মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ জনজীবন। ছবি: ঢাকা মেইল
রাত তখন প্রায় সাড়ে ১১টা। মিরপুর ১০–এর এ ব্লকের ছোট্ট ফ্ল্যাটে বাতি নেভানো, কিন্তু ঘুম নেই। মশারির ভেতরেও একটানা ভনভন শব্দ। রাশেদ চৌধুরী বিছানায় উঠে বসেন। কিছুদিন আগেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের বেডে কেটেছে তার টানা কয়েকটা দিন। সেরে উঠে ভেবেছিলেন অন্তত বাসায় শান্তি মিলবে। কিন্তু জানালা বন্ধ, কয়েল জ্বালানো, তবু যেন চারদিক থেকে মশা এসে ঘিরে ধরে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, মনে হয় আমরা যুদ্ধ করছি, কিন্তু প্রতিপক্ষকে দেখা যায় না।
শুধু রাশেদ চৌধুরী নন; এই অভিজ্ঞতাই এখন রাজধানীর লাখো মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, ঢাকায় মশার উপদ্রব শুধু বেড়েছে তা নয়, তা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে। জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে মশার ঘনত্ব ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির, যা মূলত নর্দমা ও দূষিত পানিতে বংশবিস্তার করে।
সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণা, মাঠ জরিপ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীতে মশার ঘনত্ব ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির। মার্চে তাপমাত্রা আরও বাড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা দুইভাবে পরিস্থিতি যাচাই করেন—লার্ভা বা শূককীটের ঘনত্ব এবং পূর্ণবয়স্ক মশার উপস্থিতি গণনা করে।
লার্ভা পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন জলাশয় থেকে ২৫০ মিলিলিটার পানি সংগ্রহ করে তাতে লার্ভা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে গড়ে ৮৫০টি লার্ভা পাওয়া গেলেও ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় গড়ে ১ হাজার ২৫০–এ। পূর্ণবয়স্ক মশার উপস্থিতি নিরূপণে একজন মানুষের হাঁটু পর্যন্ত পা ও বাহু উন্মুক্ত রেখে এক ঘণ্টায় কতটি মশা কামড়াতে আসে, তা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ৪০০ থেকে ৬০০। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে গড়ে ৮৫০–এ পৌঁছেছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বিশ্বমানে এক ঘণ্টায় পাঁচটি মশা কামড়াতে এলেই তা উদ্বেগজনক ধরা হয়। সেখানে ঢাকায় ৮৫০টি মশা কামড়াতে আসে। যা মারাত্মক বিপজ্জনক। রাজধানীর সর্বত্র সমানভাবে মশা নেই। কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, শনির আখড়া, শ্যামপুর, রায়েরবাজার, উত্তরা ও সাভার এলাকায় লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক মশার ঘনত্ব বেশি। তুলনামূলকভাবে শাহবাগ ও পরীবাগ এলাকায় কম পাওয়া গেছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সহযোগিতায় রাজধানীর পাঁচ এলাকায় ২৪ ঘণ্টা ফাঁদ পেতে মশা সংগ্রহ করা হয়। ১৬ থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ দিনে ১৭ হাজার ১৫৯টি মশা ধরা পড়ে। ৩০ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একই পদ্ধতিতে পাওয়া যায় ২২ হাজার ৩৬২টি। উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের পার্ক, মিরপুর ২–এর ভান্ডার শাখা অফিস, গুলশান ১–এর পুরোনো ভান্ডার অফিস, মিরপুর ১–এর ১০ নম্বর ওয়ার্ড কমিউনিটি সেন্টার ও মোহাম্মদপুরের আঞ্চলিক অফিস এলাকা ছিল জরিপের আওতায়।
বাংলাদেশে সাধারণত তিন প্রজাতির মশা বেশি দেখা যায়—কিউলেক্স, এডিস ও অ্যানোফিলিস। এর মধ্যে কিউলেক্সের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। কিউলেক্সের কামড়ে ফাইলেরিয়া ও জাপানি এনসেফালাইটিসের ঝুঁকি থাকে।

ফগিং করলেও নেই কার্যকারিতা। ছবি: ঢাকা মেইল
আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৩ সালে দেশের মোট ডেঙ্গু রোগীর অর্ধেকের বেশি শনাক্ত হয় ঢাকায়। একই বছরে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশই ঘটে রাজধানীতে। গবেষণায় ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোকে ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, সবুজবাগ, শ্যামপুর, তেজগাঁও, ধানমন্ডি ও উত্তরা রয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে এক মাসেই ২৪ হাজার ৫০০–এর বেশি রোগী এবং ১০০–এর বেশি মৃত্যু রেকর্ড হয়েছে।
মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ নগরবাসী
মিরপুর–১০–এর শাহ আলী মার্কেটের ব্যবসায়ী আবরার আল করীম সরকার বলেন, দোকানে বসে থাকা দায় হয়ে গেছে। গ্রাহক আসে, কিছুক্ষণ পর মশার যন্ত্রণায় চলে যায়। বাসায় ফিরেও একই অবস্থা। শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা পারভিন তালুকদার জানান, আগে সন্ধ্যার পর মশা বাড়ত, এখন দিনভর উপদ্রব। দরজা–জানালা বন্ধ রেখেও রেহাই নেই।
শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা মাহমুদ হাসান বলেন, বিকেল হলেই বারান্দায় দাঁড়ানো যায় না।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী আফসানা তাজরিমিন জানান, পড়তে বসলে মশা ঘিরে ধরে। অ্যারোসল ব্যবহার করলে কিছুক্ষণ কমে, পরে আবার আগের মতো হয়।
মেট্রোরেলের ভেতরেও মশার উৎপাত বাড়ার কথা জানান যাত্রী আরিফুল হক। তিনি বলেন, ট্রেনের ভেতরেও মশা দেখা যাচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকলে কামড়ায়, বসে থাকলেও রেহাই নেই। আগে ভাবতাম এমন আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থায় এসব সমস্যা থাকবে না। এখন যাতায়াতের সময়েও মশার সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ী আবদুর রহমান বলেন, শিশুদের ঘুম বিঘ্নিত হচ্ছে। মশারি, কয়েল, স্প্রে—সবকিছু ব্যবহার করেও পুরোপুরি সুরক্ষা মিলছে না। এতে গৃহস্থালি ব্যয়ও বাড়ছে।
আইনি নোটিশ
এদিকে মশার উপদ্রব বন্ধ ও উৎসস্থল ধ্বংসে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব এবং ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন আইনজীবী এইচ এম রাশিদুল ইসলাম। নোটিশে সাত দিনের মধ্যে পদক্ষেপ না নিলে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০২ অনুযায়ী রিট পিটিশন দায়েরের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

মশা নিধনের পদ্ধতি পাল্টানোর তাগিদ বিশেষজ্ঞদের। ছবি: ঢাকা মেইল
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি নিজে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং অক্টোবরে জান্নাতি রেহানা নামের এক নারী ডেঙ্গুতে মারা যান। এতে বলা হয়, এডিস ও কিউলেক্সের আধিক্য নাগরিকের জীবন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘনের শামিল।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী ঢাকা মেইলকে বলেন, একবার পরিষ্কার করলে দ্রুতই আবার জলাশয় আবর্জনায় ভরে যায়। খোলা নর্দমা ও অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু ফগিং করে সমাধান সম্ভব নয়; কার্যকর ড্রেনেজ ও বর্জ্য অপসারণ জরুরি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান ঢাকা মেইলকে জানান, নিয়মিত লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড প্রয়োগ করা হচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে নির্ধারিতসংখ্যক কর্মী কাজ করছেন। তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নালা পরিষ্কার অন্য বিভাগের দায়িত্ব হওয়ায় সমন্বয়ের ঘাটতি রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মত, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে মাঠপর্যায়ের তদারকি দুর্বল হয়েছে। জনপ্রতিনিধিরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে সচেতনতা তৈরি করতে পারেন। সেই জায়গায় ঘাটতি তৈরি হলে কর্মসূচি কাগজে থাকলেও বাস্তবে প্রভাব কম পড়ে। শুধু ফগিং বা ধোঁয়া ছিটানো তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে সমাধান নয়। প্রয়োজন নিয়মিত নালা–নর্দমা পরিষ্কার, জলাশয়ে লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, নির্মীয়মাণ ভবনে জমে থাকা পানি অপসারণ, আবর্জনা ব্যবস্থাপনার সংস্কার এবং জনসচেতনতা।
অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, বর্তমানে কিউলেক্স মশার প্রকোপ বেশি। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে এপ্রিল মাস থেকেই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে চলতি বছরে ডেঙ্গুর প্রকোপ সামাল দেওয়া সহজ হবে। এখনই জরুরি ভিত্তিতে লার্ভিসাইডিং জোরদার ও নালা–ডোবা পরিষ্কার না করলে মার্চে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। এটি কেবল মৌসুমি সমস্যা নয়; নগর ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। -আব্দুল হাকিম