
বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোটসহ ১৬টি প্ল্যাটফর্মের যৌথ মানববন্ধন কর্মসূচি। ছবি: আয়োজকদের সৌজন্যে
ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচসহ উদীয়মান তামাকজাত পণ্য কিশোর-তরুণদের জন্য গুরুতর হুমকি এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় বাধা বলে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এসব নেশাজাত পণ্য নিষিদ্ধের বিধান বহাল রেখেই মহান জাতীয় সংসদে তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ২০২৫-কে আইনে রূপান্তরের দাবি জানানো হয়েছে।
বুধবার (১ এপ্রিল) রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় জাতীয় জাদুঘরের পাশে বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোটসহ ১৬টি প্ল্যাটফর্মের যৌথ উদ্যোগে ‘ক্ষতিকর ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচ নিষিদ্ধসহ তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ দ্রুত আইনে পরিণত করা হোক’ শীর্ষক অবস্থান কর্মসূচিতে অর্ধশতাধিক জনস্বাস্থ্য উন্নয়নকর্মী এ দাবি জানান। একইসঙ্গে ই-সিগারেট নিষিদ্ধের ধারা বাতিলের যে অপতৎপরতা চলছে, তার তীব্র প্রতিবাদ করেন বক্তারা।
বক্তারা বলেন, কিছু অসাধু ব্যক্তি ও তামাক কোম্পানির প্রভাবেই ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) সংশোধনী অধ্যাদেশ ২০২৫-এ অন্তর্ভুক্ত ইমার্জিং তামাক পণ্য নিষিদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ধারা বাতিলের চেষ্টা চলছে। এটি সরকারের সুষম উন্নয়ন নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা অভিযোগ করেন, একটি দুষ্টচক্র সরকারের ভেতরে থেকেই এ ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সক্রিয় রয়েছে, যা দেশের তরুণ প্রজন্ম, জনস্বাস্থ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে।
বক্তারা বলেন, দেশে বর্তমানে ই-সিগারেট ব্যবহারের হার ০.০২ শতাংশেরও কম এবং নিকোটিন পাউচের ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। এই অবস্থায় এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে তা দ্রুত তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ‘কম ক্ষতিকর’ বলে বিভ্রান্তিকর প্রচারণার মাধ্যমে তামাক কোম্পানিগুলো কিশোর-তরুণদের লক্ষ্যবস্তু করছে বলেও তারা অভিযোগ করেন।
তাদের মতে, ই-সিগারেট আসক্তি তৈরি করে এবং ফুসফুস, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়, যা বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত। নিকোটিন পাউচেও কখনো কখনো প্রচলিত সিগারেটের তুলনায় বেশি নিকোটিন থাকতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এসব পণ্যকে ধূমপান ছাড়ার কার্যকর উপায় হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তাই এখনই এগুলো নিষিদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে বলে তারা মনে করেন।
বক্তারা জানান, বিভিন্ন ফ্লেভার, আধুনিক নকশা, সহজ ব্যবহারযোগ্যতা এবং আকর্ষণীয় প্রচারণার কারণে ই-সিগারেট তরুণদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এতে কিশোরদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নিকোটিন আসক্তির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এমনকি ই-সিগারেট ডিভাইস ব্যবহার করে মাদক গ্রহণের ঘটনাও বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিশ্বের ১৩২টি দেশে ই-সিগারেট নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্তত ৪১টি দেশে এটি পুরোপুরি নিষিদ্ধ। ভারত, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ১১টি দেশে নিকোটিন পাউচ নিষিদ্ধ এবং ৩৪টি দেশে নিয়ন্ত্রিত। বক্তারা বলেন, যখন অন্যান্য দেশ এসব পণ্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর হচ্ছে, তখন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশকে লক্ষ্যবস্তু করছে। এ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে শক্তিশালী আইনগত কাঠামো বজায় রাখা জরুরি।
তারা বলেন, জনবান্ধব সরকারের কাছে জনস্বার্থই সর্বাগ্রে গুরুত্ব পাওয়ার কথা। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধের ধারা বহাল রেখে দ্রুত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন পাস করা প্রয়োজন।
কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ হেলাল আহমেদ, নীতি বিশ্লেষক আমিনুল ইসলাম বকুল, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ একেএম মাকসুদ, অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম, রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবু নাসের অনীক, তামাক বিরোধী নারী জোটের সমন্বয়ক সীমা দাস সীমু, সংস্কৃতিকর্মী ও শিল্পী হামিদুল ইসলাম হিল্লোল, গবেষক ফারহানা জামান লিজা, সামিউল হাসান সজীব, ইব্রাহীম খলিল ও মিঠুন বৈদ্য। এছাড়া ইয়ুথ অ্যাডভোকেট শনন, তাসফিয়া নওরীন, হাসিবুর রহমান জয়, তাসনীম হাসান আবীর এবং ছাত্র প্রতিনিধি হাফিজুর রহমান বক্তব্য রাখেন। কর্মসূচি সঞ্চালনা করেন জনস্বাস্থ্য উন্নয়নকর্মী মো. আবু রায়হান।


















