যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। ছবি: রয়টার্স
ডিয়েগো গার্সিয়ায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে দ্রুত জনগণকে জানাতে ব্যর্থ হওয়ায় গত রাতে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের বিরুদ্ধে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। হামলার চেষ্টার ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় পর সরকার অবশেষে ডিয়েগো গার্সিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কথা স্বীকার করেছে। তাও কেবল মার্কিন কর্মকর্তারা বিষয়টি নিশ্চিত করার পরেই জানানো হয়।
ডিয়েগো গার্সিয়া ভারত মহাসাগরের চাগোস দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশ-মার্কিন যৌথ সামরিক ঘাঁটি।
এটি ব্রিটিশ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অংশ। মূলত যুক্তরাজ্য থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি ইজারায় দেওয়া হয়েছে।
কেমি ব্যাডেনক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার সংস্কৃতি’ ধরে রাখার অভিযোগ করেছেন এবং সরকার কেন আগে জনগণকে জানায়নি তার ব্যাখ্যা দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। কেমি ব্যাডেনক যুক্তরাজ্যের একজন বিশিষ্ট কনজারভেটিভ পার্টির রাজনীতিবিদ।
তিনি বর্তমানে কনজারভেটিভ পার্টি এবং বিরোধী দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি ঋষি সুনাকের স্থলাভিষিক্ত হয়ে দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
ডেইলি মেইলের জন্য লেখা এক নিবন্ধে কনজারভেটিভি এই নেত্রী বলেছেন, ‘লেবার সরকারের গোপনীয়তাই সব বলে দেয়। তারা খারাপ খবরের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে তা লুকাতেই বেশি পছন্দ করে।
’ তিনি আলো বলেন, ‘অবশ্যই প্রকৃত জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো গোপন রাখা উচিত। কিন্তু এর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে সংসদ এবং জনসাধারণকে অবশ্যই জানাতে হবে।’
গত বৃহস্পতিবার রাত ১১টা থেকে শুক্রবার ভোর ২টার মধ্যে ইরান চাগোস দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত মার্কিন-যুক্তরাজ্য ডিয়েগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটিতে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ডিয়েগো গার্সিয়া ইরান থেকে ২ হাজার ৩৬০ মাইল দূরে অবস্থিত এবং তবে কোনো ক্ষেপণাস্ত্রই তার লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারেনি। একটি ক্ষেপণাস্ত্র একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ভূপাতিত করে আর অন্যটি ১ হাজার ৯৯০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে সমুদ্রে পড়ে যায়।
হামলার প্রথম প্রতিবেদনটি শনিবার যুক্তরাজ্যের সময় রাত ১২টা ২০ মিনিটে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত হয়। এ ঘটনার ঘটার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর তা প্রকাশ পায়। যুক্তরাজ্যের সময় রাত ২টা ১৫ মিনিটে সিএনএন আরো বিস্তারিত তথ্যসহ এটি নিশ্চিত করে এবং উভয় সংবাদমাধ্যমই একাধিক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দেয়। অবশেষে শনিবার সকালে সরকার এই হামলার চেষ্টার বিষয়টি নিশ্চিত করে, যা ঘটনাটি ঘটার ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় পর।
ব্যাডেনক বলেছেন, এটি লেবার সরকারের ‘ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার সংস্কৃতি এবং সত্যকে বোঝার সমস্যা’ । তিনি আরো বলেন, ‘এই হামলার চেষ্টার খবর আমাদের সরকার স্বীকার করার অনেক আগেই যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে গিয়েছিল এবং মার্কিন কর্মকর্তারা সেটি নিশ্চিত করেছিলেন।’ কিন্তু সরকারের একটি সূত্র বলেছে, ‘এটি একজন টোরি (কনজারভেটিভ পার্টি) নেতার আরো একটি মরিয়া চেষ্টা। তিনি এই সংকটের প্রতিটি পর্যায়ে বারবার ভুল করেছেন।’
সরকার এখনও নিশ্চিত করেনি হামলাটি ঠিক কখন হয়েছিল। শুধু এটুকু জানিয়েছে, শুক্রবার বিকেলে ডিয়েগো গার্সিয়া এবং আরএএফ ফেয়ারফোর্ড থেকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলা চালানোর অনুমতি দেওয়ার আগেই এটি ঘটেছিল। কিন্তু এই ঘোষণার পাশাপাশি বা শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া কোনো আপডেটেও হামলার চেষ্টার কথা উল্লেখ করা হয়নি।
রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ স্যার কিয়ারকে ‘প্রতারক ও অসৎ’ বলে অভিযুক্ত করেছেন এবং বলেছেন, যদি হামলার খবর গণমাধ্যমে না আসত, সরকার জনগণকে জানাত না। রিফর্ম ইউকের এই নেতা ডেইলি মেইলকে বলেছেন, ‘চাগোস দ্বীপপুঞ্জে ইরানের হামলাকে ছোট করে দেখানোর বা ধামাচাপা দেওয়ার কোনো চেষ্টা যদি এই সরকারের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে, তাহলে সত্যি বলতে এটি একটি জাতীয় কেলেঙ্কারি। এটি কোনো সামান্য প্রশাসনিক ভুল নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা এবং ব্রিটিশ ভূখণ্ডের সুরক্ষার বিষয়।’
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এই ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় মিত্রদের ইরানের বিরুদ্ধে তাদের লড়াইয়ে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু গতকাল স্টিভ রিড ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইউরোপে পৌঁছাতে সক্ষম দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির বিষয়ে ইরানের ব্যাপারে ইসরায়েলের সতর্কবার্তা অতিরঞ্জিত।
সম্প্রদায় বিষয়ক সচিব বলেছেন, ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী দেশকে রক্ষা করতে সম্পূর্ণ সক্ষম, কিন্তু তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ডিয়েগো গার্সিয়ার কতটা কাছাকাছি পৌঁছেছিল তা প্রকাশ করেননি। এই আশঙ্কাও রয়েছে যে, ইরান ব্রিটেনের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন হামলা চালাতে পারে। সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী টোবিয়াস এলউড সতর্ক করে বলেছেন, ব্রিটেনের নিজস্ব ‘পার্ল হারবার’-এর মতো পরিণতি ভোগ করাটা ‘শুধু সময়ের ব্যাপার’।
তিনি বলেন, ‘ডিয়েগো গার্সিয়া বিশ্বের অন্যতম সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটি, কিন্তু যুক্তরাজ্যের বেশিরভাগ সামরিক ঘাঁটির আমেরিকান সক্ষমতার মতো সুবিধা নেই।’ ইসরায়েলের আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমতুল্য কোনো ব্যবস্থা ব্রিটেনের নেই এবং এর পরিবর্তে ছয়টি টাইপ ৪৫ ডেস্ট্রয়ারের একটি নৌবহরের ওপর নির্ভর করতে হবে। কিন্তু নৌবহরের বেশির ভাগই বন্দরে রয়েছে এবং তাৎক্ষণিক কোনো হামলার বিরুদ্ধে অকার্যকর হবে, অন্যদিকে এইচএমএস ড্রাগন নামের একটি জাহাজ এখনও সাইপ্রাসের পথে রয়েছে।
এর অর্থ, ব্রিটেনকে ন্যাটো মিত্রদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হবে। যার মধ্যে রয়েছে তুরস্কের থাড সিস্টেম, রোমানিয়া ও পোল্যান্ডে অবস্থিত আমেরিকান এজিস অ্যাশোর সিস্টেম বা জার্মানির মার্কিন-নির্মিত প্যাট্রিয়ট সিস্টেম। একজন সরকারি মুখপাত্র বলেছেন, ‘ব্রিটিশ নাগরিক, ব্রিটিশ স্বার্থ এবং আমাদের অংশীদারদের জন্য ইরানের নির্বিচার হামলা যে হুমকি সৃষ্টি করে, সে বিষয়ে এই সরকার স্পষ্ট।’
১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট গত রাতে জানিয়েছে, স্যার কিয়ার হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন। একজন মুখপাত্র বলেছেন, ‘নেতারা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারা একমত হয়েছেন যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া অপরিহার্য।’
সূত্র: ডেইলি মেইল