০৪:৩৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ নিয়ে ধোঁয়াশা

  • আপডেট সময়: ০২:২৭:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • 2

মূলত বাংলাদেশের কাটারমাস্টার মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইটরাইডার্স থেকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত ভারতের ওপর মহল থেকেই এসেছিল। এটা রাজনৈতিক কারণে, বা আরো মোটা দাগে বললে বলতে হয় এটা অনেকটা ইসলামোফোবিয়া থেকেই উৎসরিত।

বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লবের পর থেকেই ভারতের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। ভারতের প্রশাসন, মিডিয়া ও সোশাল মিডিয়া, ভারতের প্রাক্তন খেলোয়াড় নানাভাবে নিজেদের মত ও উস্কানি দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করেছে।

বাংলাদেশের কাছে যা অপমানকর ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেয়।

নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারত থেকে নিজেদের ম্যাচের ভেন্যু সরিয়ে নেওয়ার আবেদন জানায় বাংলাদেশ। তবে সে আবেদন আইসিসি প্রত্যাখ্যান করায় বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ।

আইপিএল দল কলকাতা নাইট রাইডার্সের স্কোয়াড থেকে বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে ‘নিরাপত্তাজনিত’ কারণে বাদ দেয়া থেকে ঘটনার সূত্রপাত। কলকাতা নাইট রাইডার্স জানিয়েছে, তারা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) নির্দেশেই সিদ্ধান্তটি নিয়েছিল। এরপর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের আরো অবনতি হয়।

এদিকে বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানিয়ে পাকিস্তানও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কটের বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, এবছর ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে পারে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আসন্ন আসর। আসরের পর্দা নামবে ৮ মার্চ। এমন তথ্যই জানিয়েছে ক্রিকেট ভিত্তিক ভারতীয় ওয়েবসাইট ইএসপিএন ক্রিকইনফো। ২০ দলের এই বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করতে যাচ্ছে শ্রীলঙ্কা ও ভারত। ভারতের পাঁচটি ভেন্যু ও শ্রীলঙ্কার অন্তত দুটি ভেন্যুতে খেলা হবে। তবে ফাইনাল কোথায় হবে তা নির্ভর করছে পাকিস্তানের ফলাফলের ওপর।

পাকিস্তান যদি ফাইনালে উঠে তাহলে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচটি হবে কলম্বোতে। কারণ আগামী ৩ বছর ভারতের মাটিতে কোনো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে অংশ নেবে না পাকিস্তান। আর পাকিস্তান যদি আগেই বিদায় নেয় তাহলে ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে আহমেদাবাদে।

বিশ্বকাপে পাকিস্তান ক্রিকেট দল অংশ নেবে কি না, সে বিষয়ে শিগগিরি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) জানিয়েছে, যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তারা প্রস্তুত এবং বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করলে বিকল্প প্ল্যান বি-ও চূড়ান্ত করা হয়েছে।

পাকিস্তানের মিডিয়া সূত্রের খবর, ১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড চেয়ারম্যান মহসিন নাকভির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবার কথা। এই বৈঠকেই মূলত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, পাকিস্তান ক্রিকেট দল বিশ্বকাপে অংশ নেবে কি না।

সূত্রের বরাতে তারা জানিয়েছে, বৈঠকে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত এলে সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তান দলের বিশ্বকাপ জার্সি উন্মোচন করা হবে। তবে বিপরীত সিদ্ধান্ত হলে কার্যকর করা হবে পিসিবির বিকল্প পরিকল্পনা।

প্ল্যান বি অনুযায়ী, পাকিস্তান জাতীয় দল, পাকিস্তান শাহিনস ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে চারটি দল গঠন করা হবে। এরপর লাহোরে চার দলের অংশগ্রহণে একটি প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হবে, যাতে খেলোয়াড়রা ম্যাচ ফিটনেস ও প্রস্তুতি ধরে রাখতে পারেন।

আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত ভারতের ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের প্রচেষ্টায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি)। ক্রীড়াঙ্গনে রাজনীতির হস্তক্ষেপ নিয়ে আইওসির ভেতরে বাড়ছে উদ্বেগ।

যদিও আইসিসি দাবি করছে, ম্যাচসূচি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তটি তারা স্বাধীনভাবেই নিয়েছে, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ভেন্যু পরিবর্তনের অনুমতি না দিতে আইসিসির ওপর বিসিসিআই চাপ প্রয়োগ করেছে। অতীতেও বিসিসিআইয়ের পক্ষে যায় এমন একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইসিসি।

এর মধ্যে ২০২৪ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সম্প্রচার ও আর্থিক কারণ দেখিয়ে ভারতকে গায়ানায় সেমিফাইনালের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল।

আইসিসিতে বিসিসিআইয়ের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। সংস্থাটির বর্তমান চেয়ারম্যান জয় শাহ একসময় বিসিসিআইয়ের সচিব ছিলেন। তার বাবা অমিত শাহ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আইসিসির প্রধান নির্বাহী সঞ্জোগ গুপ্ত এর আগে ভারতের আইসিসি ইভেন্টগুলোর একচেটিয়া সম্প্রচার স্বত্বাধিকারী জিওস্টারের শীর্ষ কর্মকর্তা ছিলেন।

এই কূটনৈতিক সংকট এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ভারত ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের জন্য জোর প্রচারণা চালাচ্ছে। গত মাসেই নয়াদিল্লিতে ২০৩০ কমনওয়েলথ গেমস আয়োজনের দায়িত্ব নিশ্চিত করেছে দেশটি। অলিম্পিক আয়োজনের দৌড়ে ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ধরা হচ্ছে কাতারকে। ভারতের প্রস্তাবিত ভেন্যু আহমেদাবাদ।

এরই মধ্যে পাকিস্তানের বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় আয়োজন করা হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে গত বছর চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে খেলতে ভারত সরকারের অস্বীকৃতি। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সিরিজও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ আছে।

আইওসির ওই সূত্র আরো জানিয়েছে, অলিম্পিক আয়োজনের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হলে ভারতকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে।

২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বিশ্ব ক্রিকেটে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অস্থিরতা। বাংলাদেশের টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়া এবং পাকিস্তানের ভারত ম্যাচ বয়কটের ঘোষণায় চাপে পড়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। এই পরিস্থিতিতে ক্রিকেটে রাজনীতির প্রভাব নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক নাসের হুসেইন।

এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল)। আইপিএলের দল কলকাতা নাইট রাইডার্স ৯ কোটি ২০ লাখ টাকায় বাংলাদেশের পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে দলে নিলেও, পরে বিসিসিআই (ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড) রহস্যজনকভাবে সেই চুক্তি বাতিল করে দেয়। এর প্রতিবাদে এবং খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড জানায়, তারা ভারত সফরে যাবে না। এই সিদ্ধান্তের পর আইসিসি কঠোর অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশকে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেয়।

আইসিসির এই সিদ্ধান্তকে একপাক্ষিক বলে আখ্যা দিয়েছেন নাসের হুসেইন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আইসিসি কি ভারতের ক্ষেত্রেও এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারত? যদি ভারত সরকার টুর্নামেন্টের এক মাস আগে বলত তারা নির্দিষ্ট কোনো দেশে খেলবে না, তখন কি আইসিসি তাদের বাদ দেওয়ার সাহস দেখাত?”

নাসেরের মতে, সবাই শুধু স্বচ্ছতা ও সমতা চায়। তিনি বলেন, “অনেকে বলতে পারে ভারতের টাকা আছে, তাই তারা শক্তিশালী। কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বও আসে। বারবার যদি বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো দেশগুলোকে কোণঠাসা করা হয়, তাহলে তাদের ক্রিকেট দুর্বল হয়ে পড়বে। ভারত-বাংলাদেশ বা ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ একপাক্ষিক হওয়ার এটাও একটা বড় কারণ।”

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অবস্থানের প্রশংসাও করেছেন নাসের হুসেইন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ তাদের খেলোয়াড় মুস্তাফিজের পাশে দাঁড়িয়েছে, এটা আমার ভালো লেগেছে। পাকিস্তান যে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে, সেটাও ইতিবাচক। কাউকে না কাউকে তো বলতে হবে, অনেক হয়েছে, এবার রাজনীতি বাদ দিয়ে ক্রিকেট খেলতে দিন।”

এরই মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল। তবে পাকিস্তান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা ভারতের বিপক্ষে খেলবে না। যদিও বিসিসিআই দাবি করছে, ভারত ম্যাচ খেলতে শ্রীলঙ্কা যেতে প্রস্তুত, কিন্তু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ দেশটির সিদ্ধান্তে অনড় থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এই পরিস্থিতির জন্য বিসিসিআই-এর দাদাগিরিকেই দায়ী করেছেন সাবেক পিসিবি প্রধান নাজাম শেঠি। তার অভিযোগ, ভারত সবসময় অন্য বোর্ডগুলোকে চাপ দিয়ে নিজেদের স্বার্থ আদায় করে নেয়।

সব মিলিয়ে, মাঠের ক্রিকেটের চেয়ে এখন মাঠের বাইরের রাজনীতি ও কূটনীতি বেশি আলোচনায়। ২০ দলের বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই এমন অচলাবস্থা ক্রিকেটের ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত বলে মনে করছেন নাসের হুসেইন।

উত্তরাধুনিক

Writer, Singer & Environmentalist
জনপ্রিয়

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ নিয়ে ধোঁয়াশা

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ নিয়ে ধোঁয়াশা

আপডেট সময়: ০২:২৭:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

মূলত বাংলাদেশের কাটারমাস্টার মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইটরাইডার্স থেকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত ভারতের ওপর মহল থেকেই এসেছিল। এটা রাজনৈতিক কারণে, বা আরো মোটা দাগে বললে বলতে হয় এটা অনেকটা ইসলামোফোবিয়া থেকেই উৎসরিত।

বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লবের পর থেকেই ভারতের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। ভারতের প্রশাসন, মিডিয়া ও সোশাল মিডিয়া, ভারতের প্রাক্তন খেলোয়াড় নানাভাবে নিজেদের মত ও উস্কানি দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করেছে।

বাংলাদেশের কাছে যা অপমানকর ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেয়।

নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারত থেকে নিজেদের ম্যাচের ভেন্যু সরিয়ে নেওয়ার আবেদন জানায় বাংলাদেশ। তবে সে আবেদন আইসিসি প্রত্যাখ্যান করায় বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ।

আইপিএল দল কলকাতা নাইট রাইডার্সের স্কোয়াড থেকে বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে ‘নিরাপত্তাজনিত’ কারণে বাদ দেয়া থেকে ঘটনার সূত্রপাত। কলকাতা নাইট রাইডার্স জানিয়েছে, তারা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) নির্দেশেই সিদ্ধান্তটি নিয়েছিল। এরপর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের আরো অবনতি হয়।

এদিকে বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানিয়ে পাকিস্তানও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কটের বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, এবছর ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে পারে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আসন্ন আসর। আসরের পর্দা নামবে ৮ মার্চ। এমন তথ্যই জানিয়েছে ক্রিকেট ভিত্তিক ভারতীয় ওয়েবসাইট ইএসপিএন ক্রিকইনফো। ২০ দলের এই বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করতে যাচ্ছে শ্রীলঙ্কা ও ভারত। ভারতের পাঁচটি ভেন্যু ও শ্রীলঙ্কার অন্তত দুটি ভেন্যুতে খেলা হবে। তবে ফাইনাল কোথায় হবে তা নির্ভর করছে পাকিস্তানের ফলাফলের ওপর।

পাকিস্তান যদি ফাইনালে উঠে তাহলে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচটি হবে কলম্বোতে। কারণ আগামী ৩ বছর ভারতের মাটিতে কোনো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে অংশ নেবে না পাকিস্তান। আর পাকিস্তান যদি আগেই বিদায় নেয় তাহলে ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে আহমেদাবাদে।

বিশ্বকাপে পাকিস্তান ক্রিকেট দল অংশ নেবে কি না, সে বিষয়ে শিগগিরি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) জানিয়েছে, যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তারা প্রস্তুত এবং বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করলে বিকল্প প্ল্যান বি-ও চূড়ান্ত করা হয়েছে।

পাকিস্তানের মিডিয়া সূত্রের খবর, ১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড চেয়ারম্যান মহসিন নাকভির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবার কথা। এই বৈঠকেই মূলত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, পাকিস্তান ক্রিকেট দল বিশ্বকাপে অংশ নেবে কি না।

সূত্রের বরাতে তারা জানিয়েছে, বৈঠকে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত এলে সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তান দলের বিশ্বকাপ জার্সি উন্মোচন করা হবে। তবে বিপরীত সিদ্ধান্ত হলে কার্যকর করা হবে পিসিবির বিকল্প পরিকল্পনা।

প্ল্যান বি অনুযায়ী, পাকিস্তান জাতীয় দল, পাকিস্তান শাহিনস ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে চারটি দল গঠন করা হবে। এরপর লাহোরে চার দলের অংশগ্রহণে একটি প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হবে, যাতে খেলোয়াড়রা ম্যাচ ফিটনেস ও প্রস্তুতি ধরে রাখতে পারেন।

আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত ভারতের ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের প্রচেষ্টায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি)। ক্রীড়াঙ্গনে রাজনীতির হস্তক্ষেপ নিয়ে আইওসির ভেতরে বাড়ছে উদ্বেগ।

যদিও আইসিসি দাবি করছে, ম্যাচসূচি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তটি তারা স্বাধীনভাবেই নিয়েছে, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ভেন্যু পরিবর্তনের অনুমতি না দিতে আইসিসির ওপর বিসিসিআই চাপ প্রয়োগ করেছে। অতীতেও বিসিসিআইয়ের পক্ষে যায় এমন একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইসিসি।

এর মধ্যে ২০২৪ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সম্প্রচার ও আর্থিক কারণ দেখিয়ে ভারতকে গায়ানায় সেমিফাইনালের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল।

আইসিসিতে বিসিসিআইয়ের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। সংস্থাটির বর্তমান চেয়ারম্যান জয় শাহ একসময় বিসিসিআইয়ের সচিব ছিলেন। তার বাবা অমিত শাহ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আইসিসির প্রধান নির্বাহী সঞ্জোগ গুপ্ত এর আগে ভারতের আইসিসি ইভেন্টগুলোর একচেটিয়া সম্প্রচার স্বত্বাধিকারী জিওস্টারের শীর্ষ কর্মকর্তা ছিলেন।

এই কূটনৈতিক সংকট এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ভারত ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের জন্য জোর প্রচারণা চালাচ্ছে। গত মাসেই নয়াদিল্লিতে ২০৩০ কমনওয়েলথ গেমস আয়োজনের দায়িত্ব নিশ্চিত করেছে দেশটি। অলিম্পিক আয়োজনের দৌড়ে ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ধরা হচ্ছে কাতারকে। ভারতের প্রস্তাবিত ভেন্যু আহমেদাবাদ।

এরই মধ্যে পাকিস্তানের বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় আয়োজন করা হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে গত বছর চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে খেলতে ভারত সরকারের অস্বীকৃতি। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সিরিজও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ আছে।

আইওসির ওই সূত্র আরো জানিয়েছে, অলিম্পিক আয়োজনের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হলে ভারতকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে।

২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বিশ্ব ক্রিকেটে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অস্থিরতা। বাংলাদেশের টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়া এবং পাকিস্তানের ভারত ম্যাচ বয়কটের ঘোষণায় চাপে পড়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। এই পরিস্থিতিতে ক্রিকেটে রাজনীতির প্রভাব নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক নাসের হুসেইন।

এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল)। আইপিএলের দল কলকাতা নাইট রাইডার্স ৯ কোটি ২০ লাখ টাকায় বাংলাদেশের পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে দলে নিলেও, পরে বিসিসিআই (ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড) রহস্যজনকভাবে সেই চুক্তি বাতিল করে দেয়। এর প্রতিবাদে এবং খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড জানায়, তারা ভারত সফরে যাবে না। এই সিদ্ধান্তের পর আইসিসি কঠোর অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশকে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেয়।

আইসিসির এই সিদ্ধান্তকে একপাক্ষিক বলে আখ্যা দিয়েছেন নাসের হুসেইন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আইসিসি কি ভারতের ক্ষেত্রেও এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারত? যদি ভারত সরকার টুর্নামেন্টের এক মাস আগে বলত তারা নির্দিষ্ট কোনো দেশে খেলবে না, তখন কি আইসিসি তাদের বাদ দেওয়ার সাহস দেখাত?”

নাসেরের মতে, সবাই শুধু স্বচ্ছতা ও সমতা চায়। তিনি বলেন, “অনেকে বলতে পারে ভারতের টাকা আছে, তাই তারা শক্তিশালী। কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বও আসে। বারবার যদি বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো দেশগুলোকে কোণঠাসা করা হয়, তাহলে তাদের ক্রিকেট দুর্বল হয়ে পড়বে। ভারত-বাংলাদেশ বা ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ একপাক্ষিক হওয়ার এটাও একটা বড় কারণ।”

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অবস্থানের প্রশংসাও করেছেন নাসের হুসেইন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ তাদের খেলোয়াড় মুস্তাফিজের পাশে দাঁড়িয়েছে, এটা আমার ভালো লেগেছে। পাকিস্তান যে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে, সেটাও ইতিবাচক। কাউকে না কাউকে তো বলতে হবে, অনেক হয়েছে, এবার রাজনীতি বাদ দিয়ে ক্রিকেট খেলতে দিন।”

এরই মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল। তবে পাকিস্তান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা ভারতের বিপক্ষে খেলবে না। যদিও বিসিসিআই দাবি করছে, ভারত ম্যাচ খেলতে শ্রীলঙ্কা যেতে প্রস্তুত, কিন্তু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ দেশটির সিদ্ধান্তে অনড় থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এই পরিস্থিতির জন্য বিসিসিআই-এর দাদাগিরিকেই দায়ী করেছেন সাবেক পিসিবি প্রধান নাজাম শেঠি। তার অভিযোগ, ভারত সবসময় অন্য বোর্ডগুলোকে চাপ দিয়ে নিজেদের স্বার্থ আদায় করে নেয়।

সব মিলিয়ে, মাঠের ক্রিকেটের চেয়ে এখন মাঠের বাইরের রাজনীতি ও কূটনীতি বেশি আলোচনায়। ২০ দলের বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই এমন অচলাবস্থা ক্রিকেটের ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত বলে মনে করছেন নাসের হুসেইন।