০৪:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ইরানকে ঘিরে ‘নরকের আগুনের’ মতো ছক কষছে যুক্তরাষ্ট্র

  • আপডেট সময়: ০৭:২৪:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • 2

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের চারপাশে মোতায়েন মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিপুল সামরিক শক্তি ঠিক ‘দান্তের ইনফার্নো’ বা ‘নরকের আগুনের’ মতো, এর পরিসর ও কৌশল ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ এবং ১৯৯০-৯১ সালের পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের সমান। আর যুক্তরাষ্ট্রে এই বিশাল পরিকল্পনার একেবারে কেন্দ্রে রয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল জেমস জি স্ট্যাভরিডিস।

সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর সাবেক সুপ্রিম অ্যালায়েড কমান্ডার স্ট্যাভরিডিস বলেন, ‘আপনি ২০০৩ সালের (ইরাক যুদ্ধ) সঙ্গে তুলনা দিয়ে শুরু করেতে পারেন, আবার ১৯৯০ সালের পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের সঙ্গেও তুলনীয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক শক্তি। বাইরে থেকে ভেতরের দিকে, দান্তের ইনফার্নোর মতো একের পর এক সমকেন্দ্রিক বলয়ে নেমে আসার কথা ভাবুন। বাইরের সব বলয়ে রয়েছে কৌশলগত বোমারু বিমান; যেগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকেই উড়ে আসতে কিংবা অন্য ঘাঁটি থেকে পরিচালিত হতে পারে।’

প্রসঙ্গত, ‘দান্তের ইনফার্নো’ হলো চতুর্দশ শতাব্দির কবি দান্তে আলিগিয়েরির লেখা একটি কবিতা; যেখানে নরককে ৯টি বৃত্ত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি বৃত্তে শাস্তির মাত্রা ক্রমান্বয়ে আরও কঠোর হয়।

অ্যাডমিরাল স্ট্যাভরিডিস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ পরিধির ভেতরে রয়েছে দুটি বিমানবাহী রণতরী; একটি উত্তর ভারত মহাসাগরে, অন্যটি সিরিয়ার পাশে ইসরায়েলের কাছে। প্রতিটিতে প্রায় ৮০টি করে যুদ্ধবিমান রয়েছে; যার মধ্যে এফ-৩৫ ও এফ/এ-১৮ হর্নেটও অন্তর্ভুক্ত। আরও ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, সাইবার সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক ঘাঁটিতে মোতায়েনকৃত বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান।

তিনি আরও বলেন, ‘এই নরকের আগুনের একেবারে কেন্দ্রে আছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে একমত। তার (খামেনি) জন্য আলোচনা করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।’

স্ট্যাভরিডিস বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ড্রোন পাঠাতে পারে, সাইবার সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে। আবার ওই অঞ্চলে অনেক ঘাঁটিতে রয়েছে বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানও, যা ব্যবহারের জন্য প্রস্তত। তাই দান্তের ইনফার্নোর মতো ধাপে ধাপে নেমে আসার কথা ভাবতে হবে।

এদিকে বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে কূটনীতি সফল হবে নাকি যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নেবে—তা ‘সম্ভবত আগামী ১০ দিনের মধ্যেই’ বিশ্ব জানতে পারবে।

মূলত, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে সন্দেহ করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। যদিও বরাবরের মতো এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে তেহরান। এবিষয়ে সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের সাম্প্রতিক আলোচনায় তেমন কোনও অগ্রগতি দেখা যায়নি।

বৃহস্পতিবার পুনরায় শুরু হতে যাওয়া পারমাণবিক আলোচনায় ইরানকে চুক্তিতে রাজি করাতে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বৈঠকে কোনও ধরনের সমঝোতা না হলে তেহরানে সীমিত হামলা চালানো হতে পারে বলেও জানিয়েছেন ট্রাম্প।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, ট্রাম্প নিজের উপদেষ্টাদের জানিয়ে দিয়েছেন: কূটনীতি বা সীমিত হামলা যদি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থামাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে দেশটির নেতৃত্বের ওপর চাপ বাড়াতে বিপ্লবী গার্ড, পারমাণবিক স্থাপনা ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।

অন্যদিকে ইরান অভিযোগ করেছে, সামরিক শক্তি জড়ো করা ও সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একটি সংকটের ঝুঁকি তৈরি করছে। ওয়াশিংটনের বক্তব্য প্রকৃত সামরিক আগ্রাসনের হুমকির ইঙ্গিত দেয় এবং যেকোনও হামলার একেবারে সুনির্দিষ্ট জবাব দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, সীমিত হামলাসহ যেকোনও আঘাতই পরিষ্কারভাবে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে গণ্য হবে।

সোমবার তেহরানে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি বলেছেন, ‘যেকোনও রাষ্ট্র তার আত্মরক্ষার স্বাভাবিক অধিকারের অংশ হিসেবে আগ্রাসনের জবাবে ভয়ঙ্করভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়; আমরাও তাই করব।’

এর কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ চরিত্র নিশ্চিত করতে পূর্ণাঙ্গ নজরদারি ব্যবস্থায় যেতে প্রস্তুত। এতে উত্তেজনা কমবে বলেও তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।

মার্কিন গণমাধ্যম সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাঘচি বলেন, নিজ দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাওয়াটা ইরানের জন্য ‘মর্যাদা ও গর্বের’ বিষয়। ইরানি বিজ্ঞানীরা নিজেরাই এই প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, তবে এর জন্য দেশটিকে বড় মূল্য দিতে হয়েছে।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, ইরানি বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড এবং গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কথাও উল্লেখ করেন।

সূত্র: রয়টার্স, এনডিটিভি

উত্তরাধুনিক

Writer, Singer & Environmentalist
জনপ্রিয়

ইরানকে ঘিরে ‘নরকের আগুনের’ মতো ছক কষছে যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট সময়: ০৭:২৪:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের চারপাশে মোতায়েন মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিপুল সামরিক শক্তি ঠিক ‘দান্তের ইনফার্নো’ বা ‘নরকের আগুনের’ মতো, এর পরিসর ও কৌশল ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ এবং ১৯৯০-৯১ সালের পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের সমান। আর যুক্তরাষ্ট্রে এই বিশাল পরিকল্পনার একেবারে কেন্দ্রে রয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল জেমস জি স্ট্যাভরিডিস।

সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর সাবেক সুপ্রিম অ্যালায়েড কমান্ডার স্ট্যাভরিডিস বলেন, ‘আপনি ২০০৩ সালের (ইরাক যুদ্ধ) সঙ্গে তুলনা দিয়ে শুরু করেতে পারেন, আবার ১৯৯০ সালের পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের সঙ্গেও তুলনীয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক শক্তি। বাইরে থেকে ভেতরের দিকে, দান্তের ইনফার্নোর মতো একের পর এক সমকেন্দ্রিক বলয়ে নেমে আসার কথা ভাবুন। বাইরের সব বলয়ে রয়েছে কৌশলগত বোমারু বিমান; যেগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকেই উড়ে আসতে কিংবা অন্য ঘাঁটি থেকে পরিচালিত হতে পারে।’

প্রসঙ্গত, ‘দান্তের ইনফার্নো’ হলো চতুর্দশ শতাব্দির কবি দান্তে আলিগিয়েরির লেখা একটি কবিতা; যেখানে নরককে ৯টি বৃত্ত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি বৃত্তে শাস্তির মাত্রা ক্রমান্বয়ে আরও কঠোর হয়।

অ্যাডমিরাল স্ট্যাভরিডিস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ পরিধির ভেতরে রয়েছে দুটি বিমানবাহী রণতরী; একটি উত্তর ভারত মহাসাগরে, অন্যটি সিরিয়ার পাশে ইসরায়েলের কাছে। প্রতিটিতে প্রায় ৮০টি করে যুদ্ধবিমান রয়েছে; যার মধ্যে এফ-৩৫ ও এফ/এ-১৮ হর্নেটও অন্তর্ভুক্ত। আরও ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, সাইবার সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক ঘাঁটিতে মোতায়েনকৃত বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান।

তিনি আরও বলেন, ‘এই নরকের আগুনের একেবারে কেন্দ্রে আছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে একমত। তার (খামেনি) জন্য আলোচনা করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।’

স্ট্যাভরিডিস বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ড্রোন পাঠাতে পারে, সাইবার সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে। আবার ওই অঞ্চলে অনেক ঘাঁটিতে রয়েছে বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানও, যা ব্যবহারের জন্য প্রস্তত। তাই দান্তের ইনফার্নোর মতো ধাপে ধাপে নেমে আসার কথা ভাবতে হবে।

এদিকে বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে কূটনীতি সফল হবে নাকি যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নেবে—তা ‘সম্ভবত আগামী ১০ দিনের মধ্যেই’ বিশ্ব জানতে পারবে।

মূলত, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে সন্দেহ করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। যদিও বরাবরের মতো এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে তেহরান। এবিষয়ে সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের সাম্প্রতিক আলোচনায় তেমন কোনও অগ্রগতি দেখা যায়নি।

বৃহস্পতিবার পুনরায় শুরু হতে যাওয়া পারমাণবিক আলোচনায় ইরানকে চুক্তিতে রাজি করাতে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বৈঠকে কোনও ধরনের সমঝোতা না হলে তেহরানে সীমিত হামলা চালানো হতে পারে বলেও জানিয়েছেন ট্রাম্প।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, ট্রাম্প নিজের উপদেষ্টাদের জানিয়ে দিয়েছেন: কূটনীতি বা সীমিত হামলা যদি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থামাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে দেশটির নেতৃত্বের ওপর চাপ বাড়াতে বিপ্লবী গার্ড, পারমাণবিক স্থাপনা ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।

অন্যদিকে ইরান অভিযোগ করেছে, সামরিক শক্তি জড়ো করা ও সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একটি সংকটের ঝুঁকি তৈরি করছে। ওয়াশিংটনের বক্তব্য প্রকৃত সামরিক আগ্রাসনের হুমকির ইঙ্গিত দেয় এবং যেকোনও হামলার একেবারে সুনির্দিষ্ট জবাব দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, সীমিত হামলাসহ যেকোনও আঘাতই পরিষ্কারভাবে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে গণ্য হবে।

সোমবার তেহরানে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি বলেছেন, ‘যেকোনও রাষ্ট্র তার আত্মরক্ষার স্বাভাবিক অধিকারের অংশ হিসেবে আগ্রাসনের জবাবে ভয়ঙ্করভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়; আমরাও তাই করব।’

এর কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ চরিত্র নিশ্চিত করতে পূর্ণাঙ্গ নজরদারি ব্যবস্থায় যেতে প্রস্তুত। এতে উত্তেজনা কমবে বলেও তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।

মার্কিন গণমাধ্যম সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাঘচি বলেন, নিজ দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাওয়াটা ইরানের জন্য ‘মর্যাদা ও গর্বের’ বিষয়। ইরানি বিজ্ঞানীরা নিজেরাই এই প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, তবে এর জন্য দেশটিকে বড় মূল্য দিতে হয়েছে।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, ইরানি বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড এবং গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কথাও উল্লেখ করেন।

সূত্র: রয়টার্স, এনডিটিভি