০৪:২০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

খামেনিবিহীন ইরান গাদ্দারদের সাথে একাই লড়ে যাচ্ছে

  • আপডেট সময়: ০৫:১০:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬
  • 2

ছবি: রয়টার্স


হাসান জাহিদ


যদি আমরা ধরে নিই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব সর্বকালের সবচেয়ে উঁচু স্থানে উঠে চোখ রাঙাচ্ছে, তাহলে বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেক উঁচু প্যারামিটারে অবস্থান করছেন এবং তাঁর চোখ চরকির মতো ঘুরছে গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা, ক্যানেডা, মধ্যপ্রাচ্য–বিশেষত ইরানের দিকে।

রাশিয়ার মুখ বন্ধ করতে চাইছেন তিনি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ইউক্রেনে ন্যাটো ও ইয়োরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি রাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র সরবরাহ করে। উদ্দেশ্য এই যুদ্ধকে প্রলম্বিত করে রাশিয়াকে ব্যস্ত রাখা। অস্ত্র ব্যবসার কথা না-ই বা বললাম। যুদ্ধ মানেই অস্ত্রের সফল ব্যবসা।

একদিকে তিনি একের পর এক রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নষ্ট করছেন, যুদ্ধের ট্রমা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। অন্যদিকে আবার তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির দাবি করে আসছেন! নোবেল পুরস্কার তিনি পাননি। হয়তো তাঁর ক্ষোভ আরো বাড়ছে এই অপ্রাপ্তিতে।

ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বেশ উত্তেজনাকর ও বৈরী। একে অন্যের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পর্যায়ের হুমকি-পাল্টা হুমকি দিয়েই যাচ্ছিল। আশঙ্কা ছিল যেকোনো সময় আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের ঘটনা ঘটবে। অবশেষে তাই ঘটল। গত সপ্তাহেই হোয়াইট হাউসের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইরানে কি সহসা কোনো হামলার ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে? তিনি বলেছিলেন, “এই বিষয়টি একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই জানেন; তিনি যখন যেটা মনে করবেন, সেটা করবেনই।” তার সেই কথারই যেন প্রতিফলন ঘটল শনিবার সকালে, যখন ইরানে হামলা চালাতে শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের প্রধান শহরগুলোর ওপর বিকট শব্দে ক্রমাগত আঘাত করতে থাকল। সংবাদে জানা যায় যে, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনির বাসভবনেও চারটি জেট বিমান নিয়ে হামলা করা হয়েছে।

ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের বিষয়ে পরোক্ষ আলোচনার সূত্র ধরে এবং ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অজুহাতে আক্রমণ চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কাতার, বাহরাইন, ইরাক, আরব আমিরাত ও কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্র যে অসংখ্য ঘাঁটি বানিয়ে রেখেছে, তা মধ্যপ্রাচ্য, তথা বিশ্ব শান্তির জন্য হুমকি নয়? ইরান যা করেছে,বা করবে–সেটাই একমাত্র হুমকি?

মার্কিন আগ্রাসনে বিশ্বের নেতারা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট পরোক্ষভাবে মার্কিন শর্ত মেনে নিয়ে ইরানকে আলোচনায় বসতে বলেছেন। প্রেসিডেন্টি এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, সদিচ্ছার ভিত্তিতেই মার্কিন শর্ত মেনে নিয়ে ইরানকে আলোচনা এগিয়ে নিতে হবে। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে এই যুদ্ধ ‘আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার ওপর গুরুতর প্রভাব’ ফেলবে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই চরম উত্তেজনা প্রশমণে ইন্দোনেশিয়া মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিলেও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে এ নিয়ে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বিপজ্জনক উত্তেজনার হুঁশিয়ারি ম্যাক্রোঁর

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এক বিবৃতিতে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে এই যুদ্ধ ‘আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার ওপর গুরুতর প্রভাব’ ফেলবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “বর্তমান এই পরিস্থিতির অবনতি সবার জন্যই বিপজ্জনক। এটি অবশ্যই থামাতে হবে।”

ম্যাক্রোঁ আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যে ফ্রান্সের নাগরিক ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এছাড়া কোনো ঘনিষ্ঠ অংশীদার অনুরোধ জানালে তাদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সম্পদ মোতায়েন করতে ফ্রান্স প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মধ্যস্থতায় প্রস্তুত ইন্দোনেশিয়া

ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সংলাপ সহজতর করতে প্রেসিডেন্ট প্রাবোবো সুবিয়ান্তো প্রস্তুত রয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে মন্ত্রণালয় জানায়, দুই পক্ষ সম্মত হলে প্রেসিডেন্ট প্রাবোবো নিজে তেহরান ভ্রমণেও আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া গভীর খেদ প্রকাশ করে বলেছে, আলোচনার ব্যর্থতার কারণেই এই সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে যা বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

বিভক্ত বিশ্বনেতারা

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা নিয়ে বিভিন্ন দেশ তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে।

অস্ট্রেলিয়া: প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ মার্কিন পদক্ষেপের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বিশ্বশান্তির জন্য দীর্ঘদিন ধরে হুমকি হয়ে আছে। তিনি বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ সমর্থনযোগ্য।

নরওয়ে: দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসপেন বার্থ এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, আত্মরক্ষামূলক বা ‘প্রিভেন্টিভ স্ট্রাইক’ পরিচালনার জন্য তাৎক্ষণিক ও অকাট্য হুমকির প্রমাণ প্রয়োজন, যা এখানে স্পষ্ট নয়।

পাকিস্তান: পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার ইরানের ওপর এই ‘অন্যায়’ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি অবিলম্বে উত্তেজনা প্রশমন করে ফের কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানান।

বেলজিয়াম: দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাক্সিম প্রিভোট আক্ষেপ করে বলেছেন, সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাসুল যেন সাধারণ ইরানি জনগণকে দিতে না হয়।

জার্মানি: বার্লিন জানিয়েছে, হামলার বিষয়ে তাদের আগে থেকেই অবহিত করা হয়েছিল। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জার্মানির ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট টিম বৈঠকে বসছে। একইসঙ্গে ইরানে থাকা তাদের নাগরিকদের সরকারি পোর্টালে নাম নিবন্ধনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত তার দেশের প্রায় ২১ লাখ শ্রমিকের নিরাপত্তাকে ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় থাকা নাগরিকদের অবস্থান শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলেছেন।

এর আগে শনিবার ভোরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে ‘বড় ধরনের যুদ্ধ অভিযান’ শুরুর ঘোষণা দেয়ার পর মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে হামলা চালায়। এর  প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সম্পদগুলোর ওপর পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান।

পাল্টাপাল্টি এই হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ইরান এখন অনেকটাই বেকায়দায়। কেননা বাঁচতে হলে তাকে ইসরায়েল ও আমেরিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে আঘাত হানতে হবে। ইরান সেটাই করছে। তবে হুমকি আসছে আমিরাত থেকে। তারা তাদের দেশে আমেরিকাকে ঘাঁটি বানাতে দিয়েছে, সেটা বেমালুম ভুলে গেছে। তাদের দেশে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র পড়ছে, সেটাই তারা বড় করে দেখছে।

এই প্রসঙ্গে ক’দিন আগে ইরানকে দেওয়া শর্তের বিষয়টি উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পর্যবেক্ষক ও গবেষক এবং ব্রিটিশ চ্যাথাম হাউসের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী ব্রোনওয়েন ম্যান্ডোক্স বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে চুক্তির ক্ষেত্রে যে শর্তগুলো দিয়েছেন তা অত্যন্ত ধূর্ত ও ফানি। কারণ এগুলো ইরানের পক্ষে মানা সম্ভব হতো না। বিশেষ করে ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়ার দাবি তেহরান কখনো মানবে না। আর এই ঘটনাই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে হামলার পথ সুগম করে দেয়।

ইরানের সঙ্গে আমেরিকার বোঝাপড়া বা অনাক্রমণ নিয়ে এতদিন যে যে শর্ত নিয়ে দেনদরবার চলছিল–সেগুলো হচ্ছে: ১. ইরান তার সমৃদ্ধ করা ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম তৃতীয় কোনো দেশে সরিয়ে ফেলবে। ২. তাদের পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস করবে। ৩. ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা ধ্বংস করবে। ৪. মিসাইল কর্মসূচি স্থগিত করবে। ৫. সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক ও লেবাননের সশস্ত্র মিত্রদের সহায়তা বন্ধ করবে।

গত বৃহস্পতিবার জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওমান তখন জানিয়েছিল, আলোচনায় ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে এবং খুব দ্রুতই পরবর্তী বৈঠক হবে। ইরানও এই আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে অভিহিত করেছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি সেই সময়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছিলেন, “আমরা কূটনৈতিক সমাধান পছন্দ করি, তবে সবকিছু নির্ভর করছে ইরানের পদক্ষেপের ওপর।” তার মানে আমেরিকা দাবার জটিল চাল দিল, যাতে ছোবল দেয়ার একটা ‘বৈধ’ অজুহাত তৈরি করা যায়।

মার্কিন সামরিক হামলার সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হয়ে যায় যখন যুক্তরাজ্য তেহরান দূতাবাস থেকে তাদের কর্মীদের সরিয়ে নিতে বলে। ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস জরুরি নয় এমন কর্মী ও তাদের পরিবারকে দেশত্যাগের নির্দেশ দেয়। লেবাননের বৈরুত দূতাবাস থেকেও জরুরি নয় এমন সব কর্মীকে সরিয়ে নেয় ওয়াশিংটন। চীন, ভারত ও কানাডাসহ বেশ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের অতিদ্রুত ইরান ছাড়ার পরামর্শ দেয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশও এই পথ অনুসরণ করে।

২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর এবারই মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বেশি সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প বলেছিলেন, আগামী ১০ দিনের মধ্যেই বিশ্ব জানতে পারবে চুক্তি হচ্ছে নাকি সামরিক পদক্ষেপ। সেই হিসেবে ২৮ ফেব্রুয়ারি হচ্ছে তার ঘোষিত ‘ডেডলাইন’—হয় চুক্তি, নয় সামরিক পদক্ষেপ।

ইরান-আমেরিকার উত্তেজনার পারদ ওপরে ওঠে গত বছর ডিসেম্বরের শেষে। মার্কিন ও পশ্চিমা শক্তির দীর্ঘ বাণিজ্যিক অবরোধ, আঞ্চলিক মিত্রশক্তিগুলোর অস্ত্র ও অর্থের জোগান, জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে বাড়তি বরাদ্দ, নজিরবিহীন মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও আর্থিক সংকটের কারণে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। যেখানে যুক্ত হয় দেশের ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষ। নতুন বছরে সেই আন্দোলন ব্যাপকতা পায় এবং সহিংস রূপ নেয়। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে হত্যা করা হয়। কিছু বিক্ষোভ অন্য রাষ্ট্রের মদদপুষ্ট, যা সহজেই অনুমেয়। বিক্ষোভ ও দমননীতি, আর খামেনির পদক্ষেপ প্রভৃতি ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়। অতি দমননীতির কুফল ভোগ করলে ইরান সরকার তার দায়িত্ব নিতে বাধ্য। ইরান দমন-পীড়ন চালিয়েছে রাষ্ট্রের অখণ্ডতার স্বার্থে। এই বিষয়ে ইসরায়েল ও আমেরিকা ইরানের ওপর ভয়াবহ আক্রমণ চালাতে পারে না। তেহরান যাদেরকে দমন করেছে আর হত্যা করেছে, তারা কাদের দ্বারা প্রভাবিত ও প্রত্যক্ষ মদদপুষ্ট, সেটা আমাদের আন্দাজ করে নিতে কষ্ট হবার কথা নয়। ইরান দমন-পীড়ন করছে, অথচ আক্রমণের একেবারে শুরুতেই তারা মেয়েদের একটি স্কুলে কাপুরুষোচিত হামলা চালিয়ে একশ’  আট জনকে হত্যা করেছে। এটা কি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবতাবিরোধী নয়?

সম্প্রতি ট্রাম্প একাধিকবার ইরানের নেতাদের হুমকি দিয়েছিলেন এই বলে যে—হত্যা বন্ধ করতে হবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করা যাবে না। সেটা না করা হলে তিনি তখনও সামরিক পদক্ষেপের কথা বলেছিলেন। ইরানের শাসকও ট্রাম্পের ওই বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেছিলেন, তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ ও নাক গলানোকে তারা সমর্থন করেন না।

সামাজিক অসন্তোষ থেকে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সেই পরিস্থিতি আমেরিকা ও ইসরায়েলকে সুযোগ করে দিয়েছে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার। অন্যদিকে ইরানের বিক্ষোভকারীরাও বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের জন্য প্রকাশ্যে অনুরোধ ও আহ্বান জানায়। শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আমেরিকা, কানাডা, ইয়োরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ প্রবাসী ইরানিও এই আহ্বান জানান। তাদের অনেকেই ৪৭ বছর আগে ক্ষমতাচ্যুত রেজা শাহ পাহলভির পক্ষে স্লোগান দিয়েছেন এবং তার ছবি ও তাদের পূর্বের ঐতিহ্যবাহী পতাকা প্রদর্শন করেছেন। এটা ইরানের পুরোনো ক্ষত। খামেনির দীর্ঘ শাসনের প্রতিবাদ করার সময় এটা নয়, তা বোঝা উচিত ছিলো বিক্ষোভকারীদের। তারা যে শক্তি ক্ষয় করেছে শাসক বদলাবার জন্য, ২০২৫ সালেই তাদের সেটা বোঝা উচিত ছিলো যখন আমেরিকা ইরানের ওপর সর্বকালের ভয়াবহ বোমা নিক্ষেপ করেছিল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার ওপর। ইসরায়েল বিমান আক্রমণে ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষতি সাধন করেছিল।

ইরানি জনগণ এখনো পরাবাস্তবতার জগতে বিচরণরত। তারা সম্ভবত বুঝতে অক্ষম যে, নিজেদেরকে অন্য দেশের গোলামির হাত থেকে রক্ষা করতে সরকারের সাথে সংহতি প্রকাশ করার সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে। ইসরায়েল ও আমেরিকার দম্ভ চূর্ণ করতে তারা পরবর্তীতে সুবিধামতো সময়ে সরকার বদল করার বিষয়টি প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে পারতো।

মাত্র একবছরেরও কম সময়ে তারা ভুলে গেছে যে, ইরান মিসাইল নিক্ষেপ করে ইসরায়েলকে জেরবার করে দিয়েছিল। কোন দেশ এখন বিক্ষোভের মুখোমুখি নয়? জেন-জিদের উত্তাল আন্দোলন এশিয়ার বহু দেশে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কম্পন জাগিয়েছে অতি সাম্প্রতিককালে। সেইসব দেশ ও সরকার তাদের নিজস্ব ধারায় মোকাবিলা করেছে এই সংকটের। জেন-জিদের আন্দোলন যে অযৌক্তিক, তা কিন্তু নয়। এটা যুগের চাহিদা। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এবার নির্বাচন ছিল জেন-জি প্রভাবিত নির্বাচন। আপাতত মার্কিন ও দখলবাজ ও আগ্রাসী ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়তে হবে জেন-জি  ও ইরানি জনগণকে। ঘরের শত্রু বিভীষণ হওয়া যাবে না।

গত সপ্তাহে স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প ইরান নিয়ে তার লক্ষ্য পরিষ্কার করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু ১ ঘণ্টা ৪৭ মিনিটের দীর্ঘ ভাষণে মাত্র তিন মিনিট ইরান নিয়ে কথা বলেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, “আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনা করে যাচ্ছি। তারা একটি চুক্তি করতে চায়।” কিন্তু কেমন চুক্তি—তা স্পষ্ট করেননি। তিনি আরও বলেন, “আমার পছন্দ কূটনীতির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত, আমি কখনোই বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রকে পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা অর্জন করতে দেব না।”

প্রশ্ন হলো, ইরান কি কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবি করেছে?

ট্রাম্প ইরানের যে পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতা অর্জনের কথা বলছেন, ইরান কখনোই দাবি করেনি যে তারা তা অর্জন করতে চায়। বরং তেহরান বারবার এই দাবি করেছে ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে—তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের জন্য। ট্রাম্পের ভাষণের আগেও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক মাধ্যমে বলেছেন, “ইরান কোনো পরিস্থিতিতেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।” আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) তথ্যমতে, ২০২৫-এর শুরুতে ইরানের কাছে ছয়টি পারমাণবিক বোমা তৈরির মতো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত ছিল। তবে অনেক বিশ্লেষক বলেন, ইরান এখনো অস্ত্রায়নের পথে যায়নি।

গত বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধে ট্রাম্প দাবি করেন যে, তিনি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করেছেন। প্রশ্ন—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি যদি ধ্বংস হয়ে থাকে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে আবার কেন বিশাল সামরিক উপস্থিতি?

কিন্তু ফাঁস হওয়া গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেখা যায়, দুটি স্থাপনার সামান্যই ক্ষতি হয়েছে, যতটা দাবি করা হয়েছিল আদতে তা নয়। এটাই বোধহয় ইরানের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। এরকম তথ্য ফাঁস না হওয়াই উত্তম হতো ইরানের জন্য ।

আলোচনার পাশাপাশি আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক প্রস্তুতি বৃদ্ধি করেছে। ইরানও হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি; তারাও পাল্টা হামলার প্রস্তুতি নিয়েছে। তারাও সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। ইরানের ভৌগোলিক ও সামরিক অবস্থান ইরাকের মতো নয়। গতবছর মার্কিন হামলার মুখে পাল্টা আক্রমণে ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে তাদের ঝুলিতেও আছে বিপুল সামরিক সরঞ্জাম। হরমুজ প্রণালি হচ্ছে তেল রপ্তানির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেল। পাশাপাশি চীন-রাশিয়ার মতো পরাশক্তিও তাদের মিত্র। বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের সামরিক সহযোগিতা ও চুক্তি আছে।

সমকালীন ইতিহাসে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইয়োরোপের নানা যুদ্ধের ইতিহাস দেখিয়েছে যে, যুদ্ধ কতটা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তবুও ট্রাম্প আবারও যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি নিলেন—যার অভিঘাত কতদূর যেতে পারে তা পরিষ্কার বলা কঠিন। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ, অভিবাসন সংকট, তেল ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ অনেক কিছুই ঘটবে। কেননা বিশ্বের ২১ শতাংশের বেশি তেল পরিবহনের রুট এটি। দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক অবরোধ আর অভ্যন্তরীণ গণবিক্ষোভে জর্জরিত ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের এই আঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে আনবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলাটা অসম। বিপরীতে পরাশক্তি আমেরিকা, যার সঙ্গে রয়েছে ইসরায়েল, যে কিনা আর্থিক, সামরিক ও বৈশ্বিক প্রভাবের দিক থেকে শীর্ষে। ইরানে ইসলামি বিপ্লবোত্তর কাল থেকে এ পর্যন্ত আমেরিকার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বটা অনেকটা সাপলুডো খেলার মতোই ছিল। কখনো আকস্মিক সিঁড়ি পেয়ে যাওয়া, কখনো আবার হঠাৎ সাপের মুখে পড়তে পড়তে বেঁচে যাওয়া। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে সেখান থেকে শেষ রক্ষা হবে না। বিষধর সাপ যেভাবে অকস্মাৎ ছোবল দিতে শুরু করল, সময়ই বলবে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই অমীমাংসিত খেলার পরিণতি কী হবে?

সমন্বিত আক্রমণ

বিবিসি ও আল জাজিরা সূত্রমতে, ইরানের ওপর হামলার বিষয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বিতভাবে আমেরিকা কাজ করেছিল বলে ইসরায়েল এবং মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সিএনএন জানিয়েছে, ইসরায়েলের আক্রমণটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বিতভাবে করা হয়েছিল এবং ইসরায়েলের ওয়াইনেট নিউজও একই প্রতিবেদন করেছে।

এদিকে ইরানে শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে হামলা চালায় ইসরায়েল। ইসরায়েল এই হামলাকে ‘পূর্বনির্ধারিত আক্রমণ’ (প্রি-এম্পটিভ অ্যাটাক) বলেছে।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী এক বিবৃতিতে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি দেশজুড়ে ‘বিশেষ ও স্থায়ী জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছেন।

ইরানি সাংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তেহরানে তিনটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি জানায়, তারা খবর পেয়েছে, ইরানের রাজধানী তেহরানের রিপাবলিক এলাকায় বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।

তেহরানের ইউনিভার্সিটি স্ট্রিট ও জোমহুরি এলাকায় কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।

এদিক ইসরায়েল কর্তৃপক্ষ দেশটির আকাশসীমা বেসামরিক বিমানের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে ইরানও পুরো আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। দেশটির সিভিল অ্যাভিয়েশন অরগানাইজেশনের মুখপাত্র মজিদ আকহাভান মেহের সংবাদ সংস্থাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ ঘোষণা দিয়েছেন।

আমার এই লেখা যখন লিখছি, (১ মার্চ), সেইসময় থেকে পানি অনেক গড়িয়ে যাবে। যুদ্ধ পরিস্থিতি নানাভাবে বাঁক নিতে পারে। ইরান কতটা সময় ধরে লড়ে যেতে পারবে, কতটা প্রতিরোধ ও পাল্টা আক্রমণ করবে, তা অনিশ্চিত। তবে, ইসরায়েলের মতো আগ্রাসী জাতি, ও নেতা এবং সামরিক শক্তি পৃথিবীর হিংস্রতম জাতিতে পরিণত হয়েছে। তাদেরকে ঠেকাতে হবে। অখণ্ড ইরান ও অখণ্ড নেতৃত্ব ইসরায়েলকে ঘায়েল করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু ভয়ানক বিষয় হচ্ছে, আমেরিকার ঘাঁটি আছে মধ্যপ্রাচ্যের এমনসব  দেশ ইরানের দিকে চোখ রাঙাচ্ছে।

মার্কিন হামলা ঠেকাতে ইরানকে যেভাবে শক্তিশালী করছে চীন

এখানে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট থেকে কিছু অংশ তুলে ধরছি। তাতে স্পষ্ট হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দুরভিসন্ধি।

চীনকে সাধারণত সুপারপাওয়ার হিসেবেই ধরা হয়। বহু সূচকে সেটি সত্যও। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে চীন বিশ্বের দ্বিতীয়। ক্রয়ক্ষমতা সমতা বা পিপিপি হিসাবে পরিমাপ করলে চীন প্রথম। দেশটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার বেশ বড় এবং ক্রমবর্ধমান। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার চীন। টানা তিন দশকের নজিরবিহীন অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও চীন ‘উচ্চ আস্থার’ সমাজ হিসেবে চরিত্র হারায়নি।

আমেরিকার কপালে ভাঁজ পড়ার অন্যতম কারণ চীন। তাই তারা তড়িঘড়ি আক্রমণ চালাচ্ছে।

তবে সুপারপাওয়ারকে কেবল উপাধিতে নয়, কাজেও প্রমাণিত হতে হয়। প্রকৃত সুপারপাওয়ার নিজেদের স্বার্থ রক্ষা বা এগিয়ে নিতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে। মার্কিন প্রশাসন ইরানকে হুমকি দিচ্ছে। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর এবার তারা নতুন ধাপের আক্রমণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওই হামলায় বহু ইরানি নেতা নিহত হন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইস্পাহানের ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছে। এখন আমেরিকার লক্ষ্য ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি। ইরান বলেছে, ক্ষেপণাস্ত্র তাদের একমাত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করে। তাই এটি আলোচনার বিষয় নয়। তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ‘ডাউনব্লেন্ড’ বা নিম্নমাত্রায় রূপান্তর করার বিষয়ে আলোচনা করতে রাজি।

কিছু পশ্চিমা পর্যবেক্ষক মনে করেন, মার্কিন–ইসরায়েলি আক্রমণের মুখে দুর্বল ইরানকে সহায়তায় চীন ও রাশিয়া কিছুই করবে না। কিন্তু বেইজিং ও মস্কোর দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। চীন সরাসরি আমেরিকার সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়াতে চায় না। তারা মনে করে, সে সময় পরে আসবে। তবে ইরান ও আশপাশের অঞ্চলে চীনের বড় স্বার্থ রয়েছে। তাই বিনিয়োগ ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেদের সুনাম রক্ষায় তাদের পদক্ষেপ নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল ইরানে হামলা করলে রাশিয়া ও চীনের আইনি বাধ্যবাধকতা নেই ইরানকে রক্ষা করার। কারণ তাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই। তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিন দেশ একটি ত্রিপক্ষীয় কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর লক্ষ্য রাজনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং অর্থনৈতিক সংহতি গভীর করা।

রাশিয়া ও ইরান ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ২০ বছরের ‘সমগ্র কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি’ করেছে। এতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, অস্ত্র বিক্রি এবং অভিন্ন হুমকি নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় হতে পারে। ইউক্রেনে যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়া ব্যস্ত। তবু তারা ইরানকে গোয়েন্দা সহায়তা ও অস্ত্র পাঠাতে বাধ্য বোধ করতে পারে। কারণ ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন ইউক্রেনে ন্যাটোর বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তা দিয়েছে। মিডল ইস্ট মনিটর জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে রাশিয়া ও ইরান ৫৮৯ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেছে। এতে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠনের কথা রয়েছে। তবে সম্ভাব্য আসন্ন সংঘর্ষের আগে সেই সহায়তা পৌঁছাবে না।

চীনের অবস্থান আরও জটিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা করলে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের চীন-ইরান ২৫ বছরের কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি হুমকির মুখে পড়বে। ঝুঁকিতে পড়বে ৬০ বিলিয়ন ডলারের চায়না–পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর। এটি ৩ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ অবকাঠামো নেটওয়ার্ক। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের প্রধান স্তম্ভ এটি। চীন ইরানের রপ্তানিকৃত তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কেনে। আর তাদের মোট তেল আমদানির প্রায় ১৪ শতাংশ আসে ইরান থেকে। চীন-ইরান রেলপথ সমুদ্রপথের তুলনায় ৫০ শতাংশ দ্রুত। এতে সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ বা চেকপয়েন্ট এড়ানো যায়। ভবিষ্যতে ‘ফাইভ ন্যাশনস রেলওয়ে করিডর’ মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তান হয়ে চীনকে ইরানের সঙ্গে যুক্ত করবে বলে মনে করা হয়।

সূত্রমতে, চীন ইরানের অভ্যন্তরে মোসাদের অনেক অপতৎপরতা ঠেকিয়েছে। এটা ইরানের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। তবে আমেরিকার তিলকে তাল করতে এক মিনিটও সময় লাগে না। তারা এটাকে ইরান সরকারের দমননীতি হিসেবে দেখছে। এদিকে মোসাদের সদস্যদের ক্ষতি বা প্রাণহানিতে খুনি ইসরায়েল উন্মাদ বনে গেছে। তাই তারা সুযোগ পেয়েই আক্রমণ শানাচ্ছে ইরানে।

ভূরাজনীতি বিশ্লেষক নভরূপ সিং বলেন, ২০২৫ সালের জুনের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলাকে এখন চীন আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী ঘটনা হিসেবে দেখছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চীনের কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক স্বার্থে। ওই হামলার পর ইরানের সঙ্গে চীনের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত জিপিএস ত্যাগ করে চীনের বেইডুয়ো স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম গ্রহণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সফটওয়্যারের বদলে চীনা সিস্টেম ব্যবহার করছে। সলিড ফুয়েল বা কঠিন জ্বালানিচালিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহৃত অ্যামোনিয়াম পারক্লোরেট চীন থেকে আমদানি করেছে। জানা গেছে, ইরান দূরপাল্লার ওয়াইএলসি-৮বি অ্যান্টি-স্টেলথ রাডার এবং এইচকিউ-৯বি দূরপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে।

খবরে প্রকাশ, চীন ইসরায়েলে নতুন বিনিয়োগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আরও বলা হচ্ছে, সংকটকালে সরবরাহ শৃঙ্খলে চীন প্রভাব খাটাতে পারে। কারণ স্বল্পমূল্যের চীনা চিকিৎসা যন্ত্রপাতির ওপর ইসরায়েলের নির্ভরতা রয়েছে। চীন যদি কিছুই না করে, তবে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইরানকে সহায়তায় তারা অস্ত্র ও গোয়েন্দা তথ্য পাঠাচ্ছে। সম্ভবত অর্থনৈতিক সহায়তাও দেবে। তবে সরাসরি সামরিক বাহিনী পাঠাবে না। ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেবে না। পারস্পরিক প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতাও সক্রিয় করবে না। এটা মন্দের ভালো।

কানাডার অন্টারিওর ব্যালসিলি স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের রজার বয়েড লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ইরানে শাসন পরিবর্তন চীন ও রাশিয়ার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। এতে রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চল উন্মুক্ত হয়ে যাবে। মধ্য এশিয়ার ‘স্তান’ দেশগুলোতে প্রবেশের পথ তৈরি হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গেও সীমান্ত গড়ে উঠতে পারে।

নয়া কৌশলগত আতঙ্কে ইসরায়েল, তুরস্ক কি পরবর্তীইরান

বয়েড বেইজিংয়ের জন্য একটি অ-সামরিক বিকল্পের কথাও বলেছেন। তিনি লিখেছেন, চীন যুক্তরাষ্ট্রকে জানাতে পারে—ইরানের ওপর যে কোনো হামলার জবাবে তারা সঙ্গে সঙ্গে বিরল মাটির খনিজ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রপ্তানিতে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেবে। এই নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্র ও হামলায় জড়িত অন্য যে কোনো দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। বিশ্বে পরিশোধিত বিরল মাটির খনিজ উৎপাদনের ৯০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে চীন। স্থায়ী চুম্বক উৎপাদনেও তাদের অংশ প্রায় ৯০ শতাংশ। ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীন এক ধরনের ‘দ্বাররক্ষক।’ তবে পুরোপুরি রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দিলে পশ্চিমা দেশগুলো চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে আরও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে।

বর্তমান সংকটে চীনের ‘বৈজ্ঞানিক গবেষণা’ জাহাজ হিসেবে পরিচিত দা ইয়াং ই হাও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আরব সাগরে পৌঁছায়। এরপর থেকে এটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন–এর স্ট্রাইক গ্রুপকে অনুসরণ করে চলেছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে রাশিয়া ও চীনের নৌবাহিনীর জাহাজ ইরানের সঙ্গে যৌথ নৌ-মহড়ায় অংশ নেবে। এ ছাড়া সমুদ্রভিত্তিক মহাকাশ-নজরদারি জাহাজ লিয়াওওয়াং–১ সম্প্রতি ওমান উপসাগরে পৌঁছেছে। এটিকে পাহারা দিচ্ছে একটি টাইপ–০৫৫ ডেস্ট্রয়ার এবং একটি টাইপ–০৫২ডি ড্রেস্ট্রয়ার। চীনের এসব গোয়েন্দা জাহাজ পশ্চিমা নৌবাহিনীর চলাচল পর্যবেক্ষণ করবে, ইরানকে গোয়েন্দা সহায়তা দেবে এবং অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কার্যক্রম নজরে রাখবে।

বাণিজ্যিক চীনা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের থাড (THAAD) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে। তাই ধরে নেওয়া যায়, চীনও তাদের গোয়েন্দা স্যাটেলাইট মোতায়েন করেছে, যাতে ইসরায়েলি ও মার্কিন বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে ইরানকে আরও বিস্তারিত তথ্য দেয়া যায়। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা বিপ্লবী গার্ড বাহিনী–আইআরজিসি নাকি চীনা স্যাটেলাইট নির্মাতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। লক্ষ্য ছিল রিমোট-সেন্সিং স্যাটেলাইট কেনা বা ব্যবহার করার সুযোগ পাওয়া। এতে সম্ভাব্য হামলার আগাম সতর্কতা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভেদ ক্ষমতাও বাড়বে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীন ও ইরান সিএম–৩০২ সুপারসনিক জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে।

ট্রাম্প চান ২০২৬ সালের এপ্রিলে তাঁর বেইজিং সফর হোক ইরানের বিরুদ্ধে বিজয়ের পরপরই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলায় ইরানে কোনো চীনা নাগরিক নিহত হলে সফরটি বাতিল হতে পারে। তাইওয়ানের সঙ্গে সম্ভাব্য ২০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তিও সফরটি ভেস্তে দিতে পারে, ইরান পরিস্থিতি যাই হোক না কেন। অন্যদিকে ট্রাম্প চান না, তিনি বেইজিং পৌঁছান এমন অবস্থায় যখন ইসলামিক প্রজাতন্ত্র তাকে আলোচনায় বা সমুদ্রপথে পরাস্ত করেছে।

ইরানি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘সাহায্য আসছে।’ এই ঘোষণা তাঁর বিকল্প কমিয়ে দিয়েছে। তিনি হয় সমঝোতার পথে যাবেন, তাতে জায়নিস্টরা ক্ষুব্ধ হবে। নয়তো যুদ্ধে যাবেন, তাতে আমেরিকানদের প্রাণহানি হতে পারে। এই অঞ্চলে আব্রাহাম লিঙ্কনের পর ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন করাও হামলার প্রত্যাশা বাড়িয়েছে। পেন্টাগন নাকি ইরানের বিরুদ্ধে কয়েক সপ্তাহব্যাপী ধারাবাহিক সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন এভাবে উচ্চমাত্রার সামরিক উপস্থিতি ধরে রাখতে পারবে না। তবে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা হলে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন বাহিনী ব্যস্ত থাকবে। তখন তাইওয়ান প্রণালিতে সংকট দেখা দিলে সেটি চীনের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।

ইরান বৃহত্তর খেলাটি বুঝতে পারছে। ইরানের স্ট্র্যাটেজিক কাউন্সিল ফর ফরেন রিলেশনসের সচিব জালাল দেহঘানি ফিরোজাবাদী বলেছেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির একটি অংশ চীনকে ঠেকানোর কৌশলের ভেতরেই নির্ধারিত।’

চীন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবসময় সার্বভৌমত্ব ও অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি জোর দিয়ে তুলে ধরে। ইরানকে ঘিরে সংকট হলে চীনের সহায়তা হবে কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত। সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ানো থেকে বেইজিং দূরে থাকতে চায়। তারা প্রভাব ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে চায়, কিন্তু এমন যুদ্ধে জড়াতে চায় না, যেখানে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হতে হয়। অর্থাৎ তারা সীমিত মাত্রার প্রতিযোগিতায় থাকতে চায়। ওয়াশিংটন অভিযোগ করলে বেইজিং বলতে পারে, ‘আমরা রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করছি না, আমরা শুধু ইউক্রেনকে সহায়তা করছি’—এর চীনা সংস্করণ।

ট্রাম্পের সামনে কয়েকটি সময়সীমা আছে। এপ্রিলের চীন সফর। ২৫ মে মেমোরিয়াল ডে এবং গ্রীষ্মকালীন ছুটির মৌসুমের শুরু। যদি ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় এবং জ্বালানির দাম বেড়ে যায়, তবে এই ছুটির মৌসুম ভেস্তে যেতে পারে। আর নভেম্বরে মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচন। তখন ডেমোক্র্যাটরা জ্বালানির উচ্চমূল্য ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রাণহানির জন্য তাকে নাজেহাল করতে পারে।

ট্রাম্প এমন দ্রুত ও চূড়ান্ত বিজয় চান, যাতে সময়মতো বেইজিং পৌঁছাতে পারেন। এতে ইসরায়েল ও তাদের মার্কিন মিত্ররা সন্তুষ্ট থাকবে। তাদের অর্থ নভেম্বরের নির্বাচনে তার সমর্থিত প্রার্থীদের দিকে প্রবাহিত হবে। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ভোটারদেরও সন্তুষ্ট রাখতে হবে। তারা ভাবতে পারে, নিজেদের ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ দাবি করা ব্যক্তি তাদের ধোঁকা দিয়েছেন। বিশেষ করে, যদি তাদের সন্তানরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে প্রাণ হারায়। এমন যুদ্ধ হয়তো এড়ানো যেত, যদি ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে বারাক ওবামার করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার না করতেন। তখন বারাক ওবামা ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষে প্রচারে নেমে বলতে পারেন, ‘আমি তো আগেই বলেছিলাম।’

চীন চায়, ইরানকে সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশল থেকে ‘আচমকা আঘাতের’ উপাদান সরিয়ে দিতে। ইরানি নেতারা আগেই কঠিনভাবে শিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অনেক সময় হামলার পূর্বাভাস। চীন আশা করে, আলোচনা হলে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ এড়ানো যাবে। কারণ, যুদ্ধ ব্যবসার জন্য ভালো নয়। তবে যদি যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা না করে ইরানের ওপর হামলা চালায়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের ক্ষতি বাড়াতে চীন নীরবে কাজ করবে।

সবকিছুই জটিল এবং একইসাথে সহজ। ট্রাম্প বোধহয় বিশ্বায়নে বিশ্বাস করেন না। বৈশ্বিক নীতিমালা ও ইথিকস বলতে যে, নিয়ম মানা হয় তিনি সেসবের ধার ধারেন না। বিশ্ব তো এখন গ্লোবাল ভিলেজ। বাংলাদেশের এক টোকাই পর্যন্ত বলতে পারবে আইসিসি টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হয়ে শেষও হয়ে যাচ্ছে। সেখানে ট্রাম্পের দেশও খেলেছে। তিনি শুনে আকাশ থেকে পড়েন। তিনি এটা ভালো বোঝেন, কেমন করে ভেনেজুয়েলায় ঢুকে মাদুরোকে কোলে করে আমেরিকায় নিয়ে আসতে হবে। তিনি লাটিমের মতো ঘুরছেন। ঘুরে ঘুরে তাঁর মস্তিষ্কের ব্যারাম হয়ে গেছে।

খামেনি থাকুন বা নতুন নেতা আসুন, সেটার চেয়েও বড় কথা, ইরানকে থাকতে হবে।

শেষের কথা

এই পর্বের লেখাটা শুরু করেছিলাম ২৮ ফেব্রুয়ারি, শেষ করেছি ১ মার্চে। ইতোমধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনি ও তাঁর স্ত্রী শহীদ হয়েছেন। শহীদ হয়েছেন ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদসহ শীর্ষ নেতারা। ইরান এখনও আক্রমণ শানিয়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের আমেরিকান ঘাঁটির দেশগুলোতে, ইসরায়েলে, আমেরিকান রণতরীতে। এই ঘটনা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেনকে, যিনি একাই লড়েছিলেন আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ পরাশক্তির দেশগুলোর সাথে।

ইরান একা যুদ্ধ করে আর কতদিন টিকে থাকতে পারবে, এখন এটাই প্রশ্ন। ইরান পরাজিত হলে আমেরিকা-ইসরায়েলের গোলামী করে যেতে হবে। সৌদি, আমিরাত, কাতারসহ যেসব দেশে আমেরিকার ঘাঁটি আছে, সেসব দেশ পরোক্ষভাবে আমেরিকা-ইসরায়েলের গোলামী করে আসছে কয়েক যুগ ধরে।

পাকিস্তানে মার্কিন দূতাবাসের সামনে ভয়াবহ বিক্ষোভ হয় নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের অ্যাকশনে নয়জন বিক্ষোভকারী নিহত হন। বাংলাদেশে রাজধানি ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ইরানের সমর্থনে চলছে বিক্ষোভ মিছিল। বিভিন্ন দেশ এই নৃশংস ও বর্বর আক্রমণের নিন্দা জানাচ্ছে।

যুগে যুগে আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রিটেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স প্রভৃতি পরাশক্তি এশিয়া-অফ্রিকা, লাতিন আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সম্পদ লুন্ঠন করে নিজেদের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছে। ব্রিটেন ভারতীয় উপমহাদেশে দুইশত বছর ধরে শোষণ-নিপীড়ন-হত্যা ও নির্যাতন করে গেছে। বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। প্রকৃতি ধ্বংস করেছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশদূষণের জন্ম দিয়েছে। তারা আর কতশত বছর ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাবে, সেটা আমাদের অজানা।

 

উত্তরাধুনিক

Writer, Singer & Environmentalist

খামেনিবিহীন ইরান গাদ্দারদের সাথে একাই লড়ে যাচ্ছে

আপডেট সময়: ০৫:১০:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬

ছবি: রয়টার্স


হাসান জাহিদ


যদি আমরা ধরে নিই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব সর্বকালের সবচেয়ে উঁচু স্থানে উঠে চোখ রাঙাচ্ছে, তাহলে বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেক উঁচু প্যারামিটারে অবস্থান করছেন এবং তাঁর চোখ চরকির মতো ঘুরছে গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা, ক্যানেডা, মধ্যপ্রাচ্য–বিশেষত ইরানের দিকে।

রাশিয়ার মুখ বন্ধ করতে চাইছেন তিনি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ইউক্রেনে ন্যাটো ও ইয়োরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি রাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র সরবরাহ করে। উদ্দেশ্য এই যুদ্ধকে প্রলম্বিত করে রাশিয়াকে ব্যস্ত রাখা। অস্ত্র ব্যবসার কথা না-ই বা বললাম। যুদ্ধ মানেই অস্ত্রের সফল ব্যবসা।

একদিকে তিনি একের পর এক রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নষ্ট করছেন, যুদ্ধের ট্রমা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। অন্যদিকে আবার তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির দাবি করে আসছেন! নোবেল পুরস্কার তিনি পাননি। হয়তো তাঁর ক্ষোভ আরো বাড়ছে এই অপ্রাপ্তিতে।

ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বেশ উত্তেজনাকর ও বৈরী। একে অন্যের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পর্যায়ের হুমকি-পাল্টা হুমকি দিয়েই যাচ্ছিল। আশঙ্কা ছিল যেকোনো সময় আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের ঘটনা ঘটবে। অবশেষে তাই ঘটল। গত সপ্তাহেই হোয়াইট হাউসের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইরানে কি সহসা কোনো হামলার ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে? তিনি বলেছিলেন, “এই বিষয়টি একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই জানেন; তিনি যখন যেটা মনে করবেন, সেটা করবেনই।” তার সেই কথারই যেন প্রতিফলন ঘটল শনিবার সকালে, যখন ইরানে হামলা চালাতে শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের প্রধান শহরগুলোর ওপর বিকট শব্দে ক্রমাগত আঘাত করতে থাকল। সংবাদে জানা যায় যে, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনির বাসভবনেও চারটি জেট বিমান নিয়ে হামলা করা হয়েছে।

ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের বিষয়ে পরোক্ষ আলোচনার সূত্র ধরে এবং ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অজুহাতে আক্রমণ চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কাতার, বাহরাইন, ইরাক, আরব আমিরাত ও কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্র যে অসংখ্য ঘাঁটি বানিয়ে রেখেছে, তা মধ্যপ্রাচ্য, তথা বিশ্ব শান্তির জন্য হুমকি নয়? ইরান যা করেছে,বা করবে–সেটাই একমাত্র হুমকি?

মার্কিন আগ্রাসনে বিশ্বের নেতারা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট পরোক্ষভাবে মার্কিন শর্ত মেনে নিয়ে ইরানকে আলোচনায় বসতে বলেছেন। প্রেসিডেন্টি এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, সদিচ্ছার ভিত্তিতেই মার্কিন শর্ত মেনে নিয়ে ইরানকে আলোচনা এগিয়ে নিতে হবে। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে এই যুদ্ধ ‘আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার ওপর গুরুতর প্রভাব’ ফেলবে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই চরম উত্তেজনা প্রশমণে ইন্দোনেশিয়া মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিলেও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে এ নিয়ে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বিপজ্জনক উত্তেজনার হুঁশিয়ারি ম্যাক্রোঁর

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এক বিবৃতিতে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে এই যুদ্ধ ‘আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার ওপর গুরুতর প্রভাব’ ফেলবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “বর্তমান এই পরিস্থিতির অবনতি সবার জন্যই বিপজ্জনক। এটি অবশ্যই থামাতে হবে।”

ম্যাক্রোঁ আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যে ফ্রান্সের নাগরিক ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এছাড়া কোনো ঘনিষ্ঠ অংশীদার অনুরোধ জানালে তাদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সম্পদ মোতায়েন করতে ফ্রান্স প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মধ্যস্থতায় প্রস্তুত ইন্দোনেশিয়া

ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সংলাপ সহজতর করতে প্রেসিডেন্ট প্রাবোবো সুবিয়ান্তো প্রস্তুত রয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে মন্ত্রণালয় জানায়, দুই পক্ষ সম্মত হলে প্রেসিডেন্ট প্রাবোবো নিজে তেহরান ভ্রমণেও আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া গভীর খেদ প্রকাশ করে বলেছে, আলোচনার ব্যর্থতার কারণেই এই সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে যা বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

বিভক্ত বিশ্বনেতারা

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা নিয়ে বিভিন্ন দেশ তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে।

অস্ট্রেলিয়া: প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ মার্কিন পদক্ষেপের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বিশ্বশান্তির জন্য দীর্ঘদিন ধরে হুমকি হয়ে আছে। তিনি বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ সমর্থনযোগ্য।

নরওয়ে: দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসপেন বার্থ এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, আত্মরক্ষামূলক বা ‘প্রিভেন্টিভ স্ট্রাইক’ পরিচালনার জন্য তাৎক্ষণিক ও অকাট্য হুমকির প্রমাণ প্রয়োজন, যা এখানে স্পষ্ট নয়।

পাকিস্তান: পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার ইরানের ওপর এই ‘অন্যায়’ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি অবিলম্বে উত্তেজনা প্রশমন করে ফের কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানান।

বেলজিয়াম: দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাক্সিম প্রিভোট আক্ষেপ করে বলেছেন, সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাসুল যেন সাধারণ ইরানি জনগণকে দিতে না হয়।

জার্মানি: বার্লিন জানিয়েছে, হামলার বিষয়ে তাদের আগে থেকেই অবহিত করা হয়েছিল। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জার্মানির ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট টিম বৈঠকে বসছে। একইসঙ্গে ইরানে থাকা তাদের নাগরিকদের সরকারি পোর্টালে নাম নিবন্ধনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত তার দেশের প্রায় ২১ লাখ শ্রমিকের নিরাপত্তাকে ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় থাকা নাগরিকদের অবস্থান শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলেছেন।

এর আগে শনিবার ভোরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে ‘বড় ধরনের যুদ্ধ অভিযান’ শুরুর ঘোষণা দেয়ার পর মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে হামলা চালায়। এর  প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সম্পদগুলোর ওপর পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান।

পাল্টাপাল্টি এই হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ইরান এখন অনেকটাই বেকায়দায়। কেননা বাঁচতে হলে তাকে ইসরায়েল ও আমেরিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে আঘাত হানতে হবে। ইরান সেটাই করছে। তবে হুমকি আসছে আমিরাত থেকে। তারা তাদের দেশে আমেরিকাকে ঘাঁটি বানাতে দিয়েছে, সেটা বেমালুম ভুলে গেছে। তাদের দেশে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র পড়ছে, সেটাই তারা বড় করে দেখছে।

এই প্রসঙ্গে ক’দিন আগে ইরানকে দেওয়া শর্তের বিষয়টি উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পর্যবেক্ষক ও গবেষক এবং ব্রিটিশ চ্যাথাম হাউসের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী ব্রোনওয়েন ম্যান্ডোক্স বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে চুক্তির ক্ষেত্রে যে শর্তগুলো দিয়েছেন তা অত্যন্ত ধূর্ত ও ফানি। কারণ এগুলো ইরানের পক্ষে মানা সম্ভব হতো না। বিশেষ করে ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়ার দাবি তেহরান কখনো মানবে না। আর এই ঘটনাই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে হামলার পথ সুগম করে দেয়।

ইরানের সঙ্গে আমেরিকার বোঝাপড়া বা অনাক্রমণ নিয়ে এতদিন যে যে শর্ত নিয়ে দেনদরবার চলছিল–সেগুলো হচ্ছে: ১. ইরান তার সমৃদ্ধ করা ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম তৃতীয় কোনো দেশে সরিয়ে ফেলবে। ২. তাদের পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস করবে। ৩. ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা ধ্বংস করবে। ৪. মিসাইল কর্মসূচি স্থগিত করবে। ৫. সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক ও লেবাননের সশস্ত্র মিত্রদের সহায়তা বন্ধ করবে।

গত বৃহস্পতিবার জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওমান তখন জানিয়েছিল, আলোচনায় ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে এবং খুব দ্রুতই পরবর্তী বৈঠক হবে। ইরানও এই আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে অভিহিত করেছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি সেই সময়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছিলেন, “আমরা কূটনৈতিক সমাধান পছন্দ করি, তবে সবকিছু নির্ভর করছে ইরানের পদক্ষেপের ওপর।” তার মানে আমেরিকা দাবার জটিল চাল দিল, যাতে ছোবল দেয়ার একটা ‘বৈধ’ অজুহাত তৈরি করা যায়।

মার্কিন সামরিক হামলার সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হয়ে যায় যখন যুক্তরাজ্য তেহরান দূতাবাস থেকে তাদের কর্মীদের সরিয়ে নিতে বলে। ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস জরুরি নয় এমন কর্মী ও তাদের পরিবারকে দেশত্যাগের নির্দেশ দেয়। লেবাননের বৈরুত দূতাবাস থেকেও জরুরি নয় এমন সব কর্মীকে সরিয়ে নেয় ওয়াশিংটন। চীন, ভারত ও কানাডাসহ বেশ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের অতিদ্রুত ইরান ছাড়ার পরামর্শ দেয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশও এই পথ অনুসরণ করে।

২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর এবারই মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বেশি সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প বলেছিলেন, আগামী ১০ দিনের মধ্যেই বিশ্ব জানতে পারবে চুক্তি হচ্ছে নাকি সামরিক পদক্ষেপ। সেই হিসেবে ২৮ ফেব্রুয়ারি হচ্ছে তার ঘোষিত ‘ডেডলাইন’—হয় চুক্তি, নয় সামরিক পদক্ষেপ।

ইরান-আমেরিকার উত্তেজনার পারদ ওপরে ওঠে গত বছর ডিসেম্বরের শেষে। মার্কিন ও পশ্চিমা শক্তির দীর্ঘ বাণিজ্যিক অবরোধ, আঞ্চলিক মিত্রশক্তিগুলোর অস্ত্র ও অর্থের জোগান, জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে বাড়তি বরাদ্দ, নজিরবিহীন মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও আর্থিক সংকটের কারণে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। যেখানে যুক্ত হয় দেশের ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষ। নতুন বছরে সেই আন্দোলন ব্যাপকতা পায় এবং সহিংস রূপ নেয়। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে হত্যা করা হয়। কিছু বিক্ষোভ অন্য রাষ্ট্রের মদদপুষ্ট, যা সহজেই অনুমেয়। বিক্ষোভ ও দমননীতি, আর খামেনির পদক্ষেপ প্রভৃতি ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়। অতি দমননীতির কুফল ভোগ করলে ইরান সরকার তার দায়িত্ব নিতে বাধ্য। ইরান দমন-পীড়ন চালিয়েছে রাষ্ট্রের অখণ্ডতার স্বার্থে। এই বিষয়ে ইসরায়েল ও আমেরিকা ইরানের ওপর ভয়াবহ আক্রমণ চালাতে পারে না। তেহরান যাদেরকে দমন করেছে আর হত্যা করেছে, তারা কাদের দ্বারা প্রভাবিত ও প্রত্যক্ষ মদদপুষ্ট, সেটা আমাদের আন্দাজ করে নিতে কষ্ট হবার কথা নয়। ইরান দমন-পীড়ন করছে, অথচ আক্রমণের একেবারে শুরুতেই তারা মেয়েদের একটি স্কুলে কাপুরুষোচিত হামলা চালিয়ে একশ’  আট জনকে হত্যা করেছে। এটা কি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবতাবিরোধী নয়?

সম্প্রতি ট্রাম্প একাধিকবার ইরানের নেতাদের হুমকি দিয়েছিলেন এই বলে যে—হত্যা বন্ধ করতে হবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করা যাবে না। সেটা না করা হলে তিনি তখনও সামরিক পদক্ষেপের কথা বলেছিলেন। ইরানের শাসকও ট্রাম্পের ওই বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেছিলেন, তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ ও নাক গলানোকে তারা সমর্থন করেন না।

সামাজিক অসন্তোষ থেকে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সেই পরিস্থিতি আমেরিকা ও ইসরায়েলকে সুযোগ করে দিয়েছে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার। অন্যদিকে ইরানের বিক্ষোভকারীরাও বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের জন্য প্রকাশ্যে অনুরোধ ও আহ্বান জানায়। শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আমেরিকা, কানাডা, ইয়োরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ প্রবাসী ইরানিও এই আহ্বান জানান। তাদের অনেকেই ৪৭ বছর আগে ক্ষমতাচ্যুত রেজা শাহ পাহলভির পক্ষে স্লোগান দিয়েছেন এবং তার ছবি ও তাদের পূর্বের ঐতিহ্যবাহী পতাকা প্রদর্শন করেছেন। এটা ইরানের পুরোনো ক্ষত। খামেনির দীর্ঘ শাসনের প্রতিবাদ করার সময় এটা নয়, তা বোঝা উচিত ছিলো বিক্ষোভকারীদের। তারা যে শক্তি ক্ষয় করেছে শাসক বদলাবার জন্য, ২০২৫ সালেই তাদের সেটা বোঝা উচিত ছিলো যখন আমেরিকা ইরানের ওপর সর্বকালের ভয়াবহ বোমা নিক্ষেপ করেছিল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার ওপর। ইসরায়েল বিমান আক্রমণে ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষতি সাধন করেছিল।

ইরানি জনগণ এখনো পরাবাস্তবতার জগতে বিচরণরত। তারা সম্ভবত বুঝতে অক্ষম যে, নিজেদেরকে অন্য দেশের গোলামির হাত থেকে রক্ষা করতে সরকারের সাথে সংহতি প্রকাশ করার সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে। ইসরায়েল ও আমেরিকার দম্ভ চূর্ণ করতে তারা পরবর্তীতে সুবিধামতো সময়ে সরকার বদল করার বিষয়টি প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে পারতো।

মাত্র একবছরেরও কম সময়ে তারা ভুলে গেছে যে, ইরান মিসাইল নিক্ষেপ করে ইসরায়েলকে জেরবার করে দিয়েছিল। কোন দেশ এখন বিক্ষোভের মুখোমুখি নয়? জেন-জিদের উত্তাল আন্দোলন এশিয়ার বহু দেশে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কম্পন জাগিয়েছে অতি সাম্প্রতিককালে। সেইসব দেশ ও সরকার তাদের নিজস্ব ধারায় মোকাবিলা করেছে এই সংকটের। জেন-জিদের আন্দোলন যে অযৌক্তিক, তা কিন্তু নয়। এটা যুগের চাহিদা। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এবার নির্বাচন ছিল জেন-জি প্রভাবিত নির্বাচন। আপাতত মার্কিন ও দখলবাজ ও আগ্রাসী ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়তে হবে জেন-জি  ও ইরানি জনগণকে। ঘরের শত্রু বিভীষণ হওয়া যাবে না।

গত সপ্তাহে স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প ইরান নিয়ে তার লক্ষ্য পরিষ্কার করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু ১ ঘণ্টা ৪৭ মিনিটের দীর্ঘ ভাষণে মাত্র তিন মিনিট ইরান নিয়ে কথা বলেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, “আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনা করে যাচ্ছি। তারা একটি চুক্তি করতে চায়।” কিন্তু কেমন চুক্তি—তা স্পষ্ট করেননি। তিনি আরও বলেন, “আমার পছন্দ কূটনীতির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত, আমি কখনোই বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রকে পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা অর্জন করতে দেব না।”

প্রশ্ন হলো, ইরান কি কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবি করেছে?

ট্রাম্প ইরানের যে পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতা অর্জনের কথা বলছেন, ইরান কখনোই দাবি করেনি যে তারা তা অর্জন করতে চায়। বরং তেহরান বারবার এই দাবি করেছে ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে—তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের জন্য। ট্রাম্পের ভাষণের আগেও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক মাধ্যমে বলেছেন, “ইরান কোনো পরিস্থিতিতেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।” আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) তথ্যমতে, ২০২৫-এর শুরুতে ইরানের কাছে ছয়টি পারমাণবিক বোমা তৈরির মতো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত ছিল। তবে অনেক বিশ্লেষক বলেন, ইরান এখনো অস্ত্রায়নের পথে যায়নি।

গত বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধে ট্রাম্প দাবি করেন যে, তিনি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করেছেন। প্রশ্ন—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি যদি ধ্বংস হয়ে থাকে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে আবার কেন বিশাল সামরিক উপস্থিতি?

কিন্তু ফাঁস হওয়া গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেখা যায়, দুটি স্থাপনার সামান্যই ক্ষতি হয়েছে, যতটা দাবি করা হয়েছিল আদতে তা নয়। এটাই বোধহয় ইরানের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। এরকম তথ্য ফাঁস না হওয়াই উত্তম হতো ইরানের জন্য ।

আলোচনার পাশাপাশি আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক প্রস্তুতি বৃদ্ধি করেছে। ইরানও হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি; তারাও পাল্টা হামলার প্রস্তুতি নিয়েছে। তারাও সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। ইরানের ভৌগোলিক ও সামরিক অবস্থান ইরাকের মতো নয়। গতবছর মার্কিন হামলার মুখে পাল্টা আক্রমণে ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে তাদের ঝুলিতেও আছে বিপুল সামরিক সরঞ্জাম। হরমুজ প্রণালি হচ্ছে তেল রপ্তানির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেল। পাশাপাশি চীন-রাশিয়ার মতো পরাশক্তিও তাদের মিত্র। বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের সামরিক সহযোগিতা ও চুক্তি আছে।

সমকালীন ইতিহাসে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইয়োরোপের নানা যুদ্ধের ইতিহাস দেখিয়েছে যে, যুদ্ধ কতটা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তবুও ট্রাম্প আবারও যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি নিলেন—যার অভিঘাত কতদূর যেতে পারে তা পরিষ্কার বলা কঠিন। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ, অভিবাসন সংকট, তেল ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ অনেক কিছুই ঘটবে। কেননা বিশ্বের ২১ শতাংশের বেশি তেল পরিবহনের রুট এটি। দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক অবরোধ আর অভ্যন্তরীণ গণবিক্ষোভে জর্জরিত ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের এই আঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে আনবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলাটা অসম। বিপরীতে পরাশক্তি আমেরিকা, যার সঙ্গে রয়েছে ইসরায়েল, যে কিনা আর্থিক, সামরিক ও বৈশ্বিক প্রভাবের দিক থেকে শীর্ষে। ইরানে ইসলামি বিপ্লবোত্তর কাল থেকে এ পর্যন্ত আমেরিকার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বটা অনেকটা সাপলুডো খেলার মতোই ছিল। কখনো আকস্মিক সিঁড়ি পেয়ে যাওয়া, কখনো আবার হঠাৎ সাপের মুখে পড়তে পড়তে বেঁচে যাওয়া। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে সেখান থেকে শেষ রক্ষা হবে না। বিষধর সাপ যেভাবে অকস্মাৎ ছোবল দিতে শুরু করল, সময়ই বলবে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই অমীমাংসিত খেলার পরিণতি কী হবে?

সমন্বিত আক্রমণ

বিবিসি ও আল জাজিরা সূত্রমতে, ইরানের ওপর হামলার বিষয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বিতভাবে আমেরিকা কাজ করেছিল বলে ইসরায়েল এবং মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সিএনএন জানিয়েছে, ইসরায়েলের আক্রমণটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বিতভাবে করা হয়েছিল এবং ইসরায়েলের ওয়াইনেট নিউজও একই প্রতিবেদন করেছে।

এদিকে ইরানে শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে হামলা চালায় ইসরায়েল। ইসরায়েল এই হামলাকে ‘পূর্বনির্ধারিত আক্রমণ’ (প্রি-এম্পটিভ অ্যাটাক) বলেছে।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী এক বিবৃতিতে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি দেশজুড়ে ‘বিশেষ ও স্থায়ী জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছেন।

ইরানি সাংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তেহরানে তিনটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি জানায়, তারা খবর পেয়েছে, ইরানের রাজধানী তেহরানের রিপাবলিক এলাকায় বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।

তেহরানের ইউনিভার্সিটি স্ট্রিট ও জোমহুরি এলাকায় কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।

এদিক ইসরায়েল কর্তৃপক্ষ দেশটির আকাশসীমা বেসামরিক বিমানের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে ইরানও পুরো আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। দেশটির সিভিল অ্যাভিয়েশন অরগানাইজেশনের মুখপাত্র মজিদ আকহাভান মেহের সংবাদ সংস্থাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ ঘোষণা দিয়েছেন।

আমার এই লেখা যখন লিখছি, (১ মার্চ), সেইসময় থেকে পানি অনেক গড়িয়ে যাবে। যুদ্ধ পরিস্থিতি নানাভাবে বাঁক নিতে পারে। ইরান কতটা সময় ধরে লড়ে যেতে পারবে, কতটা প্রতিরোধ ও পাল্টা আক্রমণ করবে, তা অনিশ্চিত। তবে, ইসরায়েলের মতো আগ্রাসী জাতি, ও নেতা এবং সামরিক শক্তি পৃথিবীর হিংস্রতম জাতিতে পরিণত হয়েছে। তাদেরকে ঠেকাতে হবে। অখণ্ড ইরান ও অখণ্ড নেতৃত্ব ইসরায়েলকে ঘায়েল করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু ভয়ানক বিষয় হচ্ছে, আমেরিকার ঘাঁটি আছে মধ্যপ্রাচ্যের এমনসব  দেশ ইরানের দিকে চোখ রাঙাচ্ছে।

মার্কিন হামলা ঠেকাতে ইরানকে যেভাবে শক্তিশালী করছে চীন

এখানে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট থেকে কিছু অংশ তুলে ধরছি। তাতে স্পষ্ট হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দুরভিসন্ধি।

চীনকে সাধারণত সুপারপাওয়ার হিসেবেই ধরা হয়। বহু সূচকে সেটি সত্যও। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে চীন বিশ্বের দ্বিতীয়। ক্রয়ক্ষমতা সমতা বা পিপিপি হিসাবে পরিমাপ করলে চীন প্রথম। দেশটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার বেশ বড় এবং ক্রমবর্ধমান। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার চীন। টানা তিন দশকের নজিরবিহীন অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও চীন ‘উচ্চ আস্থার’ সমাজ হিসেবে চরিত্র হারায়নি।

আমেরিকার কপালে ভাঁজ পড়ার অন্যতম কারণ চীন। তাই তারা তড়িঘড়ি আক্রমণ চালাচ্ছে।

তবে সুপারপাওয়ারকে কেবল উপাধিতে নয়, কাজেও প্রমাণিত হতে হয়। প্রকৃত সুপারপাওয়ার নিজেদের স্বার্থ রক্ষা বা এগিয়ে নিতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে। মার্কিন প্রশাসন ইরানকে হুমকি দিচ্ছে। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর এবার তারা নতুন ধাপের আক্রমণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওই হামলায় বহু ইরানি নেতা নিহত হন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইস্পাহানের ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছে। এখন আমেরিকার লক্ষ্য ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি। ইরান বলেছে, ক্ষেপণাস্ত্র তাদের একমাত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করে। তাই এটি আলোচনার বিষয় নয়। তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ‘ডাউনব্লেন্ড’ বা নিম্নমাত্রায় রূপান্তর করার বিষয়ে আলোচনা করতে রাজি।

কিছু পশ্চিমা পর্যবেক্ষক মনে করেন, মার্কিন–ইসরায়েলি আক্রমণের মুখে দুর্বল ইরানকে সহায়তায় চীন ও রাশিয়া কিছুই করবে না। কিন্তু বেইজিং ও মস্কোর দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। চীন সরাসরি আমেরিকার সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়াতে চায় না। তারা মনে করে, সে সময় পরে আসবে। তবে ইরান ও আশপাশের অঞ্চলে চীনের বড় স্বার্থ রয়েছে। তাই বিনিয়োগ ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেদের সুনাম রক্ষায় তাদের পদক্ষেপ নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল ইরানে হামলা করলে রাশিয়া ও চীনের আইনি বাধ্যবাধকতা নেই ইরানকে রক্ষা করার। কারণ তাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই। তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিন দেশ একটি ত্রিপক্ষীয় কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর লক্ষ্য রাজনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং অর্থনৈতিক সংহতি গভীর করা।

রাশিয়া ও ইরান ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ২০ বছরের ‘সমগ্র কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি’ করেছে। এতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, অস্ত্র বিক্রি এবং অভিন্ন হুমকি নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় হতে পারে। ইউক্রেনে যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়া ব্যস্ত। তবু তারা ইরানকে গোয়েন্দা সহায়তা ও অস্ত্র পাঠাতে বাধ্য বোধ করতে পারে। কারণ ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন ইউক্রেনে ন্যাটোর বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তা দিয়েছে। মিডল ইস্ট মনিটর জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে রাশিয়া ও ইরান ৫৮৯ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেছে। এতে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠনের কথা রয়েছে। তবে সম্ভাব্য আসন্ন সংঘর্ষের আগে সেই সহায়তা পৌঁছাবে না।

চীনের অবস্থান আরও জটিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা করলে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের চীন-ইরান ২৫ বছরের কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি হুমকির মুখে পড়বে। ঝুঁকিতে পড়বে ৬০ বিলিয়ন ডলারের চায়না–পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর। এটি ৩ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ অবকাঠামো নেটওয়ার্ক। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের প্রধান স্তম্ভ এটি। চীন ইরানের রপ্তানিকৃত তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কেনে। আর তাদের মোট তেল আমদানির প্রায় ১৪ শতাংশ আসে ইরান থেকে। চীন-ইরান রেলপথ সমুদ্রপথের তুলনায় ৫০ শতাংশ দ্রুত। এতে সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ বা চেকপয়েন্ট এড়ানো যায়। ভবিষ্যতে ‘ফাইভ ন্যাশনস রেলওয়ে করিডর’ মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তান হয়ে চীনকে ইরানের সঙ্গে যুক্ত করবে বলে মনে করা হয়।

সূত্রমতে, চীন ইরানের অভ্যন্তরে মোসাদের অনেক অপতৎপরতা ঠেকিয়েছে। এটা ইরানের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। তবে আমেরিকার তিলকে তাল করতে এক মিনিটও সময় লাগে না। তারা এটাকে ইরান সরকারের দমননীতি হিসেবে দেখছে। এদিকে মোসাদের সদস্যদের ক্ষতি বা প্রাণহানিতে খুনি ইসরায়েল উন্মাদ বনে গেছে। তাই তারা সুযোগ পেয়েই আক্রমণ শানাচ্ছে ইরানে।

ভূরাজনীতি বিশ্লেষক নভরূপ সিং বলেন, ২০২৫ সালের জুনের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলাকে এখন চীন আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী ঘটনা হিসেবে দেখছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চীনের কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক স্বার্থে। ওই হামলার পর ইরানের সঙ্গে চীনের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত জিপিএস ত্যাগ করে চীনের বেইডুয়ো স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম গ্রহণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সফটওয়্যারের বদলে চীনা সিস্টেম ব্যবহার করছে। সলিড ফুয়েল বা কঠিন জ্বালানিচালিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহৃত অ্যামোনিয়াম পারক্লোরেট চীন থেকে আমদানি করেছে। জানা গেছে, ইরান দূরপাল্লার ওয়াইএলসি-৮বি অ্যান্টি-স্টেলথ রাডার এবং এইচকিউ-৯বি দূরপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে।

খবরে প্রকাশ, চীন ইসরায়েলে নতুন বিনিয়োগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আরও বলা হচ্ছে, সংকটকালে সরবরাহ শৃঙ্খলে চীন প্রভাব খাটাতে পারে। কারণ স্বল্পমূল্যের চীনা চিকিৎসা যন্ত্রপাতির ওপর ইসরায়েলের নির্ভরতা রয়েছে। চীন যদি কিছুই না করে, তবে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইরানকে সহায়তায় তারা অস্ত্র ও গোয়েন্দা তথ্য পাঠাচ্ছে। সম্ভবত অর্থনৈতিক সহায়তাও দেবে। তবে সরাসরি সামরিক বাহিনী পাঠাবে না। ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেবে না। পারস্পরিক প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতাও সক্রিয় করবে না। এটা মন্দের ভালো।

কানাডার অন্টারিওর ব্যালসিলি স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের রজার বয়েড লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ইরানে শাসন পরিবর্তন চীন ও রাশিয়ার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। এতে রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চল উন্মুক্ত হয়ে যাবে। মধ্য এশিয়ার ‘স্তান’ দেশগুলোতে প্রবেশের পথ তৈরি হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গেও সীমান্ত গড়ে উঠতে পারে।

নয়া কৌশলগত আতঙ্কে ইসরায়েল, তুরস্ক কি পরবর্তীইরান

বয়েড বেইজিংয়ের জন্য একটি অ-সামরিক বিকল্পের কথাও বলেছেন। তিনি লিখেছেন, চীন যুক্তরাষ্ট্রকে জানাতে পারে—ইরানের ওপর যে কোনো হামলার জবাবে তারা সঙ্গে সঙ্গে বিরল মাটির খনিজ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রপ্তানিতে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেবে। এই নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্র ও হামলায় জড়িত অন্য যে কোনো দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। বিশ্বে পরিশোধিত বিরল মাটির খনিজ উৎপাদনের ৯০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে চীন। স্থায়ী চুম্বক উৎপাদনেও তাদের অংশ প্রায় ৯০ শতাংশ। ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীন এক ধরনের ‘দ্বাররক্ষক।’ তবে পুরোপুরি রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দিলে পশ্চিমা দেশগুলো চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে আরও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে।

বর্তমান সংকটে চীনের ‘বৈজ্ঞানিক গবেষণা’ জাহাজ হিসেবে পরিচিত দা ইয়াং ই হাও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আরব সাগরে পৌঁছায়। এরপর থেকে এটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন–এর স্ট্রাইক গ্রুপকে অনুসরণ করে চলেছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে রাশিয়া ও চীনের নৌবাহিনীর জাহাজ ইরানের সঙ্গে যৌথ নৌ-মহড়ায় অংশ নেবে। এ ছাড়া সমুদ্রভিত্তিক মহাকাশ-নজরদারি জাহাজ লিয়াওওয়াং–১ সম্প্রতি ওমান উপসাগরে পৌঁছেছে। এটিকে পাহারা দিচ্ছে একটি টাইপ–০৫৫ ডেস্ট্রয়ার এবং একটি টাইপ–০৫২ডি ড্রেস্ট্রয়ার। চীনের এসব গোয়েন্দা জাহাজ পশ্চিমা নৌবাহিনীর চলাচল পর্যবেক্ষণ করবে, ইরানকে গোয়েন্দা সহায়তা দেবে এবং অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কার্যক্রম নজরে রাখবে।

বাণিজ্যিক চীনা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের থাড (THAAD) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে। তাই ধরে নেওয়া যায়, চীনও তাদের গোয়েন্দা স্যাটেলাইট মোতায়েন করেছে, যাতে ইসরায়েলি ও মার্কিন বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে ইরানকে আরও বিস্তারিত তথ্য দেয়া যায়। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা বিপ্লবী গার্ড বাহিনী–আইআরজিসি নাকি চীনা স্যাটেলাইট নির্মাতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। লক্ষ্য ছিল রিমোট-সেন্সিং স্যাটেলাইট কেনা বা ব্যবহার করার সুযোগ পাওয়া। এতে সম্ভাব্য হামলার আগাম সতর্কতা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভেদ ক্ষমতাও বাড়বে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীন ও ইরান সিএম–৩০২ সুপারসনিক জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে।

ট্রাম্প চান ২০২৬ সালের এপ্রিলে তাঁর বেইজিং সফর হোক ইরানের বিরুদ্ধে বিজয়ের পরপরই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলায় ইরানে কোনো চীনা নাগরিক নিহত হলে সফরটি বাতিল হতে পারে। তাইওয়ানের সঙ্গে সম্ভাব্য ২০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তিও সফরটি ভেস্তে দিতে পারে, ইরান পরিস্থিতি যাই হোক না কেন। অন্যদিকে ট্রাম্প চান না, তিনি বেইজিং পৌঁছান এমন অবস্থায় যখন ইসলামিক প্রজাতন্ত্র তাকে আলোচনায় বা সমুদ্রপথে পরাস্ত করেছে।

ইরানি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘সাহায্য আসছে।’ এই ঘোষণা তাঁর বিকল্প কমিয়ে দিয়েছে। তিনি হয় সমঝোতার পথে যাবেন, তাতে জায়নিস্টরা ক্ষুব্ধ হবে। নয়তো যুদ্ধে যাবেন, তাতে আমেরিকানদের প্রাণহানি হতে পারে। এই অঞ্চলে আব্রাহাম লিঙ্কনের পর ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন করাও হামলার প্রত্যাশা বাড়িয়েছে। পেন্টাগন নাকি ইরানের বিরুদ্ধে কয়েক সপ্তাহব্যাপী ধারাবাহিক সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন এভাবে উচ্চমাত্রার সামরিক উপস্থিতি ধরে রাখতে পারবে না। তবে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা হলে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন বাহিনী ব্যস্ত থাকবে। তখন তাইওয়ান প্রণালিতে সংকট দেখা দিলে সেটি চীনের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।

ইরান বৃহত্তর খেলাটি বুঝতে পারছে। ইরানের স্ট্র্যাটেজিক কাউন্সিল ফর ফরেন রিলেশনসের সচিব জালাল দেহঘানি ফিরোজাবাদী বলেছেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির একটি অংশ চীনকে ঠেকানোর কৌশলের ভেতরেই নির্ধারিত।’

চীন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবসময় সার্বভৌমত্ব ও অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি জোর দিয়ে তুলে ধরে। ইরানকে ঘিরে সংকট হলে চীনের সহায়তা হবে কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত। সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ানো থেকে বেইজিং দূরে থাকতে চায়। তারা প্রভাব ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে চায়, কিন্তু এমন যুদ্ধে জড়াতে চায় না, যেখানে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হতে হয়। অর্থাৎ তারা সীমিত মাত্রার প্রতিযোগিতায় থাকতে চায়। ওয়াশিংটন অভিযোগ করলে বেইজিং বলতে পারে, ‘আমরা রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করছি না, আমরা শুধু ইউক্রেনকে সহায়তা করছি’—এর চীনা সংস্করণ।

ট্রাম্পের সামনে কয়েকটি সময়সীমা আছে। এপ্রিলের চীন সফর। ২৫ মে মেমোরিয়াল ডে এবং গ্রীষ্মকালীন ছুটির মৌসুমের শুরু। যদি ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় এবং জ্বালানির দাম বেড়ে যায়, তবে এই ছুটির মৌসুম ভেস্তে যেতে পারে। আর নভেম্বরে মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচন। তখন ডেমোক্র্যাটরা জ্বালানির উচ্চমূল্য ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রাণহানির জন্য তাকে নাজেহাল করতে পারে।

ট্রাম্প এমন দ্রুত ও চূড়ান্ত বিজয় চান, যাতে সময়মতো বেইজিং পৌঁছাতে পারেন। এতে ইসরায়েল ও তাদের মার্কিন মিত্ররা সন্তুষ্ট থাকবে। তাদের অর্থ নভেম্বরের নির্বাচনে তার সমর্থিত প্রার্থীদের দিকে প্রবাহিত হবে। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ভোটারদেরও সন্তুষ্ট রাখতে হবে। তারা ভাবতে পারে, নিজেদের ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ দাবি করা ব্যক্তি তাদের ধোঁকা দিয়েছেন। বিশেষ করে, যদি তাদের সন্তানরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে প্রাণ হারায়। এমন যুদ্ধ হয়তো এড়ানো যেত, যদি ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে বারাক ওবামার করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার না করতেন। তখন বারাক ওবামা ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষে প্রচারে নেমে বলতে পারেন, ‘আমি তো আগেই বলেছিলাম।’

চীন চায়, ইরানকে সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশল থেকে ‘আচমকা আঘাতের’ উপাদান সরিয়ে দিতে। ইরানি নেতারা আগেই কঠিনভাবে শিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অনেক সময় হামলার পূর্বাভাস। চীন আশা করে, আলোচনা হলে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ এড়ানো যাবে। কারণ, যুদ্ধ ব্যবসার জন্য ভালো নয়। তবে যদি যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা না করে ইরানের ওপর হামলা চালায়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের ক্ষতি বাড়াতে চীন নীরবে কাজ করবে।

সবকিছুই জটিল এবং একইসাথে সহজ। ট্রাম্প বোধহয় বিশ্বায়নে বিশ্বাস করেন না। বৈশ্বিক নীতিমালা ও ইথিকস বলতে যে, নিয়ম মানা হয় তিনি সেসবের ধার ধারেন না। বিশ্ব তো এখন গ্লোবাল ভিলেজ। বাংলাদেশের এক টোকাই পর্যন্ত বলতে পারবে আইসিসি টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হয়ে শেষও হয়ে যাচ্ছে। সেখানে ট্রাম্পের দেশও খেলেছে। তিনি শুনে আকাশ থেকে পড়েন। তিনি এটা ভালো বোঝেন, কেমন করে ভেনেজুয়েলায় ঢুকে মাদুরোকে কোলে করে আমেরিকায় নিয়ে আসতে হবে। তিনি লাটিমের মতো ঘুরছেন। ঘুরে ঘুরে তাঁর মস্তিষ্কের ব্যারাম হয়ে গেছে।

খামেনি থাকুন বা নতুন নেতা আসুন, সেটার চেয়েও বড় কথা, ইরানকে থাকতে হবে।

শেষের কথা

এই পর্বের লেখাটা শুরু করেছিলাম ২৮ ফেব্রুয়ারি, শেষ করেছি ১ মার্চে। ইতোমধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনি ও তাঁর স্ত্রী শহীদ হয়েছেন। শহীদ হয়েছেন ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদসহ শীর্ষ নেতারা। ইরান এখনও আক্রমণ শানিয়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের আমেরিকান ঘাঁটির দেশগুলোতে, ইসরায়েলে, আমেরিকান রণতরীতে। এই ঘটনা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেনকে, যিনি একাই লড়েছিলেন আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ পরাশক্তির দেশগুলোর সাথে।

ইরান একা যুদ্ধ করে আর কতদিন টিকে থাকতে পারবে, এখন এটাই প্রশ্ন। ইরান পরাজিত হলে আমেরিকা-ইসরায়েলের গোলামী করে যেতে হবে। সৌদি, আমিরাত, কাতারসহ যেসব দেশে আমেরিকার ঘাঁটি আছে, সেসব দেশ পরোক্ষভাবে আমেরিকা-ইসরায়েলের গোলামী করে আসছে কয়েক যুগ ধরে।

পাকিস্তানে মার্কিন দূতাবাসের সামনে ভয়াবহ বিক্ষোভ হয় নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের অ্যাকশনে নয়জন বিক্ষোভকারী নিহত হন। বাংলাদেশে রাজধানি ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ইরানের সমর্থনে চলছে বিক্ষোভ মিছিল। বিভিন্ন দেশ এই নৃশংস ও বর্বর আক্রমণের নিন্দা জানাচ্ছে।

যুগে যুগে আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রিটেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স প্রভৃতি পরাশক্তি এশিয়া-অফ্রিকা, লাতিন আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সম্পদ লুন্ঠন করে নিজেদের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছে। ব্রিটেন ভারতীয় উপমহাদেশে দুইশত বছর ধরে শোষণ-নিপীড়ন-হত্যা ও নির্যাতন করে গেছে। বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। প্রকৃতি ধ্বংস করেছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশদূষণের জন্ম দিয়েছে। তারা আর কতশত বছর ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাবে, সেটা আমাদের অজানা।