০১:৪৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র: কয়েক যুগের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তলানীতে

  • আপডেট সময়: ০৩:৪১:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
  • 2

 

হাসান জাহিদ


যুক্তরাষ্ট্র একে একে অনেক দেশের সাথে বৈরিতা গড়ে তুলছে। ২০২৫ সালে ঘোষণা দিয়েছিলেন কানাডা দখল করবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তখন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ভদ্রভাবে কিন্তু পরোক্ষ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন ‘কানাডা বিক্রির জন্য নয়।’

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান কয়েক যুগ ধরে। যে সম্পর্ককে বেশ খোলামেলা বলা যায়।

বাণিজ্যিক লেনদেন, নানা চুক্তি ও সমঝোতা শুধু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নয়, দুই দেশের জনগণের মধ্যেও মসৃণ ও সুন্দর বুঝাপড়া চলছিল। কানাডার ড্রাইভিং লাইসেন্স যুক্তরাষ্ট্রেও বৈধ। দুই দেশের নাগরিকদের জন্য কোনো ভিসা লাগে না। সড়ক পথে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল, কিংবা টরোন্টো থেকে নিউইয়র্ক বাস চলাচল রয়েছে। অনেকে নিজেরাই ড্রাইভ করে যান। তাছাড়া বিমান চলাচল তো আছেই। কানাডাতে অনেক অ্যামেরিকান আসে পড়াশোনা করতে বা চাকরি করতে। তেমনি ভাবে কানাডা থেকেও অনেকেই চাকরি করতে যান যুক্তরাষ্ট্রে। এসব ঘটে অনেকটাই স্বাদ বদলাতে বা প্রফিট বাড়াতে।

দুই দেশই জি ৭ গ্রুপের সদস্য। গত চার বছরে, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা অংশীদারিত্বকে পুনরুজ্জীবিত ও সম্প্রসারণের চেষ্টা করেছেন। অন্যান্য সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলির মধ্যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার সরকার NORAD (North American Aerospace Defense Command ) আধুনিকীকরণ, সীমান্ত পারাপারের আইন প্রয়োগ শক্তিশালী করা এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ও কম-কার্বন প্রযুক্তি স্থাপন ত্বরান্বিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবুও, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার সরকার কিছু নীতিগত বিষয় নিয়ে মতভেদ অব্যাহত রেখেছে, যেমন ডিজিটাল সেবার কর ও নিয়ন্ত্রণ এবং  আন্তঃসীমান্ত তেল ও গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে মতবিরোধ।

কিন্তু সম্পর্ক ভাঙতে শুরু করেছে। আসলে ভেঙে গেছে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ ও কানাডা দখলের হুমকির পর থেকেই। তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর ভয়াবহ হামলাকে কানাডা সমর্থন করে না। কানাডা তীব্র ভাষায় ইরানে আক্রমণের নিন্দা জানিয়েছে।

এটা ঠিক যে, দুই দেশের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যবসা বাণিজ্যে দুই দেশই লাভবান হচ্ছিল। মার্ক কার্নি বলেছেন, এখন কানাডা তার নিজস্ব সম্পদ ও প্রযুক্তি দিয়ে নিজস্ব চাহিদা মেটাবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার সম্পর্ক এক অনিশ্চয়তার যুগে প্রবেশ করেছে। ২০১৭ থেকে জানুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত কানাডার প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের বিষোদগার পারস্পরিক সম্পর্কের দীর্ঘদিনের স্তম্ভগুলিকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, যার মধ্যে ন্যাটো এবং উত্তর আমেরিকায় মুক্ত বাণিজ্যের প্রতি সাধারণ প্রতিশ্রুতিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এটি, পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, সেই বছরগুলোতে মার্কিন-কানাডীয় সম্পর্ককে উত্তেজনাপূর্ণ করেছে। ট্রাম্পের ২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় এবং পরে করা বিবৃতিগুলি, যার মধ্যে কানাডা থেকে আমদানি করা পণ্যে শুল্ক চাপানোর প্রস্তাব ইঙ্গিত দেয় যে দুটি দেশ পারস্পরিক সম্পর্কের আরেকটি বৈরি সময়ে প্রবেশ করতে পারে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

 

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার পুরোনো সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি।

তিনি বলেছেন, দুই দেশের অর্থনীতির গভীর সংযোগ এবং কঠোর নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্কের অবসান ঘটেছে।

সম্প্রতি অটোয়ায় মন্ত্রিসভার এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কার্নি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া শুল্কের মুখে কানাডীয়দের অবশ্যই ‘অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।’

ওয়াশিংটনের পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় কানাডাও পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে যা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ‘সর্বোচ্চ প্রভাব’ ফেলবে বলেও কার্নি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, বলেছে বিবিসি।

ট্রাম্প জানান, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছেন। বলেছেন, “এটা স্থায়ী।”

লিবারেল পার্টির নেতা কার্নি বলেন, ১৯৬৫ সালে স্বাক্ষরিত কানাডা-মার্কিন অটোমোটিভ প্রোডাক্ট এগ্রিমেন্ট তার জীবনে দেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি।

“এই শুল্ক আরোপের মাধ্যমে সেই চুক্তিও শেষ হয়ে গেল,” বলেছেন কার্নি।

সরকার ও ব্যবসায়িক সম্প্রদায় একসঙ্গে কাজ করলে কানাডার গাড়ি শিল্প ট্রাম্পের এই শুল্কের মুখেও টিকে থাকবে বলে আশা তার।

তিনি বলেন, কানাডাকে এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে, যা তারা নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে কানাডার বাণিজ্য সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবতেও হবে।

কানাডীয়রা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারবে কিনা তা-ই এখন দেখার বিষয়, বলেছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে কানাডার সব ধরনের পণ্যে দেওয়া ২৫ শতাংশ শুল্ক আংশিকভাবে কার্যকর করেছে। অ্যালুমিনিয়াম ও ইস্পাত আমদানিতেও একই হারে শুল্ক বসিয়েছে তারা। প্রত্যুত্তরে কানাডা এখন পর্যন্ত ৬ হাজার কোটি কানাডীয় ডলার (প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলার) মূল্যের পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে।

ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি আমদানিতে নতুন যে শুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছেন, তা ২ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো গাড়ি আমদানি করবে তাদেরকে পরদিন থেকে অতিরিক্ত চার্জও দিতে হবে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক কার্যকর হবে মে মাস বা তার পর থেকে।

শুধু তাই নয়,  ট্রাম্বের শুল্কের বদলা হিসেবে মিত্র দেশগুলো একসঙ্গে কোনো পদক্ষেপ নিলে তার পরিণতির ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সতর্ক করে তিনি বলেছেন, “যদি তারা একসঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তাহলে তাদের ওপর আরও বড় পরিসরে শুল্ক আরোপ করা হবে।”

বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক

কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য উভয় অর্থনীতির একটি মূল স্তম্ভ, যার বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের মূল্য ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তবে, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক কানাডীয় স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, গাড়ি, সফটউড (কাঠ) এবং অন্যান্য পণ্যের ওপর আরোপিত  চলমান শুল্ক অর্থনৈতিক সম্পর্ককে চাপের মধ্যে ফেলেছে। এই শুল্কগুলি CUSMA (Canada-United States-Mexico Agreement) পুনঃআলোচনার প্রেক্ষাপটে সমাধান করা হচ্ছে, যেখানে কানাডীয় বাণিজ্যমন্ত্রী ডোমিনিক লেব্ল্যাঙ্ক যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গে সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা কানাডীয় কর্মকর্তাদের দ্বারা “গঠনমূলক ও গুরুত্বপূর্ণ” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০২৪ সালে অফিসে ফেরার পর থেকে রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। ট্রাম্পের বক্তৃতা, যার মধ্যে কানাডাকে “৫১তম রাজ্য”করার প্রস্তাব এবং নতুন শুল্কের পুনরাবৃত্তি হুমকির উল্লেখ রয়েছে, তা অটোয়ায় অনিশ্চয়তা এবং প্রতিরক্ষামূলক মনোভাব সৃষ্টি করেছে। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ এবং পশ্চিম গোলার্ধে ট্রাম্পের বিস্তৃত উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলি কানাডার বৈদেশিক নীতিকে আরও জটিল করেছে, যা কানাডাকে একটি অপ্রত্যাশিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিচালনার সাথে সঙ্গতি রাখার সময় নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব অনুসন্ধান করতে বাধ্য করেছে।

কৌশলগত অর্থনৈতিক প্রভাব

বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে মার্কিন রাজনীতির অস্থিতিশীলতা এবং বাণিজ্যের অনিশ্চয়তার কারণে কানাডা উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ইউরেশিয়া গ্রুপ উল্লেখ করছে যে, কানাডাকে সমসাময়িকভাবে তার অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে হবে এবং অস্থিতিশীল বৈশ্বিক পরিবেশে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কের বৈচিত্র্যতা অনুসরণ করতে হবে। কানাডীয় প্রতিষ্ঠানগুলি এমন একটি চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে পরিচালিত হচ্ছে যেখানে মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরতা ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে, যার ফলে অন্যান্য দেশের সাথে বাণিজ্য সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা বাড়ানো হচ্ছে।

দৃষ্টিভঙ্গি

CUSMA এর অধীনে আলোচনা শুল্ক হ্রাস এবং বাণিজ্য স্থিতিশীল করার একটি সম্ভাব্য পথ উন্মুক্ত করেছিল। ২০২৬ সালে কানাডা-মার্কিন সম্পর্ক সামগ্রিকভাবে অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রভৃতি খাদের কিনারায় এসে ঠেকেছে। অন্যদিকে কানাডার কৌশল, ট্রাম্প সৃষ্ট ঝুঁকি কমানো এবং অন্যান্য বৈশ্বিক অংশীদারের সাথে সম্পর্ক শক্তিশালী করার দিকে কেন্দ্রীভূত, যাতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা বজায় রাখা যায়।

প্রধানমন্ত্রী কার্নি কানাডীয়দের উদ্দেশ্যে ভাষণে ঘোষণা করলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এখন শুধুই ‘দুর্বলতা।’

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র মিত্রের চেয়ে অর্থনৈতিক শত্রুর মতো আচরণ করার কারণে, প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন যে কানাডার প্রাক্তন শক্তি, যা আমেরিকার সঙ্গে আমাদের বন্ধনের ওপর তৈরি, তা এখন “দুর্বল” হয়ে গেছে যা সংশোধন করতে হবে।

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি পূর্ব-রেকর্ডকৃত ভাষণে কার্নি বলেন তার উদ্দেশ্য হলো কানাডার জন্য তার পরিকল্পনা নিয়ে “সরাসরি এবং নিয়মিত” কথা বলা।

একটি সূত্র অনুযায়ী এই বার্তার মূল বিষয় ছিল যে, এই ক্রান্তিলগ্নে তিনি এমন একটি স্থান চেয়েছিলেন যেখানে তিনি কানাডীয়দের সঙ্গে সরাসরি এবং দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলতে পারবেন। তিনি বলেন, বিশ্ব বেশি “ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিভক্ত হয়ে গেছে”, এবং কানাডাকে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে এবং জাতীয় কৌশলে একটি পরিবর্তন আসতে হবে।

‘যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তার পদ্ধতি মৌলিকভাবে পরিবর্তন করেছে, এবং শুল্ক বাড়িয়েছে যা শেষবার দেখা গিয়েছিল গ্রেট ডিপ্রেশনের সময়ে,’ অটোয়ার একটি বাড়িতে প্রায় ১০ মিনিটব্যাপী ভাষণে কার্নি বলেন, ‘আমাদের কিছু অতীত শক্তি, যা আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে ছিল, তা এখন আমাদের দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে; এমন এক দুর্বলতা যা আমাদের সংশোধন করতে হবে।’

তিনি বলেন, অটোমোবাইল, লোহার এবং কাঠের শিল্পের কর্মীরা ‘হুমকির মধ্যে’ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের কারণে, এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ টানছে ‘একটি অনিশ্চয়তার আবরণ যা আমাদের সকলের ওপর ঝুলে আছে।’

“আমেরিকা পরিবর্তিত হয়েছে এবং আমাদের প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে,” কার্নি বলেছিলেন, তার লিবারেল পার্টি সরকারের রেকর্ড এবং অর্জনগুলি তুলে ধরার আগে, এবং ২০২৫ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি ঘোষণা করা “কানাডা স্ট্রং”পরিকল্পনাটি উল্লেখ করেছিলেন; একটি পরিকল্পনা যা জাতিকে ট্রাম্প-প্রুফ করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল।

নতুন বাস্তবতা

বিরোধী কনজারভেটিভদের নাম না উল্লেখ করেও, কার্নি মনে হয় তাদেকে ইঙ্গিত করছিলেন যখন তিনি বললেন যে ‘কেউ কেউ বলে যে একটি বিস্তৃত পরিকল্পনার প্রয়োজন নেই’–-অর্থাৎ কানাডীয়দের শুধু ‘ধৈর্য ধরতে’ হবে এই আশায় যে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আবার ‘পুরোনো ভালো দিনগুলোর’ মতো হয়ে যাবে।

তিনি উল্লেখ করেছেন যে কোমলমতি ক্যানেডীয় তরুণ-তরুণীর এমন কোনো ভালো দিন দেখেনি–তাদের পুরো জীবনই বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, আর্থিক সংকট এবং COVID-19 এর ধাক্কা ও সংকটের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে।

তিনি স্বীকার করেছেন যে, তার পরিকল্পনাগুলো যা নতুন বাণিজ্য এবংএনার্জি করিডোর নির্মাণ, পরিচ্ছন্ন এনার্জির ক্ষমতা দ্বিগুণ করা এবং ‘১৩টির মধ্যে একটি কানাডীয় অর্থনীতি’ তৈরির অন্তর্ভুক্ত, তা সাহসী। ‘কিন্তু সংকটের সময়, ভাগ্য সাহসীদেরকে সহায়তা করে’,  তিনি বলেছেন।

প্রধানমন্ত্রী মেজর-জেনারেল স্যার আইজ্যাক ব্রক-এর একটি ছোটো মূর্তি দেখান, যিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা এবং ১৮১২ সালের যুদ্ধে তার ভূমিকার জন্য ‘আপার কানাডার নায়ক’ হিসেবে পরিচিত। তিনি বলেছিলেন, এই মূর্তি, যা কমেডিয়ান মাইক মায়ার্সের উপহার, তাকে মনে করিয়ে দেয় ‘যখন আমরা কানাডীয় হিসেবে ঐক্যবদ্ধ থাকি, তখন আমরা যে কোনো কিছুর মোকাবিলা করতে পারি।’

অতীতের বহু যুদ্ধে কানাডীয়রা বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে জয় লাভ করে। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পর আমেরিকা আপার কানাডা আক্রমণ করে। বলাই বাহুল্য, আমেরিকানরা পিছু হটেছিল। যেমন ইরান এখন সাহসের সাথে আমেরিকাকে মনস্তাত্তিক ও সামরিক–দুই ভাবেই চাপে রেখেছে। খুব দূর অতীতের কথা নয়, মাত্র একদশক আগেও আমেরিকা ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ দুই দেশকেই নিজেদের দেশের মতো ভাবত। সাম্প্রতিক অতীতে কয়েকবারই কানাডীয় ডলারের মান মার্কিন ডলারকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে সামরিক শক্তি বাড়িয়ে চলছিল, কানাডা সেখানে, মেইনস্ট্রিম, ফার্স্ট ন্যাশনস, আদিবাসী, মন্ট্রিয়েলের ফরাসী মেজরিটি ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ইমিগ্র্যান্টসদের নিয়ে একটি বহুসংস্কৃতির মোজেইক তৈরি করেছে।

একই সীমান্ত ভাগাভাগি করছে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র। একই ভাষায় কথা বলছে দুই দেশ। সেখানে কানাডা দখলের হুমকি দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। একটি পরাশক্তিধর উন্নত জাতিকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করছেন না দেশটির প্রেসিডেন্ট।

সহায়ক নিউজ সাইট: www.cbc.ca, CP24, NPR

উত্তরাধুনিক

Writer, Singer & Environmentalist

কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র: কয়েক যুগের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তলানীতে

আপডেট সময়: ০৩:৪১:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬

 

হাসান জাহিদ


যুক্তরাষ্ট্র একে একে অনেক দেশের সাথে বৈরিতা গড়ে তুলছে। ২০২৫ সালে ঘোষণা দিয়েছিলেন কানাডা দখল করবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তখন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ভদ্রভাবে কিন্তু পরোক্ষ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন ‘কানাডা বিক্রির জন্য নয়।’

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান কয়েক যুগ ধরে। যে সম্পর্ককে বেশ খোলামেলা বলা যায়।

বাণিজ্যিক লেনদেন, নানা চুক্তি ও সমঝোতা শুধু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নয়, দুই দেশের জনগণের মধ্যেও মসৃণ ও সুন্দর বুঝাপড়া চলছিল। কানাডার ড্রাইভিং লাইসেন্স যুক্তরাষ্ট্রেও বৈধ। দুই দেশের নাগরিকদের জন্য কোনো ভিসা লাগে না। সড়ক পথে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল, কিংবা টরোন্টো থেকে নিউইয়র্ক বাস চলাচল রয়েছে। অনেকে নিজেরাই ড্রাইভ করে যান। তাছাড়া বিমান চলাচল তো আছেই। কানাডাতে অনেক অ্যামেরিকান আসে পড়াশোনা করতে বা চাকরি করতে। তেমনি ভাবে কানাডা থেকেও অনেকেই চাকরি করতে যান যুক্তরাষ্ট্রে। এসব ঘটে অনেকটাই স্বাদ বদলাতে বা প্রফিট বাড়াতে।

দুই দেশই জি ৭ গ্রুপের সদস্য। গত চার বছরে, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা অংশীদারিত্বকে পুনরুজ্জীবিত ও সম্প্রসারণের চেষ্টা করেছেন। অন্যান্য সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলির মধ্যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার সরকার NORAD (North American Aerospace Defense Command ) আধুনিকীকরণ, সীমান্ত পারাপারের আইন প্রয়োগ শক্তিশালী করা এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ও কম-কার্বন প্রযুক্তি স্থাপন ত্বরান্বিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবুও, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার সরকার কিছু নীতিগত বিষয় নিয়ে মতভেদ অব্যাহত রেখেছে, যেমন ডিজিটাল সেবার কর ও নিয়ন্ত্রণ এবং  আন্তঃসীমান্ত তেল ও গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে মতবিরোধ।

কিন্তু সম্পর্ক ভাঙতে শুরু করেছে। আসলে ভেঙে গেছে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ ও কানাডা দখলের হুমকির পর থেকেই। তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর ভয়াবহ হামলাকে কানাডা সমর্থন করে না। কানাডা তীব্র ভাষায় ইরানে আক্রমণের নিন্দা জানিয়েছে।

এটা ঠিক যে, দুই দেশের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যবসা বাণিজ্যে দুই দেশই লাভবান হচ্ছিল। মার্ক কার্নি বলেছেন, এখন কানাডা তার নিজস্ব সম্পদ ও প্রযুক্তি দিয়ে নিজস্ব চাহিদা মেটাবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার সম্পর্ক এক অনিশ্চয়তার যুগে প্রবেশ করেছে। ২০১৭ থেকে জানুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত কানাডার প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের বিষোদগার পারস্পরিক সম্পর্কের দীর্ঘদিনের স্তম্ভগুলিকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, যার মধ্যে ন্যাটো এবং উত্তর আমেরিকায় মুক্ত বাণিজ্যের প্রতি সাধারণ প্রতিশ্রুতিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এটি, পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, সেই বছরগুলোতে মার্কিন-কানাডীয় সম্পর্ককে উত্তেজনাপূর্ণ করেছে। ট্রাম্পের ২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় এবং পরে করা বিবৃতিগুলি, যার মধ্যে কানাডা থেকে আমদানি করা পণ্যে শুল্ক চাপানোর প্রস্তাব ইঙ্গিত দেয় যে দুটি দেশ পারস্পরিক সম্পর্কের আরেকটি বৈরি সময়ে প্রবেশ করতে পারে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

 

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার পুরোনো সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি।

তিনি বলেছেন, দুই দেশের অর্থনীতির গভীর সংযোগ এবং কঠোর নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্কের অবসান ঘটেছে।

সম্প্রতি অটোয়ায় মন্ত্রিসভার এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কার্নি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া শুল্কের মুখে কানাডীয়দের অবশ্যই ‘অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।’

ওয়াশিংটনের পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় কানাডাও পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে যা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ‘সর্বোচ্চ প্রভাব’ ফেলবে বলেও কার্নি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, বলেছে বিবিসি।

ট্রাম্প জানান, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছেন। বলেছেন, “এটা স্থায়ী।”

লিবারেল পার্টির নেতা কার্নি বলেন, ১৯৬৫ সালে স্বাক্ষরিত কানাডা-মার্কিন অটোমোটিভ প্রোডাক্ট এগ্রিমেন্ট তার জীবনে দেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি।

“এই শুল্ক আরোপের মাধ্যমে সেই চুক্তিও শেষ হয়ে গেল,” বলেছেন কার্নি।

সরকার ও ব্যবসায়িক সম্প্রদায় একসঙ্গে কাজ করলে কানাডার গাড়ি শিল্প ট্রাম্পের এই শুল্কের মুখেও টিকে থাকবে বলে আশা তার।

তিনি বলেন, কানাডাকে এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে, যা তারা নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে কানাডার বাণিজ্য সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবতেও হবে।

কানাডীয়রা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারবে কিনা তা-ই এখন দেখার বিষয়, বলেছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে কানাডার সব ধরনের পণ্যে দেওয়া ২৫ শতাংশ শুল্ক আংশিকভাবে কার্যকর করেছে। অ্যালুমিনিয়াম ও ইস্পাত আমদানিতেও একই হারে শুল্ক বসিয়েছে তারা। প্রত্যুত্তরে কানাডা এখন পর্যন্ত ৬ হাজার কোটি কানাডীয় ডলার (প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলার) মূল্যের পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে।

ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি আমদানিতে নতুন যে শুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছেন, তা ২ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো গাড়ি আমদানি করবে তাদেরকে পরদিন থেকে অতিরিক্ত চার্জও দিতে হবে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক কার্যকর হবে মে মাস বা তার পর থেকে।

শুধু তাই নয়,  ট্রাম্বের শুল্কের বদলা হিসেবে মিত্র দেশগুলো একসঙ্গে কোনো পদক্ষেপ নিলে তার পরিণতির ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সতর্ক করে তিনি বলেছেন, “যদি তারা একসঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তাহলে তাদের ওপর আরও বড় পরিসরে শুল্ক আরোপ করা হবে।”

বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক

কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য উভয় অর্থনীতির একটি মূল স্তম্ভ, যার বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের মূল্য ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তবে, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক কানাডীয় স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, গাড়ি, সফটউড (কাঠ) এবং অন্যান্য পণ্যের ওপর আরোপিত  চলমান শুল্ক অর্থনৈতিক সম্পর্ককে চাপের মধ্যে ফেলেছে। এই শুল্কগুলি CUSMA (Canada-United States-Mexico Agreement) পুনঃআলোচনার প্রেক্ষাপটে সমাধান করা হচ্ছে, যেখানে কানাডীয় বাণিজ্যমন্ত্রী ডোমিনিক লেব্ল্যাঙ্ক যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গে সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা কানাডীয় কর্মকর্তাদের দ্বারা “গঠনমূলক ও গুরুত্বপূর্ণ” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০২৪ সালে অফিসে ফেরার পর থেকে রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। ট্রাম্পের বক্তৃতা, যার মধ্যে কানাডাকে “৫১তম রাজ্য”করার প্রস্তাব এবং নতুন শুল্কের পুনরাবৃত্তি হুমকির উল্লেখ রয়েছে, তা অটোয়ায় অনিশ্চয়তা এবং প্রতিরক্ষামূলক মনোভাব সৃষ্টি করেছে। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ এবং পশ্চিম গোলার্ধে ট্রাম্পের বিস্তৃত উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলি কানাডার বৈদেশিক নীতিকে আরও জটিল করেছে, যা কানাডাকে একটি অপ্রত্যাশিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিচালনার সাথে সঙ্গতি রাখার সময় নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব অনুসন্ধান করতে বাধ্য করেছে।

কৌশলগত অর্থনৈতিক প্রভাব

বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে মার্কিন রাজনীতির অস্থিতিশীলতা এবং বাণিজ্যের অনিশ্চয়তার কারণে কানাডা উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ইউরেশিয়া গ্রুপ উল্লেখ করছে যে, কানাডাকে সমসাময়িকভাবে তার অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে হবে এবং অস্থিতিশীল বৈশ্বিক পরিবেশে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কের বৈচিত্র্যতা অনুসরণ করতে হবে। কানাডীয় প্রতিষ্ঠানগুলি এমন একটি চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে পরিচালিত হচ্ছে যেখানে মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরতা ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে, যার ফলে অন্যান্য দেশের সাথে বাণিজ্য সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা বাড়ানো হচ্ছে।

দৃষ্টিভঙ্গি

CUSMA এর অধীনে আলোচনা শুল্ক হ্রাস এবং বাণিজ্য স্থিতিশীল করার একটি সম্ভাব্য পথ উন্মুক্ত করেছিল। ২০২৬ সালে কানাডা-মার্কিন সম্পর্ক সামগ্রিকভাবে অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রভৃতি খাদের কিনারায় এসে ঠেকেছে। অন্যদিকে কানাডার কৌশল, ট্রাম্প সৃষ্ট ঝুঁকি কমানো এবং অন্যান্য বৈশ্বিক অংশীদারের সাথে সম্পর্ক শক্তিশালী করার দিকে কেন্দ্রীভূত, যাতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা বজায় রাখা যায়।

প্রধানমন্ত্রী কার্নি কানাডীয়দের উদ্দেশ্যে ভাষণে ঘোষণা করলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এখন শুধুই ‘দুর্বলতা।’

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র মিত্রের চেয়ে অর্থনৈতিক শত্রুর মতো আচরণ করার কারণে, প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন যে কানাডার প্রাক্তন শক্তি, যা আমেরিকার সঙ্গে আমাদের বন্ধনের ওপর তৈরি, তা এখন “দুর্বল” হয়ে গেছে যা সংশোধন করতে হবে।

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি পূর্ব-রেকর্ডকৃত ভাষণে কার্নি বলেন তার উদ্দেশ্য হলো কানাডার জন্য তার পরিকল্পনা নিয়ে “সরাসরি এবং নিয়মিত” কথা বলা।

একটি সূত্র অনুযায়ী এই বার্তার মূল বিষয় ছিল যে, এই ক্রান্তিলগ্নে তিনি এমন একটি স্থান চেয়েছিলেন যেখানে তিনি কানাডীয়দের সঙ্গে সরাসরি এবং দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলতে পারবেন। তিনি বলেন, বিশ্ব বেশি “ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিভক্ত হয়ে গেছে”, এবং কানাডাকে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে এবং জাতীয় কৌশলে একটি পরিবর্তন আসতে হবে।

‘যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তার পদ্ধতি মৌলিকভাবে পরিবর্তন করেছে, এবং শুল্ক বাড়িয়েছে যা শেষবার দেখা গিয়েছিল গ্রেট ডিপ্রেশনের সময়ে,’ অটোয়ার একটি বাড়িতে প্রায় ১০ মিনিটব্যাপী ভাষণে কার্নি বলেন, ‘আমাদের কিছু অতীত শক্তি, যা আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে ছিল, তা এখন আমাদের দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে; এমন এক দুর্বলতা যা আমাদের সংশোধন করতে হবে।’

তিনি বলেন, অটোমোবাইল, লোহার এবং কাঠের শিল্পের কর্মীরা ‘হুমকির মধ্যে’ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের কারণে, এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ টানছে ‘একটি অনিশ্চয়তার আবরণ যা আমাদের সকলের ওপর ঝুলে আছে।’

“আমেরিকা পরিবর্তিত হয়েছে এবং আমাদের প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে,” কার্নি বলেছিলেন, তার লিবারেল পার্টি সরকারের রেকর্ড এবং অর্জনগুলি তুলে ধরার আগে, এবং ২০২৫ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি ঘোষণা করা “কানাডা স্ট্রং”পরিকল্পনাটি উল্লেখ করেছিলেন; একটি পরিকল্পনা যা জাতিকে ট্রাম্প-প্রুফ করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল।

নতুন বাস্তবতা

বিরোধী কনজারভেটিভদের নাম না উল্লেখ করেও, কার্নি মনে হয় তাদেকে ইঙ্গিত করছিলেন যখন তিনি বললেন যে ‘কেউ কেউ বলে যে একটি বিস্তৃত পরিকল্পনার প্রয়োজন নেই’–-অর্থাৎ কানাডীয়দের শুধু ‘ধৈর্য ধরতে’ হবে এই আশায় যে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আবার ‘পুরোনো ভালো দিনগুলোর’ মতো হয়ে যাবে।

তিনি উল্লেখ করেছেন যে কোমলমতি ক্যানেডীয় তরুণ-তরুণীর এমন কোনো ভালো দিন দেখেনি–তাদের পুরো জীবনই বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, আর্থিক সংকট এবং COVID-19 এর ধাক্কা ও সংকটের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে।

তিনি স্বীকার করেছেন যে, তার পরিকল্পনাগুলো যা নতুন বাণিজ্য এবংএনার্জি করিডোর নির্মাণ, পরিচ্ছন্ন এনার্জির ক্ষমতা দ্বিগুণ করা এবং ‘১৩টির মধ্যে একটি কানাডীয় অর্থনীতি’ তৈরির অন্তর্ভুক্ত, তা সাহসী। ‘কিন্তু সংকটের সময়, ভাগ্য সাহসীদেরকে সহায়তা করে’,  তিনি বলেছেন।

প্রধানমন্ত্রী মেজর-জেনারেল স্যার আইজ্যাক ব্রক-এর একটি ছোটো মূর্তি দেখান, যিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা এবং ১৮১২ সালের যুদ্ধে তার ভূমিকার জন্য ‘আপার কানাডার নায়ক’ হিসেবে পরিচিত। তিনি বলেছিলেন, এই মূর্তি, যা কমেডিয়ান মাইক মায়ার্সের উপহার, তাকে মনে করিয়ে দেয় ‘যখন আমরা কানাডীয় হিসেবে ঐক্যবদ্ধ থাকি, তখন আমরা যে কোনো কিছুর মোকাবিলা করতে পারি।’

অতীতের বহু যুদ্ধে কানাডীয়রা বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে জয় লাভ করে। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পর আমেরিকা আপার কানাডা আক্রমণ করে। বলাই বাহুল্য, আমেরিকানরা পিছু হটেছিল। যেমন ইরান এখন সাহসের সাথে আমেরিকাকে মনস্তাত্তিক ও সামরিক–দুই ভাবেই চাপে রেখেছে। খুব দূর অতীতের কথা নয়, মাত্র একদশক আগেও আমেরিকা ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ দুই দেশকেই নিজেদের দেশের মতো ভাবত। সাম্প্রতিক অতীতে কয়েকবারই কানাডীয় ডলারের মান মার্কিন ডলারকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে সামরিক শক্তি বাড়িয়ে চলছিল, কানাডা সেখানে, মেইনস্ট্রিম, ফার্স্ট ন্যাশনস, আদিবাসী, মন্ট্রিয়েলের ফরাসী মেজরিটি ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ইমিগ্র্যান্টসদের নিয়ে একটি বহুসংস্কৃতির মোজেইক তৈরি করেছে।

একই সীমান্ত ভাগাভাগি করছে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র। একই ভাষায় কথা বলছে দুই দেশ। সেখানে কানাডা দখলের হুমকি দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। একটি পরাশক্তিধর উন্নত জাতিকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করছেন না দেশটির প্রেসিডেন্ট।

সহায়ক নিউজ সাইট: www.cbc.ca, CP24, NPR