়ার পরিকল্পনাও করছে।
তবে হোয়াইট হাউস এই বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিভিন্ন নাগরিক সমাজের সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করে থাকেন, তবে আলবার্টা প্রসঙ্গে কোনো ধরনের সমর্থন বা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি।
তবুও এই খবর কানাডায় ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপ ও ভূখণ্ডগত হুমকির মুখে যখন দেশটি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে, তখন এমন বৈঠকের খবর নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করেছে। প্রতিবেশী প্রদেশ ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার নেতা আলবার্টার এই উদ্যোগকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল’ বলে মন্তব্য করেছেন।
আলবার্টা কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
আলবার্টা কানাডার পশ্চিমাঞ্চলের একটি তেলসমৃদ্ধ প্রদেশ, আয়তনে প্রায় যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের সমান। প্রায় ৫০ লাখ মানুষের বসবাস এই প্রদেশে। রকি পর্বতমালা, ব্যানফ ও লেক লুইসের মতো পর্যটনকেন্দ্র এখানেই অবস্থিত।
প্রদেশটি তার শক্তিশালী জ্বালানি ও কৃষি খাত, কম করব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের কারণে আলাদা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচিতি গড়ে তুলেছে। কানাডার মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৪ শতাংশ উৎপাদন হয় এখানকার অয়েল স্যান্ডস (অপরিশোধিত তেলের প্রাকৃতিক মিশ্রণ) অঞ্চল থেকে।
রাজনৈতিকভাবে আলবার্টা কানাডার রক্ষণশীল রাজনীতির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, যদিও ক্যালগারি ও এডমন্টনের মতো শহর তুলনামূলকভাবে উদারপন্থী।
কেন বিচ্ছিন্ন হতে চায় একাংশ
আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, ফেডারেল সরকারে তাদের স্বার্থ যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব পায় না। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অটোয়ার নীতির কারণে আলবার্টার তেলশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া তারা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে করের বিপরীতে ততটা সুবিধা পায় না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘পশ্চিমা বিচ্ছিন্নতার’ এই অনুভূতি নতুন নয়। তবে কোভিড-১৯ লকডাউন, দীর্ঘদিন ধরে লিবারেল সরকারের শাসন এবং সাম্প্রতিক ট্রাম্পবিরোধী জাতীয়তাবাদী আবহ এই আন্দোলনকে আরও উসকে দিয়েছে।
২০২৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনে ট্রাম্পবিরোধী আবেগের জোয়ারে লিবারেলদের জয়ের পর আলবার্টার আইনসভা স্বাধীনতা প্রশ্নে গণভোট আয়োজন সহজ করতে একটি আইন পাস করে।
তবে এখনো এই আন্দোলনের কোনো শক্ত সংগঠিত নেতৃত্ব নেই। আলবার্টার আইনসভায় বিচ্ছিন্নতাবাদী কোনো দল আসন পায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনটি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় কিছু কর্মীর ওপর নির্ভরশীল।
ট্রাম্পের প্রভাব
ডোনাল্ড ট্রাম্পের আবারও মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়া এই আন্দোলনে নতুন গতি এনেছে। তেলপন্থী ও রক্ষণশীল ট্রাম্পকে কেউ কেউ আলবার্টার সম্ভাব্য মিত্র হিসেবে দেখছেন। গত গ্রীষ্মে আলবার্টার স্বাধীনতার পক্ষে আয়োজিত এক সমাবেশে ‘মেক আলবার্টা গ্রেট এগেইন’ লেখা টুপি দেখা গেছে। কেউ কেউ আবার আলবার্টাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার পক্ষেও স্লোগান তুলেছেন।
এমনকি সম্প্রতি ক্যালগারি ও এডমন্টনের মধ্যবর্তী মহাসড়কে একটি বিলবোর্ডে আলবার্টাকে যুক্তরাষ্ট্রে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয় কতটা বাস্তবসম্মত?
বিশ্লেষকদের মতে, আলবার্টায় গণভোট হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও বিচ্ছিন্নতার পক্ষে জনসমর্থন এখনো কম। জানুয়ারিতে করা এক জরিপে মাত্র ১৯ শতাংশ আলবার্টাবাসী স্বাধীনতার পক্ষে মত দিয়েছেন।
অনেকে মনে করেন, গণভোটে আগ্রহ দেখানো অনেকেই প্রকৃত বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং অটোয়ার সঙ্গে দরকষাকষিতে শক্ত অবস্থান নিতে চান।
আদিবাসী গোষ্ঠীগুলো এই উদ্যোগের অন্যতম বড় সমালোচক। তাদের সঙ্গে কানাডা সরকারের করা চুক্তিগুলো আলবার্টা প্রদেশ গঠনের আগের। এই চাপের মুখে সরকার গণভোট আইনে তাদের অধিকার সুরক্ষার একটি ধারা যুক্ত করেছে।
আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ বলেছেন, তিনি বিচ্ছিন্নতার পক্ষে নন, তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগকে ‘যৌক্তিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, গণভোটে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে রায় এলেও প্রক্রিয়াটি হবে অত্যন্ত জটিল ও অস্থিতিশীল। আলবার্টা স্বাধীন রাষ্ট্র হবে নাকি যুক্তরাষ্ট্রে যোগ দেবে, এমন মৌলিক প্রশ্নগুলোর এখনো কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই।
























