১২:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

নিজেদের দেশের স্বার্থেই ইরানি জনগণকে শান্ত থাকতে হবে

  • আপডেট সময়: ০৪:১৩:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • 26

ছবি সূত্র: reddit.com


উত্তরাধুনিক ডেস্ক: ইরান এমন একটি দেশ, যে দেশ ইসরায়েলকে সমুচিত শিক্ষা দিয়েছে। আর ইরানের সক্ষমতা ও অখণ্ডতা বজায় রাখতে এই মুহূর্তে সবচাইতে জরুরি সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ না করে সরকারের সঙ্গেই থাকা।

কয়েকদিন আগে নেতানিয়হু আস্ফালন ভরে বলেছিলেন ইরান আক্রমণ করবে ইসরায়েল। তারপরেই আগের বার ইরানের হাতে মার খাওয়ার কথা স্মরণ করে তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মাধ্যমে ইরানের প্রতি শান্তির বার্তা পাঠান। তার উদ্দেশ্য যে শান্তি নয়, বরং ইরানকে কূটকৌশলের মাধ্যমে পরাস্ত করা, সেটা এখন পরিস্কার। নানা মেকানিজম প্রয়োগ করে, মোশাদ ও অশুভ মিত্রদের সহায়তায় তিনি খামেনি সরকারের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণকে খেপিয়ে তুলেছেন। উদ্দেশ্য, দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা খামেনি সরকারের উৎখাত। একটা নৈরাজ্য সৃষ্টি করে তিনি ইরানকে করায়ত্ত করার ফাঁদ পেতেছেন। এতে অনেকসময় ফল পাওয়া যায়। যেমনটি আমরা দেখেছি লিবিয়ায় গাদ্দাফির ক্ষেত্রে। জনগণ মনে করে, দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকলে সেই সরকার দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতালোভী হয়ে যায়। এটা তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিলো না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কৌশলে জনগণকে খেপিয়ে গাদ্দাফিকে করুণ পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়।

এই সত্যটি ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের ক্ষেত্রে যতোটা প্রযোজ্য ছিলো, বর্ণিত ওই দুই রাষ্ট্রনায়কের ক্ষেত্রে তেমন নগ্ন সত্য নয়। বরং জুলাই যোদ্ধারা এক্ষেত্রে এক কাঠি সরস। তারা প্রতিবেশী দেশের উস্কানি ও প্রত্যক্ষ মদদের মধ্যেও হাসিনাকে বিতাড়িত করেছেন। মোদ্দা কথা, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য দেশের যেমন নাক গলানো উচিৎ নয়, তেমনি জনগণকেও বুঝতে হবে নিজেদের ভালো কীভাবে হবে। এতোটুকু বুঝতে হবে যে, ইসরায়েলের মতো খুনি রাষ্ট্রের রক্ত পিপাসা বন্ধের জন্য খামেনির প্রয়োজন আছে। প্রয়োজন আছে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার।

যুক্তরাষ্ট্র এখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, নিরাপত্তা বাহিনী যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, তবে তিনি তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসবেন। এতে করে প্রমাণিত হয়, ইরানকে দুর্বল করতেই ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর এই যৌথ প্রয়াস।

ইরানের প্রধান বিচারপতি বুধবার বিক্ষোভকারীদের সতর্ক করে বলেছেন, ‘ইসলামিক রিপাবলিকের বিরুদ্ধে শত্রুকে যারা সহযোগিতা করবে, তাদের জন্য কোনো শিথিলতা থাকবে না।’ তিনি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করেন, তারা দেশটিকে অস্থিতিশীল করতে ‘হাইব্রিড কৌশল’ অনুসরণ করছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি ‘শত্রুর কাছে নতি স্বীকার করবেন না’।

বর্তমান বিক্ষোভ—গত তিন বছরে সবচেয়ে বড় বিদ্রোহের ঢেউ—শুরু হয় গত মাসে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে, যেখানে দোকানদাররা মুদ্রার ভয়াবহ পতনের প্রতিবাদ করেন। এরপর থেকে গভীরতর অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রেক্ষাপটে অস্থিরতা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে—এর মধ্যে রয়েছে অব্যবস্থাপনা ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাজনিত দ্রুতগতির মুদ্রাস্ফীতি এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ।

ইরানের প্রধান বিচারপতি ও বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেইন মোহসেনি এজেইকে বলেন, ‘ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ঘোষণার পর, যারা দাঙ্গা ও অস্থিরতার জন্য রাস্তায় নামছে, তাদের আর কোনো অজুহাত নেই।’

এজেই বলেন, ‘এখন থেকে ইসলামিক রিপাবলিক এবং জনগণের শান্তির বিরুদ্ধে শত্রুকে যে-ই সহযোগিতা করবে, তার জন্য কোনো শিথিলতা থাকবে না।’

কুর্দি-ইরানি অধিকার সংগঠন হেঙ্গাওয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভ শুরুর প্রথম ১০ দিনে ইরানে কমপক্ষে ২৭ জন নিহত হয়েছে এবং ১৫ শতাধিক মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

মানবাধিকারকর্মীদের নেটওয়ার্ক এইচরানা আরো বেশি হতাহতের কথা জানিয়েছে। কমপক্ষে ৩৬ জন নিহত এবং অন্তত দুই হাজার ৭৬ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে সংগঠনটি।

ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর কোনো সংখ্যা প্রকাশ করেনি, তবে বলেছে নিরাপত্তা বাহিনীর কমপক্ষে দুই সদস্য নিহত হয়েছেন এবং ডজনের বেশি সদস্য আহত হয়েছেন।

আমাদের প্রত্যাশা, ইরানি জনগণ শান্ত থাকবেন। আর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ভোল নিয়ে থাকা চরদের শনাক্ত করবেন। খামেনির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করার অনেক সময় পড়ে রয়েছে। আপাতত নিজেদের ভিত মজবুত রাখুন। পরে দেখা যাবে, খামেনি থাকবেন কি থাকবেন না।

 

উত্তরাধুনিক

Writer, Singer & Environmentalist

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা প্রত্যাখ্যান করলো ইরান

নিজেদের দেশের স্বার্থেই ইরানি জনগণকে শান্ত থাকতে হবে

আপডেট সময়: ০৪:১৩:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬

ছবি সূত্র: reddit.com


উত্তরাধুনিক ডেস্ক: ইরান এমন একটি দেশ, যে দেশ ইসরায়েলকে সমুচিত শিক্ষা দিয়েছে। আর ইরানের সক্ষমতা ও অখণ্ডতা বজায় রাখতে এই মুহূর্তে সবচাইতে জরুরি সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ না করে সরকারের সঙ্গেই থাকা।

কয়েকদিন আগে নেতানিয়হু আস্ফালন ভরে বলেছিলেন ইরান আক্রমণ করবে ইসরায়েল। তারপরেই আগের বার ইরানের হাতে মার খাওয়ার কথা স্মরণ করে তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মাধ্যমে ইরানের প্রতি শান্তির বার্তা পাঠান। তার উদ্দেশ্য যে শান্তি নয়, বরং ইরানকে কূটকৌশলের মাধ্যমে পরাস্ত করা, সেটা এখন পরিস্কার। নানা মেকানিজম প্রয়োগ করে, মোশাদ ও অশুভ মিত্রদের সহায়তায় তিনি খামেনি সরকারের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণকে খেপিয়ে তুলেছেন। উদ্দেশ্য, দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা খামেনি সরকারের উৎখাত। একটা নৈরাজ্য সৃষ্টি করে তিনি ইরানকে করায়ত্ত করার ফাঁদ পেতেছেন। এতে অনেকসময় ফল পাওয়া যায়। যেমনটি আমরা দেখেছি লিবিয়ায় গাদ্দাফির ক্ষেত্রে। জনগণ মনে করে, দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকলে সেই সরকার দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতালোভী হয়ে যায়। এটা তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিলো না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কৌশলে জনগণকে খেপিয়ে গাদ্দাফিকে করুণ পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়।

এই সত্যটি ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের ক্ষেত্রে যতোটা প্রযোজ্য ছিলো, বর্ণিত ওই দুই রাষ্ট্রনায়কের ক্ষেত্রে তেমন নগ্ন সত্য নয়। বরং জুলাই যোদ্ধারা এক্ষেত্রে এক কাঠি সরস। তারা প্রতিবেশী দেশের উস্কানি ও প্রত্যক্ষ মদদের মধ্যেও হাসিনাকে বিতাড়িত করেছেন। মোদ্দা কথা, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য দেশের যেমন নাক গলানো উচিৎ নয়, তেমনি জনগণকেও বুঝতে হবে নিজেদের ভালো কীভাবে হবে। এতোটুকু বুঝতে হবে যে, ইসরায়েলের মতো খুনি রাষ্ট্রের রক্ত পিপাসা বন্ধের জন্য খামেনির প্রয়োজন আছে। প্রয়োজন আছে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার।

যুক্তরাষ্ট্র এখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, নিরাপত্তা বাহিনী যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, তবে তিনি তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসবেন। এতে করে প্রমাণিত হয়, ইরানকে দুর্বল করতেই ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর এই যৌথ প্রয়াস।

ইরানের প্রধান বিচারপতি বুধবার বিক্ষোভকারীদের সতর্ক করে বলেছেন, ‘ইসলামিক রিপাবলিকের বিরুদ্ধে শত্রুকে যারা সহযোগিতা করবে, তাদের জন্য কোনো শিথিলতা থাকবে না।’ তিনি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করেন, তারা দেশটিকে অস্থিতিশীল করতে ‘হাইব্রিড কৌশল’ অনুসরণ করছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি ‘শত্রুর কাছে নতি স্বীকার করবেন না’।

বর্তমান বিক্ষোভ—গত তিন বছরে সবচেয়ে বড় বিদ্রোহের ঢেউ—শুরু হয় গত মাসে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে, যেখানে দোকানদাররা মুদ্রার ভয়াবহ পতনের প্রতিবাদ করেন। এরপর থেকে গভীরতর অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রেক্ষাপটে অস্থিরতা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে—এর মধ্যে রয়েছে অব্যবস্থাপনা ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাজনিত দ্রুতগতির মুদ্রাস্ফীতি এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ।

ইরানের প্রধান বিচারপতি ও বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেইন মোহসেনি এজেইকে বলেন, ‘ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ঘোষণার পর, যারা দাঙ্গা ও অস্থিরতার জন্য রাস্তায় নামছে, তাদের আর কোনো অজুহাত নেই।’

এজেই বলেন, ‘এখন থেকে ইসলামিক রিপাবলিক এবং জনগণের শান্তির বিরুদ্ধে শত্রুকে যে-ই সহযোগিতা করবে, তার জন্য কোনো শিথিলতা থাকবে না।’

কুর্দি-ইরানি অধিকার সংগঠন হেঙ্গাওয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভ শুরুর প্রথম ১০ দিনে ইরানে কমপক্ষে ২৭ জন নিহত হয়েছে এবং ১৫ শতাধিক মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

মানবাধিকারকর্মীদের নেটওয়ার্ক এইচরানা আরো বেশি হতাহতের কথা জানিয়েছে। কমপক্ষে ৩৬ জন নিহত এবং অন্তত দুই হাজার ৭৬ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে সংগঠনটি।

ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর কোনো সংখ্যা প্রকাশ করেনি, তবে বলেছে নিরাপত্তা বাহিনীর কমপক্ষে দুই সদস্য নিহত হয়েছেন এবং ডজনের বেশি সদস্য আহত হয়েছেন।

আমাদের প্রত্যাশা, ইরানি জনগণ শান্ত থাকবেন। আর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ভোল নিয়ে থাকা চরদের শনাক্ত করবেন। খামেনির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করার অনেক সময় পড়ে রয়েছে। আপাতত নিজেদের ভিত মজবুত রাখুন। পরে দেখা যাবে, খামেনি থাকবেন কি থাকবেন না।