ইরানের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ভয়ে জীবন বাঁচাতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন মার্কিন সেনারা।
তেহরানের হামলার ভয়ে ঘাঁটি ছেড়ে নিকটবর্তী হোটেল ও অফিস স্পেসে কাজ করতে শুরু করেছেন তারা। এতে সেনাদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দ্য টেলিগ্রাফের।
মার্কিন ও আঞ্চলিক ঘাঁটিতে শতাধিক বার হামলা চালিয়েছে ইরান। মার্কিন স্যাটেলাইট সংস্থাগুলো অন্তত ১৪ দিন ধরে ছবি প্রকাশে বিলম্ব করেছে। যার ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ক্রমাগত হামলার ফলে কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত জুড়ে থাকা ১৩টি মার্কিন ঘাঁটির মধ্যে অনেকগুলোই প্রায় বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
এসব ঘাঁটির মধ্যে কুয়েতের আলি আল সালেম সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হয়েছে, মোট ২৩ বার। এর পরেই রয়েছে ক্যাম্প আরিফজান এবং ক্যাম্প বুহরিং। এগুলোতে ১৭ বার হামলা চালানো হয়েছে। এই তিনটি ঘাঁটির স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, হ্যাঙ্গার, যোগাযোগ অবকাঠামো, স্যাটেলাইট যন্ত্রপাতি, জ্বালানি সংরক্ষণাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরান মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৭ বার, বাহরাইনে ১৬ বার, ইরাকে ৭ বার, কাতারে ৬ বার, সৌদি আরবে ৬ বার এবং জর্ডানে ২ বার হামলা চালিয়েছে।
আলি আল সালেমে হামলায় একটি বড় গুদাম ধ্বংস হয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, সৌদি আরবে প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ঢালু ছাদযুক্ত একটি হ্যাঙ্গার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম মার্কিন ঘাঁটি কাতারের আল উদেদ বিমান ঘাঁটিতে একাধিক অ্যান্টেনা এবং স্যাটেলাইট অ্যারের ধ্বংসাবস্থা দেখা গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে আল ধাফরা বিমান ঘাঁটিতে সেনাদের থাকার জন্য ব্যবহৃত একটি ভবনের মধ্যে একটি বড় গর্ত তৈরি হয়েছে।
ইরানি সূত্র দাবি করেছে, এই হামলাটি ইরানের অস্ত্রাগারের সবচেয়ে উন্নত খোররামশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি থাড সিস্টেমের যন্ত্রাংশ রাখা চারটি স্থাপনায়ও হামলা চালিয়েছে ইরান।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের একটি সমীক্ষা অনুসারে, যুদ্ধের শুরু দিকেই ইরানের চালানো হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৮০০ মিলিয়ন ডলার (৬০০ মিলিয়ন পাউন্ড) মূল্যের ক্ষতি হয়েছে।
যার মধ্যে জর্ডানে অবস্থিত একটি আমেরিকান থাড (টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স) রাডার এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য অবকাঠামোতে আঘাত হানার ঘটনা রয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে ব্যাপক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার চলমান শান্তি আলোচনা যদি কোনো কারণে ফলপ্রসূ না হয় তবে ইরানজুড়ে এক ভয়াবহ ‘চূড়ান্ত হামলার’ পরিকল্পনা করছে পেন্টাগন।
এই পরিকল্পনায় ইরানে ব্যাপক বিমান হামলার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো বড় ধরনের স্থলবাহিনী নামানোর চিন্তাও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।
অন্যদিকে সাবেক ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান ইয়াল হুলাতা বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করার আগে এমন কোনো স্পষ্ট অর্জন চাইছেন যা ইরানকে কোনো প্রতীকী বিজয় দাবি করতে দেবে না।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গোপন আস্তানায় অবস্থানরত ৫ শতাধিক মার্কিন সেনার ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান।
আরো পড়ুন:
আমিরাতকে তছনছ করে ফেলার হুমকি ইরানের
শনিবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি এই তথ্য জানিয়েছেন।
আল জাজিরা ইরানি সংবাদ সংস্থা তাসনিমে প্রকাশিত ইরানি সেনা কর্মকর্তা জোলফাগারির বিবৃতির বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইরানি বাহিনী দুবাইয়ের দুটি স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ওই স্থানগুলোতে ৫০০-এর বেশি মার্কিন সেনা লুকিয়ে ছিল। এই হামলায় তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, দুবাইয়ের একটি হোটেল এবং উপকূলীয় এলাকায় মার্কিন ড্রোন ইউনিটের কর্মকর্তাদের জমায়েত লক্ষ্য করে কামিকাজে বা আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
এ ছাড়া কুয়েতের আল-শুয়াইখ বন্দরে অবস্থানরত ছয়টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজেও কাদের-৩৮০ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি।
মার্কিন সেনাদের ‘আক্রমণাত্মক সেনাবাহিনী’ হিসাবে অভিহিত করে জোলফাগারি বলেন, ‘আমরা আগেই সতর্ক করেছিলাম, আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর শক্তিশালী আক্রমণ এবং এ অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলো ধ্বংস হওয়ার পর তারা প্রাণভয়ে পালিয়েছে এবং ঘাঁটির বাইরে আত্মগোপন করেছে।’