
টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে নিহতদের গ্রামের বাড়ি নওগাঁর মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটিতে স্বজনদের আহাজারি। গতকাল দুপুরে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ
-সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২৫
-টাঙ্গাইলে ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহত
সব মিলিয়ে ২৫ জনের মতো যাত্রী। সবাই নিম্ন আয়ের মানুষ।
ভাড়া কম বলে উত্তরবঙ্গগামী রডবোঝাই একটি ট্রাকে উঠেছিলেন তাঁরা। কষ্টের যাত্রা হলেও সবার মনে ছিল আনন্দ। উন্মুখ ছিলেন বাড়ি ফিরে আপনজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করবেন। কিন্তু ভোররাতে ট্রাক উল্টে ঈদের আনন্দযাত্রা সড়কেই শেষ।
ঝরে গেছে ১৫ জনের প্রাণ। এর মধ্যে ১০ জনই নওগাঁর মান্দা উপজেলার বাসিন্দা।
গতকাল সোমবার ভোররাত ৪টা ১৫ মিনিটে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার যোকারচর ১৮ নম্বর ব্রিজ এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রাকের যাত্রীরা স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে ফেনী, চট্টগ্রামসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে রডবোঝাই ট্রাকের ছাদে করে উত্তরবঙ্গের দিকে যাচ্ছিলে।
রবিবার বিকেলে ফেনীর মহিপাল এলাকা থেকে ট্রাকটি রওনা হয়।
ট্রাকচালক নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাকটি মহাসড়কের পাশে খাদে পড়ে যায়। যাত্রীরা রড ও ট্রাকের নিচে চাপা পড়েন। পরে স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে ১৫ জনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেন। বেশ কয়েকজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
গতকাল আরো ছয় জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় আরো ১০ জন নিহত হয়েছে। এতে সারা দেশে মোট ২৫ জনের নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বগুড়ায় বাবা ও মেয়ে নিহত হয়েছে।
টাঙ্গাইলে নিহত ১৫ জনের ১০ জনের বাড়ি নওগাঁয় : ট্রাকে থাকা বেশির ভাগ যাত্রীর বাড়ি নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। এর মধ্যে ১০ জনের বাড়ি নওগাঁর মান্দা উপজেলায়। এ ছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুজন, রাজশাহীর একজন, কুষ্টিয়ার একজন এবং নাটোরের একজন রয়েছেন।
নিহত ১৫ জন হলেন মান্দার রাজেন্দ্রবাটির সাকিম মিয়ার ছেলে সাগর মিয়া, একই এলাকার শহিদুল ইসলামের ছেলে রবিউল ইসলাম, গিয়াস উদ্দিন, নওগাঁর নেয়ামতপুর উপজেলার মালঞ্চির সাইদুলের ছেলে সারিকুল, মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটির আব্দুর রশিদের ছেলে বারিক, একই উপজেলার রাজেন্দ্রবাটির আব্দুর রহিমের ছেলে বাদশা, মান্দার পাকুরিয়া গ্রামের আব্দুর রশিদের ছেলে গিয়াস উদ্দিন, একই এলাকার রশিদের ছেলে মাইনুল, রাজেন্দ্রবাটি এলাকার একাব্বর আলীর ছেলে ইয়াকুব এবং একই এলাকার সুলতানের ছেলে তারেক।
আরো রয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চরপাকা এলাকার সহিমুদ্দিনের ছেলে নজরুল (৬০), চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার সুন্দরপুরের মামুন (৪৫), নাটোর লালপুরের নরেন্দ্রপুর এলাকার ইব্রাহীম মোল্লার ছেলে আলম মোল্লা, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের বৈরাগীরচর এলাকার হাবিবুর রহমান প্রামাণিকের ছেলে হাসান আলী (৩৯) এবং রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাতাসপুরের আলতাফ হোসেনের ছেলে ইসমাইল হোসেন (১৯)।
এ দুর্ঘটনায় আহতরা হলেন নওগাঁর মান্দা উপজেলার মজিবরের ছেলে বাবু (৩৫), একই উপজেলার আব্দুল রহিমের ছেলে আব্দুল রহমান (৩৫), নাটোরের মৃত মান্নানের ছেলে নয়ন বিশ্বাস (৩২), দশপাড়া গ্রামের নজরুলের ছেলে তুহিন, মান্দার পাকুরিয়ার সফেদ আলীর ছেলে আলমগীর (৪০), একই উপজেলার ছোরহাব আলীর ছেলে সিদ্দিক আলী (৪০), মৃত সাহেব আলীর ছেলে খোরশেদ (২৬), মান্দার ডেমরার শহিদুলের ছেলে সমেজ।
দুর্ঘটনায় রক্ষা পাওয়া যাত্রী রাব্বানি বলেন, ‘আমরা ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম। হঠাৎ দেখি ট্রাকটি উল্টে গেছে। এরপর আর কিছুই বলতে পারব না। ট্রাকে থাকা যাত্রীদের বেশির ভাগের বাড়ি নওগাঁর মান্দা উপজেলা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। তাঁরা চট্টগ্রাম ও ফেনী এলাকায় হকারের কাজ করতেন।’
যমুনা সেতু পূর্ব থানার ওসি খন্দকার ফুয়াদ রুহানি কালের কণ্ঠকে বলেন, ১৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আর ছয়-সাত জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিহতদের স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। ট্রাকচালক ও হেল্পার পলাতক। এ ঘটনায় গত রাতে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছিল।
টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সঞ্জয় কুমার মহন্ত কালের কণ্ঠকে বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের ১৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আমাদের তত্ত্বাবধানের অ্যাম্বুলেন্সযোগে লাশ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে আহতদের চিকিৎসা তাঁদের নিজস্ব জেলায় সরকারিভাবে করানো হবে।
অন্যান্য জেলায় নিহত ১০ : বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলায় ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে অজ্ঞাতপরিচয় এক যানবাহনের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী বাবা ও তাঁর দুই বছরের মেয়ে নিহত হয়েছে। এই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন নিহতের স্ত্রী। তাঁকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল সকাল সাড়ে ৭টার দিকে উপজেলার বনানী এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন আনিছুর রহমান (৩৫) ও তাঁর চার বছরের মেয়ে আয়েশা খাতুন। দুর্ঘটনায় আহত পুষ্পা আক্তার (২৫) নিহত আনিছুরের স্ত্রী। আনিছুর রহমান রংপুরে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকে কর্মরত ছিলেন।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা ফিলিং স্টেশন এলাকার রংপুর আঞ্চলিক সড়কে রবিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ডাম্প ট্রাক ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে আব্দুল আউয়াল সরকার (৫৫) নামের সাবেক যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ নিহত হয়েছেন।
গোপালগঞ্জে গতকাল যাত্রীবাহী বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে মাইক্রোবাসের চালক (অজ্ঞাত) নিহত ও অন্তত ১৫ যাত্রী আহত হয়েছেন। ঝালকাঠির রাজাপুরে গতকাল ভেকু মেশিনের ধাক্কায় মো. সিহাব উদ্দীন নামের ব্র্যাকের এক মাঠকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পৃথক তিনটি সড়ক দুর্ঘটনায় দুজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছে। গতকাল গভীর রাতে দোগাছি, সমষপুর ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বাউশিয়ায় এসব দুর্ঘটনা ঘটে। নওগাঁয় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাস্থলেই দুজন ও হাসপাতালে নেওয়ার পর অন্যজনের মৃত্যু হয়। রবিবার রাতে মহাদেবপুর ও পত্নীতলা উপজেলায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আরো দুজন আহত হয়েছেন।
নীতিগত ব্যর্থতাকেই দায় দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা : আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা শুরু হতেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা সামনে আসছে। যাত্রী অধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও পর্যাপ্ত নিরাপদ যাতায়াতের সুযোগ না থাকায় অনেক শ্রমজীবী মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব দুর্ঘটনার পেছনে শুধু চালকের ভুল নয়, দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতা এবং দুর্বল তদারকিও দায়ী।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি অভিযোগ করেছে, ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করার বিষয়ে বাস মালিকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবে মানা হচ্ছে না। সংগঠনটির দাবি, অতিরিক্ত ভাড়া পরিশোধে অক্ষম অনেক শ্রমজীবী মানুষ কম খরচে পণ্যবাহী ট্রাক বা অন্যান্য অনিরাপদ বাহনে যাতায়াত করছেন। এর ফলেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিবছর ঈদের সময় লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষ অতিরিক্ত ভাড়া দিতে না পেরে ট্রেনের ছাদে, বাসের ছাদে কিংবা পণ্যবাহী যানবাহনে যাতায়াত করেন। নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।’
নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর আমরা চালক বা যানবাহনের ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু কেন মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহনে উঠতে বাধ্য হচ্ছে, সেই প্রশ্নটি গুরুত্ব পায় না। গণপরিবহনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর নজরদারি ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।’
নগর ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘আমাদের পরিবহন নীতিতে সাধারণ যাত্রীর নিরাপত্তার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে পরিচালনাগত সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে যাত্রীদের একটি অংশ বিকল্প ও অনিরাপদ পরিবহন ব্যবহারে বাধ্য হয়। দুর্ঘটনার দায় শুধু ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার মূল কারণ আড়াল হয়ে যায়।’
তিনি আরো বলেন, ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে হলে মহাসড়কের পাশে গরুর হাট যেন না বসানো হয় সেদিকে কড়া নজরদারি রাখতে হবে। কিন্তু সড়কমন্ত্রী অনুরোধ জানিয়েই তাঁর কাজ শেষ করেছেন। পরিবহন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, পর্যাপ্ত গণপরিবহনের অভাব এবং আইন প্রয়োগের ঘাটতির মতো বিষয়গুলো সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি আরো বলেন, ঈদের আগে ও পরে কয়েক দিনের মধ্যে সড়ক, রেল ও নৌপথে বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচল হয়। এই সময় অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ফিটনেসবিহীন যান চলাচল এবং ভাড়া নৈরাজ্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে। [তথ্য দিয়েছেন কালের কণ্ঠের সংশ্লিষ্ট নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা]























