ছবি: রয়টার্স
টানা ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আরো ৩০ দিন গড়ালেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শান্তি আলোচনার পথ এখনো সুদূরপ্রসারী। কূটনৈতিক আলোচনা চলমান থাকলেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের দূরত্ব রয়েই গেছে। ফলে যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে রূপ নেবে কিনা, তা এখনো অনিশ্চিত।
তবে সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে উভয় পক্ষের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে ইরান।
ফলে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি যুদ্ধ পরিস্থিতিও কার্যত পুরোপুরি থেমে যায়নি বলা যায়। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাবে ইরান কী ধরনের প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে কিংবা সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে তেহরানকে কতটা ছাড় দিতে হবে—তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রস্তাব
মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, ওয়াশিংটন চলতি সপ্তাহে ইরানের কাছে ১৪ দফার একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ইরানকে অন্তত ১২ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা না করার অঙ্গীকার করতে হবে।
এ ছাড়া ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে হস্তান্তরের কথাও বলা হয়েছে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে। বিদেশে আটকে থাকা ইরানের বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্ত করবে এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেবে।
প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার পুরোপুরি উন্মুক্ত করা হবে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জাঁতাকলে ইরান
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে ইরান। ২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে হওয়া পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়েছিল।
কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় থাকাকালে একতরফাভাবে সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর আবারও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
কোন দিকে যাচ্ছে ইরান
তবে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের জবাব দেয়নি তেহরান।
যদিও দেশটির নেতারা ইতোমধ্যে প্রস্তাবের বিভিন্ন দিক নিয়ে আপত্তি তুলেছেন।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই বলেন, এই প্রস্তাব ‘বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার চেয়ে মার্কিন ইচ্ছার তালিকাই বেশি’।
যুক্তরাষ্ট্রের আশাবাদী এসব প্রস্তাবকে কটাক্ষ করে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার বাঘের গালিবাফ বলেন, ‘অপারেশন ট্রাস্ট মি ব্রো’ ব্যর্থ হয়েছে।
আলোচনার মধ্যেই পাল্টাপাল্টি আঘাত
এর আগে গত বৃহস্পতিবার ইরানের সামরিক বাহিনী অভিযোগ করে, ইরানি একটি তেলবাহী জাহাজ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজেইরাহ বন্দরের কাছে আরেকটি জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
একই সঙ্গে দক্ষিণ ইরানের বন্দর খামির, সিরিক ও কেশম দ্বীপে মার্কিন বিমান হামলার অভিযোগও তোলে তেহরান।
তবে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে তাদের নৌবাহিনী ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও দ্রুতগতির নৌকার হামলার মুখে পড়ে। এর জবাবে ‘হুমকি ধ্বংস’ এবং ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। তবে এত উত্তেজনার মধ্যেও ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো ভেঙে পড়েনি।
হামলা-মধ্যস্থতা-কূটনীতি-চাপ প্রয়োগ
তেহরান থেকে আলজাজিরার প্রতিবেদক রেসুল সেরদার আতাসের তথ্যমতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, তারা এখনো মার্কিন প্রস্তাব পর্যালোচনা করছেন।
এর আগে খবর বের হয়েছিল, পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের জবাব পাঠানো হতে পারে। তবে তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
মুখপাত্র আতাস বলেন, ‘সামরিক সংঘর্ষ ও উত্তেজনা চললেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। উভয়পক্ষই এখনও আলোচনার পথ খোলা রাখতে আগ্রহী।’
তবে তার ভাষায় ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি দাবি অবাস্তব। যা অযৌক্তিক এবং সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের কৌশল।’
চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ১৪ দফা প্রস্তাবের আগে ইরানও একটি ১৪ দফা পরিকল্পনা দিয়েছিল। সেখানে তারা শুধু সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, পুরো যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি চেয়েছিল। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ হামলা না করার নিশ্চয়তা, ইরানের আশপাশ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণ, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালির জন্য নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগের দিনও ইরান ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছিল। ট্রাম্প সেটিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব’ বললেও ‘যথেষ্ট নয়’ বলে মন্তব্য করেন।
মূল ইস্যুতে অনড় ইরান
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরেই মূলত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কেননা ইরান বরাবরই বলে আসছে, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) সদস্য হিসেবে শান্তিপূর্ণ কাজে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এটিকে ‘চরম সীমা বা অপরিবর্তনীয় শর্ত’ হিসেবে দেখছে।
বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য সাধারণত ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন হয়।
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে ইরানকে ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র তা পুরোপুরি শূন্যে নামিয়ে আনার দাবি তুলেছে।
বিশ্লেষক নেগার মোরতাজাভি মনে করেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি শেষ হলে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কিছু নমনীয়তা দেখাতে পারে। তবে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে রাজি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
আলজাজিরার প্রতিবেদক আতাস জানান, ইরান বর্তমানে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা নয়, বরং ‘সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ’ করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তার ভাষায়, ইরান চায় ভবিষ্যতে যেন আর হামলার শিকার না হতে হয়- সেজন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সরাসরি নিশ্চয়তা। একই সঙ্গে সব ধরনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারও চায় তেহরান।
সমঝোতার সুদূরপ্রসারী পথ
আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী বায়েজ বলেন, সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে হয় দুই পক্ষকেই কষ্টকর ছাড় দিতে হবে, নয়তো বড় মতপার্থক্যের বিষয়গুলো ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রেখে কাঠামোগত সমঝোতায় যেতে হবে।
যুক্তরাজ্যের ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ক্রিস ফেদারস্টোনের মতে, এখন পর্যন্ত নিজের অবস্থানে অনড় থেকেছে ইরান। এতে ট্রাম্প প্রশাসন কিছুটা বিস্মিত হয়েছে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি ইরান। কারণ তারা মনে করে, ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে—এমন বিশ্বাস করার মতো পরিস্থিতি নেই।’
সব মিলিয়ে, কূটনৈতিক আলোচনা এখনো চলমান থাকলেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের দূরত্ব রয়ে গেছে। ফলে যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপ নেবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।