তৈরি পোশাক শিল্পের মেলায় প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীরা। ছবি: সংগৃহীত
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, পরিবর্তিত বাণিজ্যনীতি এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবে দেশের তৈরি পোশাক খাত ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে খাতটির বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সুযোগ সংকুচিত করছে এবং প্রধান রফতানি বাজারগুলো থেকে ক্রয়াদেশ কমার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
শনিবার (২ মে) বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টেক্সটাইল, নিটিং অ্যান্ড গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি এক্সিবিশন (বিটিকেজি) ২০২৬-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব বলেন। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) ও ইনফোরচেইন ডিজিটাল টেকনোলজি কোং লিমিটেড যৌথভাবে এ আয়োজন করে।

মেলার প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীরা। ছবি: সংগৃহীত
বক্তারা জানান, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে শিল্পখাতে আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে রপ্তানি অর্ডার কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাজার বৈচিত্র্যকরণ, দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য চুক্তি এবং জ্বালানি ও আর্থিক সক্ষমতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
আরো পড়ুন:
পোশাক শিল্পের পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগের?
ইউরোচেম বাংলাদেশ চেম্বারের চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ যদি স্থায়ী বাজার সুবিধার বিকল্প তৈরি করতে না পারে, তবে তা বড় ধরনের ধাক্কা হয়ে দাঁড়াবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এতে একটি স্থায়ী ও পূর্বানুমানযোগ্য কাঠামো তৈরি হবে, যা জিএসপি প্লাসের তুলনায় কম অনিশ্চিত।
নুরিয়া লোপেজ বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের করপোরেট সাসটেইনেবিলিটি ডিউ ডিলিজেন্স ফ্রেমওয়ার্ক ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তা সরবরাহকারীদের ওপরও প্রযোজ্য হবে। ফলে প্রস্তুতকারকদের এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। এই ব্যয় একা কারখানাগুলোর পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়; বরং ক্রেতা, সরকার ও উৎপাদকদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগি প্রয়োজন, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য।
ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, শিল্পখাতটি এখন একাধিক কাঠামোগত ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। আমদানিনির্ভরতা ও বৈশ্বিক অস্থিরতা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন সৃষ্টি করছে, যা শ্রমনির্ভর এই খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের প্রভাব পড়তে পারে ভবিষ্যৎ রপ্তানি অর্ডারের ওপর। এতে কারখানাগুলো কম সক্ষমতায় চলতে বাধ্য হতে পারে এবং আর্থিক চাপ আরও বাড়বে। বারবার সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা টেকসই নয়। নির্দিষ্ট সংকট মোকাবিলায় লক্ষ্যভিত্তিক তহবিল গঠন করতে হবে।
শনিবার বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টেক্সটাইল, নিটিং অ্যান্ড গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি এক্সিবিশন (বিটিকেজি) ২০২৬-এর সমাপনী অনুষ্ঠান। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের পরিচালক আখতার হোসেন আপুর্ব বলেন, বর্তমান সংকট সাময়িক নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থা, মজুদ ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি ব্যবহারে নতুন কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন। ‘জাস্ট ইন টাইম’ ভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থা এখন আর কার্যকর নয়।
এর আগে, গত ২৯ এপ্রিল শুরু হওয়া চার দিনের এ মেলায় প্রায় ২৮টি দেশের ৯ শতাধিক প্রদর্শক অংশ নেন। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে ছিল কানাডা, চীন, তাইওয়ান, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, হংকং, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। মেলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ স্টলে টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত যন্ত্রপাতি, ডাই ও কেমিক্যালস, নিটিং ও উইভিং প্রযুক্তি, এমব্রয়ডারি, কাটিং-সেলাই এবং ওয়াশিং ও ড্রাই ক্লিনিং প্রযুক্তি প্রদর্শন করা হয়।
এক্সপো চলাকালে চারটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সমাপনী অনুষ্ঠানে অতিথি ও অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জানান বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ রাশেদ। উপস্থিত ছিলেন ইনফোরচেইন সিইও স্পেন্সার লিন।