০২:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬

সিন্ডিকেটের খপ্পরে ভোজ্যতেলের বাজার

  • আপডেট সময়: ০২:৫০:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২৬
  • 5

ভোজ্যতেলের বাজারে হঠাৎ আগুন। ছবি: ঢাকা মেইল


  • বাজারে আগুন, দামে নতুন উল্লম্ফন
  • লিটারে ২০-৩০ টাকা বেশি দামে বিক্রি
  • সরবরাহ কমের অজুহাতে দাম বৃদ্ধি
  • মিলগেট দাম বাড়ার অভিযোগ
  • ১ বছরে দাম বেড়েছে ১৮ শতাংশ
  • সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই: ক্যাব

ঈদুল ফিতরের আগেই বাড়তে শুরু করা ভোজ্যতেলের দাম ঈদের পর আরও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরা বাজারে খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে খোলা পাম তেলের দামও। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, সরবরাহে ঘাটতি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সিন্ডিকেটের তৎপরতা—সব মিলিয়েই ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কতিপয় ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করে আসছেন। বারবার উদ্যোগ নেওয়ার পরও সরকারি হস্তক্ষেপে দাম বাড়াতে পারেননি। এবার নানা অজুহাতে সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়েছে সয়াবিনের বাজার। ফলে অতিরিক্ত চাপ পড়ছে ভোক্তার ওপর।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, পল্টন, যাত্রাবাড়ী, রায়সাহেব বাজার, কলতাবাজার ও লক্ষ্মীবাজার ঘুরে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল বাজারভেদে প্রতি লিটার ১৯৫ থেকে ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এক সপ্তাহ আগেও এই তেল ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকার মধ্যে পাওয়া গেছে। একই সময়ে খোলা পাম তেলের দামও লিটারে প্রায় ১০ টাকা বেড়ে এখন ১৮৪ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বিক্রেতাদের দাবি, মিলগেট পর্যায়ে দাম বাড়ার কারণেই খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের সংকটের অজুহাতে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে পাইকারি বাজারে দাম বাড়তেই খুচরা বাজারেও দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

কারওয়ান বাজার কিচেন মার্কেটের বিক্রেতা শাহাদাত হোসেন জানান, ঈদের আগের সপ্তাহের তুলনায় এখন খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রায় ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একইভাবে খোলা পাম তেলের দামও দ্রুত বেড়েছে।

সর্বশেষ গত বছরের ডিসেম্বরে ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৭৬ টাকা এবং পাম তেলের দাম ১৬৬ টাকা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বর্তমানে বাজারে এই দুই ধরনের তেলই নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে সে দামেও পাওয়া যাচ্ছে না।

বাজারে সক্রিয় সিন্ডিকেট। ছবি: সংগৃহীত

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছে। আর গত বছরের তুলনায় খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ১৮ শতাংশ এবং পাম তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ।

এদিকে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রায় দেড় মাস ধরে বাজারে ছোট বোতলের তেল পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন অনেক ক্রেতা। অনেক ক্ষেত্রে দোকানে পাঁচ লিটারের বোতল ছাড়া অন্য কোনো আকারের বোতল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ বাধ্য হয়ে খোলা তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। কিন্তু খোলা তেলের দামও বাড়ায় তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

“অতীতে অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের দাবির প্রভাবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন সরকার এ বিষয়ে কতটা দৃঢ় অবস্থান নেয়, সেটি এখন দেখার বিষয়।”

এসএম নাজের হোসাইন, সহসভাপতি, ক্যাব

যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী সাব্বির হোসেন জানান, আগে নিয়মিত বোতলজাত তেল কিনতেন। কিন্তু এখন ছোট বোতল না পাওয়ায় খোলা তেল কিনতে হচ্ছে। সেখানে গিয়ে দেখছেন দাম আরও বেশি।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজানের শুরু থেকেই কিছু প্রভাবশালী কোম্পানি ডিলারদের মাধ্যমে বোতলজাত তেলের সরবরাহ সীমিত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে দাম বাড়ানোর নতুন চাপ তৈরি করা হচ্ছে।

আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি দেশে আমদানিও কম হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। একইভাবে মোট ভোজ্যতেল আমদানিও কমেছে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার টন।

অন্যদিকে বাজার বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, সরবরাহে প্রকৃত সংকটের চেয়ে সিন্ডিকেটের তৎপরতাই বেশি প্রভাব ফেলছে। তাদের মতে, বাজারে দাম বাড়লে দ্রুত তার প্রভাব পড়ে খুচরা পর্যায়ে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যায় না।

ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে যেন কেউ অযৌক্তিকভাবে দাম না বাড়াতে পারে, সে জন্য বাজার তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

এদিকে বাজারে শুধু ভোজ্যতেল নয়, এলপি গ্যাসের দামও বেড়েছে। এলপিতে এক লাফে ১২ কেজি সিলিন্ডারে প্রায় ৪০০ টাকা দাম বেড়েছে।

ভোজ্যতেল অবৈধ মজুদের অভিযোগ উঠেছে। ছবি: সংগৃহীত

এছাড়া ব্রয়লার, সোনালি ও দেশি মুরগির দামও বেড়েছে। পাশাপাশি মাছ, চাল, ডালসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এতে মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

যদিও গত মাসেই বাণিজ্যমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, দেশে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং দাম বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু বাস্তব বাজার পরিস্থিতি তার বিপরীত চিত্রই তুলে ধরছে। ফলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


আরো পড়ুন

বৈশ্বিক সংকট দেশে বড় চাপ তৈরি করছে, বাড়তে পারে পণ্যমূল্য: অর্থমন্ত্রী


এদিকে ভোজ্য তেলের বাজারে অস্থিরতার বিষয়ে কথা বলেন ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা জাতীয় সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন। ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ভোজ্যতেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বাস্তবে কোনো ঘাটতি নেই। দীর্ঘদিন ধরেই কিছু ব্যবসায়ী বিভিন্ন অজুহাতে দাম বাড়ানোর সুযোগ খুঁজছিলেন, আর বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে তারা সেই সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছেন। তার মতে, দেশে ভোজ্যতেলের দাম বাড়লে দ্রুতই তার প্রভাব সব পর্যায়ের বাজারে পড়ে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও সাধারণ ভোক্তা সেই সুফল খুব কমই পান।

খুচরা ব্যবসায়ীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা বেশি দামে তেল কিনে থাকলে বেশি দামে বিক্রি করাটা স্বাভাবিক। তবে সে ক্ষেত্রে তাদের কাছে ক্রয়ের রশিদ বা ভাউচার থাকা জরুরি।

নাজের হোসাইন বলেন, সরকার যেন ব্যবসায়ীদের চাপে পড়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়—এটাই ভোক্তাদের প্রত্যাশা। অতীতে অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের দাবির প্রভাবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন সরকার এ বিষয়ে কতটা দৃঢ় অবস্থান নেয়, সেটি এখন দেখার বিষয়। -মহিউদ্দিন রাব্বানি

উত্তরাধুনিক

Writer, Singer & Environmentalist

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রকে প্রস্তাব পাকিস্তানের, যুদ্ধবিরতি হতে পারে আজই

সিন্ডিকেটের খপ্পরে ভোজ্যতেলের বাজার

আপডেট সময়: ০২:৫০:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২৬

ভোজ্যতেলের বাজারে হঠাৎ আগুন। ছবি: ঢাকা মেইল


  • বাজারে আগুন, দামে নতুন উল্লম্ফন
  • লিটারে ২০-৩০ টাকা বেশি দামে বিক্রি
  • সরবরাহ কমের অজুহাতে দাম বৃদ্ধি
  • মিলগেট দাম বাড়ার অভিযোগ
  • ১ বছরে দাম বেড়েছে ১৮ শতাংশ
  • সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই: ক্যাব

ঈদুল ফিতরের আগেই বাড়তে শুরু করা ভোজ্যতেলের দাম ঈদের পর আরও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরা বাজারে খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে খোলা পাম তেলের দামও। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, সরবরাহে ঘাটতি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সিন্ডিকেটের তৎপরতা—সব মিলিয়েই ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কতিপয় ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করে আসছেন। বারবার উদ্যোগ নেওয়ার পরও সরকারি হস্তক্ষেপে দাম বাড়াতে পারেননি। এবার নানা অজুহাতে সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়েছে সয়াবিনের বাজার। ফলে অতিরিক্ত চাপ পড়ছে ভোক্তার ওপর।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, পল্টন, যাত্রাবাড়ী, রায়সাহেব বাজার, কলতাবাজার ও লক্ষ্মীবাজার ঘুরে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল বাজারভেদে প্রতি লিটার ১৯৫ থেকে ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এক সপ্তাহ আগেও এই তেল ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকার মধ্যে পাওয়া গেছে। একই সময়ে খোলা পাম তেলের দামও লিটারে প্রায় ১০ টাকা বেড়ে এখন ১৮৪ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বিক্রেতাদের দাবি, মিলগেট পর্যায়ে দাম বাড়ার কারণেই খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের সংকটের অজুহাতে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে পাইকারি বাজারে দাম বাড়তেই খুচরা বাজারেও দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

কারওয়ান বাজার কিচেন মার্কেটের বিক্রেতা শাহাদাত হোসেন জানান, ঈদের আগের সপ্তাহের তুলনায় এখন খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রায় ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একইভাবে খোলা পাম তেলের দামও দ্রুত বেড়েছে।

সর্বশেষ গত বছরের ডিসেম্বরে ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৭৬ টাকা এবং পাম তেলের দাম ১৬৬ টাকা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বর্তমানে বাজারে এই দুই ধরনের তেলই নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে সে দামেও পাওয়া যাচ্ছে না।

বাজারে সক্রিয় সিন্ডিকেট। ছবি: সংগৃহীত

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছে। আর গত বছরের তুলনায় খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ১৮ শতাংশ এবং পাম তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ।

এদিকে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রায় দেড় মাস ধরে বাজারে ছোট বোতলের তেল পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন অনেক ক্রেতা। অনেক ক্ষেত্রে দোকানে পাঁচ লিটারের বোতল ছাড়া অন্য কোনো আকারের বোতল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ বাধ্য হয়ে খোলা তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। কিন্তু খোলা তেলের দামও বাড়ায় তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

“অতীতে অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের দাবির প্রভাবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন সরকার এ বিষয়ে কতটা দৃঢ় অবস্থান নেয়, সেটি এখন দেখার বিষয়।”

এসএম নাজের হোসাইন, সহসভাপতি, ক্যাব

যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী সাব্বির হোসেন জানান, আগে নিয়মিত বোতলজাত তেল কিনতেন। কিন্তু এখন ছোট বোতল না পাওয়ায় খোলা তেল কিনতে হচ্ছে। সেখানে গিয়ে দেখছেন দাম আরও বেশি।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজানের শুরু থেকেই কিছু প্রভাবশালী কোম্পানি ডিলারদের মাধ্যমে বোতলজাত তেলের সরবরাহ সীমিত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে দাম বাড়ানোর নতুন চাপ তৈরি করা হচ্ছে।

আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি দেশে আমদানিও কম হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। একইভাবে মোট ভোজ্যতেল আমদানিও কমেছে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার টন।

অন্যদিকে বাজার বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, সরবরাহে প্রকৃত সংকটের চেয়ে সিন্ডিকেটের তৎপরতাই বেশি প্রভাব ফেলছে। তাদের মতে, বাজারে দাম বাড়লে দ্রুত তার প্রভাব পড়ে খুচরা পর্যায়ে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যায় না।

ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে যেন কেউ অযৌক্তিকভাবে দাম না বাড়াতে পারে, সে জন্য বাজার তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

এদিকে বাজারে শুধু ভোজ্যতেল নয়, এলপি গ্যাসের দামও বেড়েছে। এলপিতে এক লাফে ১২ কেজি সিলিন্ডারে প্রায় ৪০০ টাকা দাম বেড়েছে।

ভোজ্যতেল অবৈধ মজুদের অভিযোগ উঠেছে। ছবি: সংগৃহীত

এছাড়া ব্রয়লার, সোনালি ও দেশি মুরগির দামও বেড়েছে। পাশাপাশি মাছ, চাল, ডালসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এতে মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

যদিও গত মাসেই বাণিজ্যমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, দেশে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং দাম বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু বাস্তব বাজার পরিস্থিতি তার বিপরীত চিত্রই তুলে ধরছে। ফলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


আরো পড়ুন

বৈশ্বিক সংকট দেশে বড় চাপ তৈরি করছে, বাড়তে পারে পণ্যমূল্য: অর্থমন্ত্রী


এদিকে ভোজ্য তেলের বাজারে অস্থিরতার বিষয়ে কথা বলেন ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা জাতীয় সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন। ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ভোজ্যতেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বাস্তবে কোনো ঘাটতি নেই। দীর্ঘদিন ধরেই কিছু ব্যবসায়ী বিভিন্ন অজুহাতে দাম বাড়ানোর সুযোগ খুঁজছিলেন, আর বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে তারা সেই সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছেন। তার মতে, দেশে ভোজ্যতেলের দাম বাড়লে দ্রুতই তার প্রভাব সব পর্যায়ের বাজারে পড়ে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও সাধারণ ভোক্তা সেই সুফল খুব কমই পান।

খুচরা ব্যবসায়ীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা বেশি দামে তেল কিনে থাকলে বেশি দামে বিক্রি করাটা স্বাভাবিক। তবে সে ক্ষেত্রে তাদের কাছে ক্রয়ের রশিদ বা ভাউচার থাকা জরুরি।

নাজের হোসাইন বলেন, সরকার যেন ব্যবসায়ীদের চাপে পড়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়—এটাই ভোক্তাদের প্রত্যাশা। অতীতে অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের দাবির প্রভাবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন সরকার এ বিষয়ে কতটা দৃঢ় অবস্থান নেয়, সেটি এখন দেখার বিষয়। -মহিউদ্দিন রাব্বানি