
হাসান জাহিদ
আমার ছাত্রজীবনে, বিশেষত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেকটা সময়জুড়ে আমি ওয়েস্টার্ন ছবি, বিশেষত অ্যাকশন ছবির দিকে ঝুঁকে পড়েছিলাম। এঁদের মধ্যে ক্লিন্ট ইস্টউড, চার্লস ব্রনসন, রবার্ট রেডফোর্ড ও পল নিউম্যান অন্যতম। শেষের এই দুই নায়কের ছবি ‘বুচ ক্যাসেডি অ্যান্ড দ্য সানডেন্স কিড’ দেখে এতোটাই বিমোহিত হয়েছিলাম যে পরবর্তীতে আরো কয়েকবার ছবিটা দেখেছিলাম। তখন পর্যন্ত আমি চাক নরিস সম্পর্কে তেমন কিছু জানতাম না বা তাঁর ছবি দেখিনি।
চাক নরিসকে প্রথম দেখলাম এবং ধারণ করলাম ব্রুস লি ও নরিস অভিনীত রিটার্ন অব দ্য ড্রাগন ছবিটি দেখে। এরপর শুধু ব্রুস লি’র ছবিই দেখতে লাগলাম। ব্রুস লি’র জীবনী পড়লাম। তাঁর মার্শাল আর্ট, তাঁর আবিষ্কৃত নানচাকুর ব্যবহার, আর তাঁর নিজস্ব ঘরানার ‘জিত কোনে ডো’ মার্শাল আর্টের সংজ্ঞা পাল্টে দিলো।
ব্রুস লি-কে অনেকেই চেনেন তাঁর অনবদ্য মার্শাল আর্টের জন্য। তাঁর সবচেয়ে পরিচিত উত্তরাধিকার নিঃসন্দেহে তার বিখ্যাত সিনেমাগুলো। কিন্তু চলচ্চিত্রের বাইরে তিনি তৈরি করেছিলেন এক অনন্য যুদ্ধদর্শন—জিত কুনে ডো। ক্যানটোনিজ এই শব্দের অর্থ দাঁড়ায় ‘আঘাতকে থামিয়ে দেয়া মুষ্টির পথ’—আরো সহজ করে বললে, ‘যে পথ আঘাতকে থামিয়ে দেয়’।
ব্রুস লি’র একটা বিরল বৈশিষ্ট্য ছিলো তিনি মার্শাল আর্টের সাথে যোগ করেছিলেন নিজস্ব আধ্যাত্মিক দর্শন, মিথ ও চীন-হংকং-এর প্রাচীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে। তিনি ছিলেন একাধারে যোগী, ধ্যানী ও সন্যাসী। ব্রুস লি’র এইসব প্রায় অপার্থিব পর্যায়ের মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য কুংফু এবং মিশ্র মার্শাল আর্ট তাঁকে সারাবিশ্বে জনপ্রিয়তা এনে দিলো। তিনি শুধু যে, সিনেমাতেই এইসব কৌশল দেখাতেন, তা কিন্তু নয়, বাস্তবেই তিনি ছিলেন অবিসংবাদিত কুংফু মাস্টার। দুর্ভাগ্যবশত মাত্র ৩৩ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। ব্রুস লি’র ছবিগুলো হলে গিয়ে, ভিসিআর-এ, ও পরবর্তীতে সিডিতে দেখার ফলে আমার মস্তিষ্কে ব্রুস লি স্থায়ী আসন করে নিলেন।
‘রিটার্ন অব দ্য ড্রাগন’ সিনেমার সেটিংস ছিলো ইতালির রোমে। রোমে অবস্থিত রোমান সাম্রাজ্যের কালজয়ী স্থাপনা কলোসিয়ামে একটি ফাইট সিন হয়। ব্রুস লি বনাম চাক নরিস। এই আনআর্মড কম্বেট-এ পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুই দিকপাল ব্রুস লি এবং নরিস মুখোমুখি হন। সিনেমার প্রয়োজনে এখানে ব্রুস লি’র সাথে যুদ্ধে চাক নরিসকে হেরে গিয়ে মৃত্যুবরণ করতে হয়। পৃথিবীর যেকোনো মুভির চেয়ে এই ফাইটের এই একটি ফাইটের দৃশ্য এপিকসম উপাদানে সমৃদ্ধ হয়ে আজও দর্শকদের নাড়া দেয়।
চলচ্চিত্রটি তাং লুং-এর (ব্রুস লি অভিনীত) গল্প অনুসরণ করে, একজন মার্শাল আর্টিস্ট যিনি হংকং থেকে রোমে যাত্রা করেন তার আত্মীয়দের সাহায্য করার জন্য, যারা একটি চায়নিজ রেস্তোরাঁ পরিচালনা করেন। তাদের স্থানীয় একটি মাফিয়া বস এবং তার দল দ্বারা হুমকির মুখে পড়তে হয়। পৌঁছানোর পর, তাং লুংকে সাংস্কৃতিক পার্থক্য এবং ভাষাগত বাধার মধ্য দিয়ে এগোতে হয় এবং রেস্তোরাঁকে গ্যাংস্টারদের থেকে রক্ষা করতে হয়। চলচ্চিত্রটি একটি মহাকাব্যিক সমাপনী সংঘর্ষে পৌঁছায়, যেখানে তাং লুং এবং কোল্ট (চাক নরিস অভিনীত) কোলিসিয়ামে মুখোমুখি হয়, যা সিনেমা ইতিহাসের সবচেয়ে মনে রাখার মতো যোদ্ধা চলচ্চিত্র কোরিওগ্রাফি প্রদর্শন করে।

এতো গেলো ছবির দৃশ্যের কথা। বাস্তবে ব্রুস লি ও চাক নরিস কখনো দ্বৈতযুদ্ধে মুখোমুখি হননি। বরং তাঁরা দুজন বন্ধুই ছিলেন, এবং একে অপরের স্টাইলের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। কুংফু বললে আমাদের চোখে চীন ও হংকং ভেসে ওঠে। বুশিডো বা নিনজা বললে ভেসে ওঠে জাপান। আর মুয়ে থাই বললে থাইল্যান্ডের চিত্র ভেসে ওঠে। প্রকৃত অর্থে কিকবক্সিং বা মিক্সড মার্শাল আর্টের চর্চা আমেরিকা, কানাডা, ইয়োরোপ বা লাতিন আমেরিকা, এমনকি আমাদের উপমহাদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে।
ব্রুস লি’র জন্ম হয় আমেরিকার সান ফ্রান্সসিস্কোতে, আর বেড়ে ওঠা তৎকালিন ব্রিটিশ শাসিত হংকং-এ। অভিনেতা, মার্শাল আর্টিস্ট, নির্মাতা ও দার্শনিক হিসেবে তাঁকে আমেরিকা ও হংকং-এ গমনাগমন করতে হতো। সেই সুবাদেই সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ মার্শাল আর্টিস্ট চাক নরিসের সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে।
ব্রুস লি’র সাথে যুদ্ধের সেই এপিক দৃশ্য দেখার পর থেকে আমার মনের মতো আরেকজন আইকোনিক হিরোকে পেয়ে গেলাম। তাঁর দুয়েকটি ছবিও দেখেছিলাম।
‘ওয়াকার টেক্সাস রেঞ্জার’ টিভি সিরিজ ছাড়াও ‘দ্য ডেল্টা ফোর্স’, ‘লোন উলফ ম্যাককুয়েড’ এবং ‘কোড অব সাইলেন্স’-এর মতো ছবিতে তাঁর নাম অ্যাকশনের সমার্থক হয়ে ওঠে।
খ্রিষ্টান ধর্মবিশ্বাসের গভীর অনুরাগী নরিস ৮৬ বছর বয়সে চলে গেলেন স্বর্গ মাতাতে। ফেলে গেলেন একরাশ অনুরাগী আর তাঁকে নিয়ে তৈরি নানা গালগপ্পো।
পশ্চিমে অভিনেতাদের জন্য যত পুরস্কার আছে, তার কোনোটা কখনো চাক নরিসের হাতে ওঠার সাহস করেছে, এমনটা শোনা যায় না। তার আপন বলতে ছিল কারাতের জন্য টানা ছয়টি ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন খেতাব, আর অনেকগুলো ব্ল্যাক বেল্ট।
আর হলিউডের ‘ডাউন টু আর্থ’ এই অভিনেতা জায়গা পেয়েছেন ‘হলিউড বুলেভা’র ৭০১৮ নম্বরের কাছাকাছি ফুটপাথের ওপর বসানো এক সোনালি তারকায়, যে হাঁটাপথের নাম ‘হলিউড ওয়াক অব ফেইম’।
চাক নরিসকে নিয়ে যত বাণী ও সারবাক্য তৈরি হয়েছে, পৃথিবীতে আর কোনো অভিনেতা বা বিখ্যাত ব্যক্তিকে নিয়ে এরকম অজস্র বাণী তৈরি হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। কিন্তু এই চাক নরিসকে নিয়েই এমন সব মজার বাণী তৈরি হবে কেন? এর উত্তর রয়েছে তার অভিনীত চরিত্রগুলোয়।
একবারে সোজাসাপ্টা চলা আদর্শ আমেরিকান, যিনি সবসময় ন্যায়ের পক্ষে থাকেন, অন্যায় সহ্য করেন না, আর তাকে খেপিয়ে দিলে অসাধ্য সাধন করে ফেলেন–মোটাদাগে এই ছিলো তাঁর চরিত্রগুলোর চরিত্র। ফলে চাক নরিস হয়ে ওঠেন সাধারণ মানুষের মধ্যেই তাক লাগানো সক্ষমতার সমার্থক।
চাক নরিস কী কী করতে পারেন, সেসব নিয়ে ২০০৫ সালের দিকে একটি তালিকা বানান এক ভক্ত। ‘চাক নরিস ফ্যাক্টস’ নামের ওই তালিকা এরপর নানাজনের অবদানে সমৃদ্ধ হয়েছে।
এবারে বাছাই করা কিছু ‘চাক নরিস ফ্যাক্টস’ সম্পর্কে জানা যাক–
- চাক নরিস ঘড়ি পরেন না। কখন সময় কতো হবে সেটা তিনি নিজেই ঠিক করেন
- চাক নরিস কখনো বাঁয়ে ঘোরেন না, কারণ, ‘হি ইজ অলওয়েজ রাইট’
- চাক নরিস বই পড়েন না। বইয়ের দিকে তাকালেই দরকারি বিষয় তাঁর জানা হয়ে যায়
- রেস্তোরাঁয় চাক নরিস ওয়েটারকে টিপস দেন না। ওয়েটারই উল্টা তাঁকে দেয়
- চাক নরিসের চোখের জলে ক্যান্সার সারে। সমস্যা হলো, তিনি কখনো কাঁদেন না
- চাক নরিসের বাসায় চুলা, ওভেন বা মাইক্রোওভেন নেই। কারণ প্রতিশোধ নামের খাবারটি পরিবেশন করতে হয় ঠান্ডা
- সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না, যদি না সেই মানুষটা চাক নরিস হন
- চাক নরিস বাড়ি ছাড়ার সময় বাবাকে বলেছিলেন, “এখন থেকে তুমিই বাড়ির কর্তা”
- চাক নরিস বুক-ডন দেন না। তিনি পৃথিবীকে নিচে ঠেলে দেন
- চাক নরিসকে লাইট জ্বালিয়ে ঘুমাতে হয়, কারণ অন্ধকার তাকে ভয় পায়
- ভূতের ভয় পাওয়ার গল্পের ভুত ঘুমানোর আগে বিছানার নিচে তাকিয়ে দেখে সেখানে চাক নরিস বসে আছেন কি না
- চাক নরিস সাঁতার কাটতে গেলে হাঙররা সমুদ্র ছেড়ে চলে যায়
- মেঘ বৃষ্টি দেয় না। চাক নরিসকে দেখলে মেঘের ঘাম ঝরে
- চাক নরিস জ্বালানির দাম নিয়ে চিন্তা করেন না। তার গাড়ি চলে ভয়ে
- চাক নরিস রান্না করতে গেলে পেঁয়াজ কাঁদে
- চাক নরিস আয়নায় তাকালে আয়না ভেঙে যায়। কারণ কাচও এত বোকা নয় যে দুই চাক নরিসের মাঝখানে দাঁড়াবে
- ভূতেরা ক্যাম্পফায়ারে বসে চাক নরিসের গল্প বলে
- চাক নরিস অসীম পর্যন্ত গুনেছেন। দুইবার
- মহাকাশ আছে, কারণ সেটা চাক নরিসের সঙ্গে একই গ্রহে থাকতে ভয় পায়
- পলকহীন তাকানোর প্রতিযোগিতায় চাক নরিস সূর্যকেও হারিয়েছেন
- একবার এক গোখরা সাপ চাক নরিসকে ছোবল দিয়েছিল। পাঁচ দিন যন্ত্রণার পর বেচারা সাপটাই মারা গেল
- যে কোনো সংখ্যাকে চাক নরিস শূন্য দিয়ে ভাগ করতে পারেন
- চাক নরিসের ক্যালেন্ডারে ৩১ মার্চের পর সরাসরি ২ এপ্রিল আসে। তাঁর ক্যালেন্ডারে এপ্রিল ফুল ডে নেই
- বিবর্তন তত্ত্ব বলে কিছু নেই। আছে প্রাণীদের এক তালিকা, চাক নরিস যাদের বাঁচতে দিয়েছেন
- চাক নরিস দুইটা বরফের টুকরো ঘষে আগুন জ্বালাতে পারেন
- চাক নরিস ভুল করলে ভুলটাই তার কাছে ক্ষমা চায়
- আগুন চাক নরিসকে পোড়ায় না। চাক নরিস আগুনকে পোড়ান
- চাক নরিসের কিবোর্ড লাগে না। তিনি কম্পিউটারকে বলেন, আর সেটা টাইপ করা হয়ে যায়
- চাক নরিস কিন্তু মঙ্গল গ্রহে গিয়েছেন। দেখেন না, সেখানে প্রাণের চিহ্ন নেই
- সূর্য ওঠে আর ডোবে চাক নরিসের ঘুমের সময় অনুযায়ী
- একবার পুলিশ চাক নরিসকে থামিয়েছিল। তিনি পুলিশকে সতর্ক করে ছেড়ে দিয়েছিলেন
- চাক নরিস তার বাড়ির উঠানে ঘাস কাটেন না। ঘাসগুলোই বড় হতে ভয় পায়
- চাক নরিস জীবনে একবারই ভুল করেছিলেন, যখন ভেবেছিলেন তিনি ভুল করেছেন
- চাক নরিস আয়নায় তাকালে কোনো প্রতিবিম্ব দেখা যায় না, কারণ তিনি এক পিস
- অভিনয়ের সময় চাক নরিস স্টান্ট ব্যবহার করতেন কেবল কান্নার দৃশ্যের জন্য
- একবার তার নামে রাস্তার নাম রাখা হয়েছিল, পরে বদলাতে হয়েছে। কারণ, কেউ ওই রাস্তা পেরোতে সাহস করত না
- যে হাসপাতালে চাক নরিসের জন্ম, সেটা তিনিই বানিয়েছিলেন
- চাক নরিস কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছিলেন। এখন ভাইরাসটাই কোয়ারেন্টাইনে আছে
- কিংবদন্তিরা চিরকাল বাঁচে। চাক নরিস তার চেয়েও বেশি দিন বাঁচেন
টিএমজেড (TMZ)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ, ২০২৬) শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় হাওয়াইয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল তাঁকে। অথচ মাত্র কয়েকদিন আগেই, ১০ মার্চ নিজের ৮৬তম জন্মদিনে একটি ভিডিয়ো শেয়ার করেছিলেন অভিনেতা। সেখানে তাঁকে বেশ চনমনে মেজাজে বক্সিং প্র্যাকটিস করতে দেখা গিয়েছিল। ক্যাপশনে লিখেছিলেন তাঁর সেই বিখ্যাত সংলাপ— “আই ডোন্ট এজ, আই লেভেল আপ।”
আর সব শেষে যোগ হওয়া ‘ফ্যাক্ট’ হচ্ছে–চাক নরিস মারা যাননি। মৃত্যু শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে দেখা করার সাহস অর্জন করেছে।

























