* সুদহার কমলেও আস্থা কমেনি বিনিয়োগকারীদের
* সরকারের ঋণনির্ভরতায় সঞ্চয়পত্রের গুরুত্ব
* অতীতের ঋণাত্মক প্রবণতা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতির বহুমুখী চাপে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় সক্ষমতা কমার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও অনিশ্চয়তা কাটেনি ব্যাংক-শেয়ারবাজারে। ফলে সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছে মানুষ। বাড়ছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। নিরাপদ বিনিয়োগের খোঁজে মানুষ ঝুঁকিমুক্ত এই খাতের দিকেই ঝুঁকছেন বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতর সঞ্চয়পত্র বিক্রির সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য বলছে, গত বছরের ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সপ্তম মাস জানুয়ারিতে সঞ্চয়পত্রের নিট বা প্রকৃত বিক্রির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৮৫১ কোটি ৩ লাখ টাকা ধনাত্মক। অর্থাৎ এই মাসে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল গ্রাহকদের পরিশোধের পরও ১ হাজার ৮৫১ কোটি ৩ লাখ টাকা সরকারের কোষাগারে জমা ছিল। এই টাকা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ অন্যান্য খাতে খরচ করতে পেরেছে সরকার।
আরো পড়ুন:
২০২৬ সালের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা
তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অষ্টম মাস এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। প্রায় নয় মাস পর আবারও মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ঘরে উঠল। এর আগে গত বছরের মে মাসে এই হার ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে এটি ৯ শতাংশের নিচে থাকলেও গত এপ্রিলে ছিল ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং জুনে নেমে আসে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে।
সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে গত বছরের জানুয়ারিতে সরকার সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাড়িয়েছিল। মেয়াদভেদে তখন সর্বোচ্চ মুনাফা হার দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ। জনপ্রিয় পরিবার সঞ্চয়পত্রের হার ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ করা হয়।
তবে ছয় মাসের মাথায় আবার সুদহার কমানো হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতে, অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ সুদহার নির্ধারণ করা হয় ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ।
পরে ৩১ ডিসেম্বর এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১ জানুয়ারি থেকে আরও এক দফা সুদ কমানোর ঘোষণা দিলেও মাত্র চার দিনের মধ্যে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। ফলে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত হারই এখনো কার্যকর রয়েছে।
সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রাতেও পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটে এ খাত থেকে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য থাকলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা করা হয়।
এর আগের দুই অর্থবছরেও সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক ছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল লক্ষ্য ছিল ১৮ হাজার কোটি টাকা, যা পরে কমিয়ে ৭ হাজার ৩১০ কোটি টাকা করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত ওই অর্থবছরে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক দাঁড়ায় ২১ হাজার ১২৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

মানুষ নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ মাধ্যম খুঁজছে
২০২২-২৩ অর্থবছরে ঋণাত্মক পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। অথচ ২০২১-২২ অর্থবছরে নিট বিক্রি ছিল ১৯ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে তা আরও বেশি হয়ে দাঁড়ায় ৪১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের সঞ্চয়ের প্রবণতা কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি, বরং উল্টো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে মানুষ নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ মাধ্যম খুঁজছে। যাদের হাতে কিছু সঞ্চয় রয়েছে, তারা তা সঞ্চয়পত্রেই বিনিয়োগ করছেন।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিন ধরে শেয়ারবাজারে মন্দার কারণে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে বা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে বিকল্প হিসেবে সঞ্চয়পত্রই তাদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। এছাড়া তুলনামূলকভাবে সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার এখনো বেশি থাকায় বিনিয়োগকারীরা এই খাতকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন।
প্রতি বছরই বাজেটে বড় ঘাটতি রেখে তা অনুমোদন দেওয়া হয়, যা পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেয়। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক খাতের পাশাপাশি সঞ্চয়পত্র অন্যতম।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে নিট ঋণের লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়ে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি আগের অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা এবং সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা কম।
বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের অধীনে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু রয়েছে—পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। -মুহা. তারিক আবেদীন ইমন