০৪:১৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আল-জাজিরার বিশ্লেষণ: সংসদে ৬ আসন পাওয়া এনসিপির পরবর্তী লক্ষ্য কী?

  • আপডেট সময়: ০২:০৫:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • 2

রুহুল আমিন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি মোহভঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য তৃতীয় শক্তির জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাবেক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর যখন ছাত্র নেতারা- ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) নামে একটি দল গঠন করেছিলেন, তখন ৩০ বছর বয়সী আমিন অনুভব করেছিলেন যে তিনি অবশেষে এমন একটি দল খুঁজে পেয়েছেন যাকে তিনি ভোট দিতে পারেন এবং নিজের দল হিসেবে মনে করতে পারেন।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপির পথচলা শুরু হয়। দলটির তরুণ নেতারা ব্যাপক জনসমর্থন এবং ভালো নির্বাচনী ফলাফলের দাবি করেন, এমনকি ভবিষ্যতের সরকার গঠনেরও ইঙ্গিত দেন।

কিন্তু শীঘ্রই তারা বাস্তবতা বুঝতে পারেন। গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র নেতারা যে গতি এবং ব্যাপক সমর্থন উপভোগ করেছিলেন তা সত্ত্বেও সংগঠন হিসেবে এনসিপি নিজেদেরকে তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের সেভাবে সংগঠিত করতে পারেনি, যা সংসদে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য যথেষ্ট সক্ষম।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের দেখা গেছে যে, দলের সমর্থনে নির্বাচিত সদস্য সংখ্যা সিঙ্গেল ডিজিট, মাত্র ৬ জন।

নির্বাচনের আগে এনসিপি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটভুক্ত হয়। অংশীদার হিসেবে একটি চুক্তি করে, ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে মাত্র ৩০টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং ছয়টি জিতে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে একটি জোট ২১২টি আসন নিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করে, যেখানে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট ৭৭টি আসন পায়। কিন্তু এতে আমিনের মনোবলকে ভেঙে পড়েনি।

বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় কুষ্টিয়া জেলার এই যুবক বার্তাসংস্থা আল জাজিরাকে বলেন, নতুন দল হিসেবে আমরা এই নির্বাচনে ভালো করেছি। আগামী কয়েকটি নির্বাচনে এনসিপি নতুন দল হিসেবে আরও ভালো কিছু করবে বলে আমরা আশাবাদী।

গণঅভ্যুত্থান থেকে সংসদে

২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বেশ কয়েকজন এনসিপি নেতা এখন সংসদ সদস্য। তাদের সমর্থকরা মনে করেন, সদ্য জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক দল হিসেবে সংসদে ছয়টি আসন পাওয়াই একটি অপ্রত্যাশিত অগ্রগতির জানান দেয়।

তবে সমালোচকদের মতে, লড়াই- আন্দোলনে এ দলের যে পারফরম্যান্স ছিল, রাজনীতিতে রূপান্তরিত হওয়া পর তাদের সেই দাপট পরিলক্ষীত হয়নি।

তবে, এনসিপির মুখপাত্র ও তাদের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান আসিফ মাহমুদ নির্বাচনের ফলাফলকে উৎসাহব্যঞ্জক বলে বর্ণনা করেছেন।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, মাত্র ১১ মাস বয়সী একটি দলের জন্য এটি একটি খুব ভালো পারফরম্যান্স ছিল। অবশ্য এটা আরও ভালো হতে পারত। আমরা আরও বেশি আশা করেছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা খুশি।

মাহমুদ যুক্তি দিয়ে বলেন, ভোট গণনায় অনিয়ম না হলে এনসিপি হয়তো আরও দুটি বা তিনটি আসন বেশি পেতো। এ ব্যাপারে প্রমাণ আছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের দল ইতিমধ্যেই নির্বাচনী প্রক্রিয়া চলাকালীন তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

তবুও, তিনি স্বীকার করেছেন যে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য আপস প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, এনসিপি প্রথমে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিল। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর কারণে, সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এবং রাজনৈতিক মাঠে টিকে থাকার জন্য আমাদের একটি জোটে প্রবেশ করতে হয়েছিল।আসলে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন করে এনসিপির নির্বাচন-পরবর্তী ভবিষ্যতের জন্য।

জোটের রাজনীতি এবং অভ্যন্তরীণ ভাঙন

বাংলাদেশের বৃহত্তম ধর্মভিত্তিক দল জামায়াত ঐতিহাসিকভাবে ইসলামী আইনের পক্ষে কথা বলে আসছে এবং নারী অধিকারের বিষয়ে রক্ষণশীল অবস্থান ধরে রেখেছে।

দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক, ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের প্রতি আস্থা রাখার জন্য দলটির সাম্প্রতিক প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও জামায়াতের সঙ্গে জোট করার সিদ্ধান্তে এনসিপির মধ্যে অভ্যন্তরীণ ফাটল তৈরি করে। নিজেদের ধর্শনিরপেক্ষতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের প্রমাণ দিতে এবার প্রথমবারের মতো তারা নির্বাচনে একজন হিন্দু প্রার্থীকে দল থেকে মনোনয়ন দেন।

জোট ঘোষণার এক সপ্তাহের মধ্যে দলের এক ডজনেরও বেশি সিনিয়ার নেতা পদত্যাগ করেন, কারণ তারা মনে করেন যে জামাতের সঙ্গে জোট করা এনসিপির আদর্শের পাশাপাশি ২০২৪ সালের গণঅভূত্থানের মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে অসঙ্গতিপূর্ণ।

তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, জোটটি তাদের দলের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং এর উদারপন্থী ভিত্তিকে দুর্বল করে দেবে। কিন্তু মাহমুদ এই ধরনের আশঙ্কা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তিনি আল জাজিরাকে  বলেন, আমরা কোনো ছায়া রাজনীতি করছি না। আপনি যদি আমাদের বক্তব্য লক্ষ্য করেন, তাহলে দেখবেন যে এগুলো জামায়াতের বক্তব্যের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়।

এনসিপির মুখপাত্র বলেন, আমরা আমাদের কর্মকাণ্ড রাস্তা থেকে শুরু করেছি। এখন আমরা সংসদে আছি। আমরা আর পিছনে ফিরে যেতে চাই না।

পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে, বিশেষ করে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আর জামায়াতের সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করবে না এনসিপি। ভবিষ্যতে তারা যে কোনও নির্বাচনে একক দল হিসেবে লড়াই করবে বলেও জানান দলের মুখপাত্র।

 

উত্তরাধুনিক

Writer, Singer & Environmentalist

আল-জাজিরার বিশ্লেষণ: সংসদে ৬ আসন পাওয়া এনসিপির পরবর্তী লক্ষ্য কী?

আল-জাজিরার বিশ্লেষণ: সংসদে ৬ আসন পাওয়া এনসিপির পরবর্তী লক্ষ্য কী?

আপডেট সময়: ০২:০৫:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রুহুল আমিন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি মোহভঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য তৃতীয় শক্তির জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাবেক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর যখন ছাত্র নেতারা- ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) নামে একটি দল গঠন করেছিলেন, তখন ৩০ বছর বয়সী আমিন অনুভব করেছিলেন যে তিনি অবশেষে এমন একটি দল খুঁজে পেয়েছেন যাকে তিনি ভোট দিতে পারেন এবং নিজের দল হিসেবে মনে করতে পারেন।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপির পথচলা শুরু হয়। দলটির তরুণ নেতারা ব্যাপক জনসমর্থন এবং ভালো নির্বাচনী ফলাফলের দাবি করেন, এমনকি ভবিষ্যতের সরকার গঠনেরও ইঙ্গিত দেন।

কিন্তু শীঘ্রই তারা বাস্তবতা বুঝতে পারেন। গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র নেতারা যে গতি এবং ব্যাপক সমর্থন উপভোগ করেছিলেন তা সত্ত্বেও সংগঠন হিসেবে এনসিপি নিজেদেরকে তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের সেভাবে সংগঠিত করতে পারেনি, যা সংসদে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য যথেষ্ট সক্ষম।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের দেখা গেছে যে, দলের সমর্থনে নির্বাচিত সদস্য সংখ্যা সিঙ্গেল ডিজিট, মাত্র ৬ জন।

নির্বাচনের আগে এনসিপি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটভুক্ত হয়। অংশীদার হিসেবে একটি চুক্তি করে, ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে মাত্র ৩০টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং ছয়টি জিতে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে একটি জোট ২১২টি আসন নিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করে, যেখানে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট ৭৭টি আসন পায়। কিন্তু এতে আমিনের মনোবলকে ভেঙে পড়েনি।

বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় কুষ্টিয়া জেলার এই যুবক বার্তাসংস্থা আল জাজিরাকে বলেন, নতুন দল হিসেবে আমরা এই নির্বাচনে ভালো করেছি। আগামী কয়েকটি নির্বাচনে এনসিপি নতুন দল হিসেবে আরও ভালো কিছু করবে বলে আমরা আশাবাদী।

গণঅভ্যুত্থান থেকে সংসদে

২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বেশ কয়েকজন এনসিপি নেতা এখন সংসদ সদস্য। তাদের সমর্থকরা মনে করেন, সদ্য জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক দল হিসেবে সংসদে ছয়টি আসন পাওয়াই একটি অপ্রত্যাশিত অগ্রগতির জানান দেয়।

তবে সমালোচকদের মতে, লড়াই- আন্দোলনে এ দলের যে পারফরম্যান্স ছিল, রাজনীতিতে রূপান্তরিত হওয়া পর তাদের সেই দাপট পরিলক্ষীত হয়নি।

তবে, এনসিপির মুখপাত্র ও তাদের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান আসিফ মাহমুদ নির্বাচনের ফলাফলকে উৎসাহব্যঞ্জক বলে বর্ণনা করেছেন।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, মাত্র ১১ মাস বয়সী একটি দলের জন্য এটি একটি খুব ভালো পারফরম্যান্স ছিল। অবশ্য এটা আরও ভালো হতে পারত। আমরা আরও বেশি আশা করেছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা খুশি।

মাহমুদ যুক্তি দিয়ে বলেন, ভোট গণনায় অনিয়ম না হলে এনসিপি হয়তো আরও দুটি বা তিনটি আসন বেশি পেতো। এ ব্যাপারে প্রমাণ আছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের দল ইতিমধ্যেই নির্বাচনী প্রক্রিয়া চলাকালীন তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

তবুও, তিনি স্বীকার করেছেন যে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য আপস প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, এনসিপি প্রথমে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিল। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর কারণে, সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এবং রাজনৈতিক মাঠে টিকে থাকার জন্য আমাদের একটি জোটে প্রবেশ করতে হয়েছিল।আসলে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন করে এনসিপির নির্বাচন-পরবর্তী ভবিষ্যতের জন্য।

জোটের রাজনীতি এবং অভ্যন্তরীণ ভাঙন

বাংলাদেশের বৃহত্তম ধর্মভিত্তিক দল জামায়াত ঐতিহাসিকভাবে ইসলামী আইনের পক্ষে কথা বলে আসছে এবং নারী অধিকারের বিষয়ে রক্ষণশীল অবস্থান ধরে রেখেছে।

দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক, ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের প্রতি আস্থা রাখার জন্য দলটির সাম্প্রতিক প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও জামায়াতের সঙ্গে জোট করার সিদ্ধান্তে এনসিপির মধ্যে অভ্যন্তরীণ ফাটল তৈরি করে। নিজেদের ধর্শনিরপেক্ষতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের প্রমাণ দিতে এবার প্রথমবারের মতো তারা নির্বাচনে একজন হিন্দু প্রার্থীকে দল থেকে মনোনয়ন দেন।

জোট ঘোষণার এক সপ্তাহের মধ্যে দলের এক ডজনেরও বেশি সিনিয়ার নেতা পদত্যাগ করেন, কারণ তারা মনে করেন যে জামাতের সঙ্গে জোট করা এনসিপির আদর্শের পাশাপাশি ২০২৪ সালের গণঅভূত্থানের মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে অসঙ্গতিপূর্ণ।

তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, জোটটি তাদের দলের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং এর উদারপন্থী ভিত্তিকে দুর্বল করে দেবে। কিন্তু মাহমুদ এই ধরনের আশঙ্কা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তিনি আল জাজিরাকে  বলেন, আমরা কোনো ছায়া রাজনীতি করছি না। আপনি যদি আমাদের বক্তব্য লক্ষ্য করেন, তাহলে দেখবেন যে এগুলো জামায়াতের বক্তব্যের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়।

এনসিপির মুখপাত্র বলেন, আমরা আমাদের কর্মকাণ্ড রাস্তা থেকে শুরু করেছি। এখন আমরা সংসদে আছি। আমরা আর পিছনে ফিরে যেতে চাই না।

পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে, বিশেষ করে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আর জামায়াতের সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করবে না এনসিপি। ভবিষ্যতে তারা যে কোনও নির্বাচনে একক দল হিসেবে লড়াই করবে বলেও জানান দলের মুখপাত্র।